kalerkantho


রাশিয়ায় রূপকথা লিখতে চান মেসি

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



রাশিয়ায় রূপকথা লিখতে চান মেসি

রাশিয়ায় বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজন। হয়তো লিওনেল মেসির সোনালি সময়ের শেষ বিশ্বকাপও। কাতার বিশ্বকাপে মেসির বয়স হবে ৩৫, খেলোয়াড়ি জীবনের বয়স হবে দেড় যুগ। অমিত প্রতিভাবানরা বয়সকে স্রেফ সংখ্যা বানিয়ে ফেলার মতো ক্ষমতাবান বটে, তবে প্রকৃতির নিয়মের কাছে একটা সময়ে অসহায়ও। তাতেই প্রশ্নটা উঠছে, রাশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ কি মেসিরও প্রথম বিশ্বকাপ হবে? নাকি আরো একবার ফিরে আসতে হবে নিঃশ্বাস দূরত্ব থেকে। আর্জেন্টিনার একটি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমরা রাশিয়ার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হতে চাই।’

কাস্তে-হাতুড়ির দিন গত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলে অলিম্পিক আয়োজন করেছিল মস্কো, যা বয়কট করেছিল ৬৬ দেশ। ভোলগা পারের অর্থনীতির হাওয়া বদলেছে, পতাকা বদলেছে। তাইতো রাশিয়ায় বিশ্বকাপ বর্জনের ডাক দেওয়া তো দূরের কথা; চারবারের

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি, টোটাল ফুটবলের দেশ নেদারল্যান্ডস এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। বাছাই পর্বের শেষ দিনে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাছাই পর্ব উতরে রাশিয়ার টিকিট জোগাড় করেছে আর্জেন্টিনা। তাই সময়ের সেরা ফুটবলারকে ছাড়াই বিশ্বকাপ দেখার আশঙ্কা জোরালোভাবে জাগলেও শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসির দেশ আসছে বিশ্বকাপে। ‘ডি’ গ্রুপে ‘চিরসখা’ নাইজেরিয়ার সঙ্গে ইউরোপের দুই প্রতিপক্ষ আইসল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে লড়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা ধরতে হবে আকাশি-নীলদের। পথটা বন্ধুর হলেও আশা হারাচ্ছেন না গতবার শিরোপার দোরগোড়া থেকে ফিরে আসা মেসি, ‘আমাদের ফুটবলের যে ঐতিহ্য, তাতে করে শিরোপার লড়াইতে একটা জায়গা আমাদের প্রাপ্য। যদিও গত বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে, তবু আমরা আরো একবার ওই জায়গাটাতে পৌঁছাতে চাই।’

বিশ্বের প্রথাগত ফুটবল শক্তিগুলোর কাছে বিশ্বকাপে খেলা মানেই যেন শিরোপা জেতার দায়বদ্ধতা, তার থেকে কিছু কম হলেই যেন ব্যর্থতা। মেসি মনে করেন, শিরোপা জেতাটা তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নয় বরং এক উদগ্র দলীয় আকাঙ্ক্ষা, ‘আমাদের কাছে বিশ্বকাপ জিততে চাওয়াটা কোনো দায়বদ্ধতা নয়, বরং আমাদের সবার প্রচণ্ড এক ইচ্ছার সামষ্টিক রূপ। আমরাই সেই দল হতে চাই, যারা রাশিয়ার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপটা জিতেছে।’

সেই ইচ্ছাপূরণে জাদুর কাঠিটা যে মেসিকেই নাড়তে হবে, সেটা তিনি ভালো করেই জানেন। হোক না দলীয় খেলা কিংবা কোচের কারসাজি; মেসি জানেন, তার বাঁ পায়েই আসলে লেখা আছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ-ভাগ্য। তিনি করতে পারলেই হবে, নইলে হবে না। ব্রাজিল বিশ্বকাপে বসনিয়ার বিপক্ষে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় মিছিলের মতো ভিড়ের ভেতর পাঁকাল মাছের মতো গলে গিয়ে ওই গোলটা না করলে, ইরানের বিপক্ষে ম্যাচে ৯০ মিনিট গড়িয়ে যাওয়ার পর বক্সের বাইরে থেকে ওই মাপা শটটা না নিলে হয়তো ফাইনাল পর্যন্ত যেতই না আর্জেন্টিনা। নাইজেরিয়ার বিপক্ষেও ৩-২ গোলে জিততে মেসিকে জোড়া গোল করতে হয়েছিল। এমনকি নকআউটের প্রথম পর্বে, সুইজারল্যান্ড যখন গলার ফাঁস হয়ে এঁটে বসেছে, তখনো অতিরিক্ত সময়ের খেলা দুই মিনিট বাকি থাকার সময় মেসির জাদুকরী পাস থেকেই তো আনহেল দি মারিয়ার জয়সূচক গোলটা করা। সেই অর্থে, শুধু সেমিফাইনালে গনসালো হিগুয়েইনের জয়সূচক গোলটাতেই সরাসরি মেসির স্পর্শ নেই, কারণ আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের পায়ে বলটা গিয়েছিল দি মারিয়ার পাস বেলজিয়ামের একজনের পায়ে লেগে দিকভ্রান্ত হয়ে! ফাইনালে জার্মানরা কড়া পাহারায় রীতিমতো বোতলবন্দি করেই রেখেছিল তাঁকে। তাও সেই লৌহবাসর ভেদ করে জাদুকরী প্রতিভার কিছু ঝলক ঠিকই দেখিয়েছিলেন মেসি, কিন্তু সতীর্থরা যে করেছেন হতাশ। হিগুয়েইন নষ্ট করেছেন ফাইনালের সহজতম সুযোগ, আরেকবার মেসির বাড়ানো বলে গোল করেও তাকিয়ে দেখেন উড়ছে অফসাইডের পতাকা।

শুধু কি সতীর্থ! কোচরাও কি কম ভুগিয়েছেন মেসিকে? কোচদের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত কম তো দিতে হয়নি তাঁকে। না হলে হয়তো এত দিনে নামের পাশে একটা বিশ্বকাপ থাকত মেসির। ২০০৬ সালে সার্বিয়া-মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচে ৭৫ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে ৮৮ মিনিটেই গোল করেছিলেন মেসি। অথচ কোচ হোসে পেকারম্যান তাঁকে এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকো আর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে একাদশে তো রাখেননি, বদলি হিসেবেও নামাননি। ২০১০ বিশ্বকাপে কোচের আসনে ডিয়েগো ম্যারাডোনা। আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর ব্যক্তিগত জেদের কারণে দলে নিলেন না হাভিয়ের জানেত্তিকে। অথচ ২০০৯-১০ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল ইন্টার মিলান আর সেই দলের অধিনায়ক জানেত্তি। এই ফুলব্যাককে ম্যারাডোনা রাখলেন না বিশ্বকাপের দলে। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে একাদশ সাজালেন দুই লেফটব্যাক গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জ ও নিকোলাস বুরদিসো এবং নিজ ক্লাব দলেই অনিয়মিত হয়ে যাওয়া মার্তিন দেমিচেলিস ও সেসময় আর্জেন্টিনার লিগে খেলা নিকোলাস ওতামেন্দিকে। ফল, ৪-০ গোলের লজ্জাজনক হারে বিদায়। এমনকি ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালেও প্রথমার্ধে দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন এসেকিয়েল লাভেসসি, তাঁকেই কিনা দ্বিতীয়ার্ধে তুলে নিয়ে আলেহান্দ্রো সাবেইয়া নামিয়েছিলেন চোটের কারণে কোয়ার্টার ফাইনাল মিস করা ও সেমিফাইনালে ৮২ মিনিটে মাঠে নামা সের্হিয়ো আগুয়েরোকে।

তাই মেসি জানেন, মাঠে আসলে বাকি ২১ জনই তাঁর প্রতিপক্ষ! বিশ্বকাপ জেতার বাধা। বিশ্বকাপটা দলীয় সাফল্য বটে, তবে মেসির জন্য সেটা ব্যক্তিগতই। কারণ ক্লাব পর্যায়ের সবগুলো শিরোপা, বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার, বর্ষসেরা ফুটবলারের ঝুড়ি ঝুড়ি স্মারক...সবই আছে তাঁর। নেই শুধু একটা বিশ্বকাপ শিরোপা। এবং সেই আক্ষেপ মেটাতে নিজের বাঁ পা-টাই একমাত্র ভরসা লিওনেল মেসির!

 



মন্তব্য