kalerkantho


মাঠে নামেননি আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা!

হায়দার আলী ও শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর থেকে   

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মাঠে নামেননি আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা!

গাজীপুরের টঙ্গীর আনারকলি সিনেমা হলের সামনের বাজার গলি। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পূর্বপাশ দিয়ে গলি চলে গেছে টঙ্গী বাজারে। গলির প্রবেশ মুখেই দুই পাশে পুরাতন লোহালক্কড় বিক্রির দোকানগুলোয় ক্রেতাদের ভিড়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টায় বাজার সড়কের কোথাও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থীদের প্রচার খুব বেশি চোখে পড়েনি।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টঙ্গীতে নৌকার প্রার্থীর প্রচারে নেই কেন, জানতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থক আনিসুল ইসলাম বলেন, ‘এত বড় একটি নির্বাচন, কিন্তু এলাকার আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের এখনো মাঠে নামতে দেখিনি। পোস্টার-ব্যানারও তেমন চোখে পড়ছে না।’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাহাঙ্গীর আলম নৌকার টিকিট পাইছে বলে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করছে। এ জন্য হয়তো অনেকেই মাঠে নামেনি।’ অবশ্য তাঁর এমন কথার জবাবে যুবলীগকর্মী বিল্লাল হোসেন বললেন, ‘জাহাঙ্গীর আলম মেয়র পদপ্রার্থীর টিকিট পেয়ে বড় বড় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। নির্বাচনী প্রচার বিষয়ে ডাকছেনও না। টঙ্গীর বড় বড় নেতাদের গুরুত্ব না দিয়ে গুটিকয়েক নেতা নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এখনো অনেক নেতা ক্ষোভ থেকেই মাঠে নামেননি। তবে আমরা আশা করছি, ক্ষোভ-হতাশা কাটিয়ে নেত্রীর মুখে হাসি ফোটাতে তাঁরা অবশ্যই মাঠে নামবেন।’

আজমত উল্লা খান সড়ক ধরে একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মেয়র পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আজমত উল্লা খানের বাড়ি। তাঁর বাড়ির সামনেই সুনসান। ফটকের কলিংবেল চাপ দিতেই বেরিয়ে আসেন নিরাপত্তাকর্মী রুহুল আমিন। আজমত উল্লা খান আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যার সকালে ঢাকায় গেছেন।’ মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আজমত উল্লা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশি একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মিটিং থাকায় সকালে বাসায় ছিলাম না। একটি কলেজে বসে মিটিং করেছি।’ ক্ষোভ ও হতাশা থেকে এখনো অনেক নেতা মাঠে না নামা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারো কারো কষ্ট আর হতাশা থাকতেই পারে। কিন্তু এসব কিছু ভুলেই নৌকার প্রার্থী বিজয়ের জন্য মাঠে নামছে। যারা নামেনি তারাও নামবে। কারণ আওয়ামী লীগ করলে নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আশা করছি বিপুল ভোটের মাধ্যমে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করবে গাজীপুরের জনগণ।’

সেখান থেকে বেরিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়েও নেতাকর্মীদের কাউকে দেখা যায়নি। কার্যালয়ে জাতীয় শ্রমিক লীগের টঙ্গী আঞ্চলিক শাখার সদস্য মতিউর রহমান ওরফে বিকম মতি সংগঠনের দুই নেত্রীর সঙ্গে বসে নির্বাচনী প্রচার বিষয়ে পরামর্শ করছিলেন। কথা হয় মতিউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী ফোন না দিলেও দলের জন্য আমরা কাজ করছি। এখানে নেত্রীর সম্মান জড়িত। যেভাবেই হোক দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও গাজীপুরের জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা প্রয়াত আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছোট ভাই মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মতিউর রহমান মতিও টঙ্গীতে ব্যাপক জনপ্রিয় নেতা। তিনি ঘরোয়া প্রচারে রয়েছেন। তিনি মাঠে নামলে টঙ্গী আওয়ামী লীগ চাঙ্গা হয়ে উঠবে।’

‘শুধু মতিউর ভাই নন, আরো অনেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাকে এখনো মাঠে নামতে দেখিনি’—পাশে থেকে বলছিলেন শ্রমিক লীগের টঙ্গী আঞ্চলিক শাখার মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা নুরজাহান মনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘নৌকার ঘাঁটিতে যদি নৌকার নেতারা সবাই মন খুলে কাজ না করেন, তাহলে জাহাঙ্গীরের মেয়র হওয়া কষ্ট হবে। মার্কা পাওয়ার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও কিছু নেতা ছাড়া বেশির ভাগ নেতা এখনো সক্রিয়ভাবে মাঠে নামেননি।’

আর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজা পারভীন বলেন, ‘মাঠের অবস্থা দেখে ভালো লাগছে না। অনেক নেতাই চুপ করে আছে। এই অবস্থা দেখে খুব ভয় হচ্ছে। এইবার নৌকা পরাজিত হলে আমাগো নেত্রী অনেক কষ্ট পাবেন। গাজীপুরের নেতাদের উচিত সব মান অভিমান ভুলে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করা। আর জাহাঙ্গীর আলমকে বড় বড় নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনের প্রচারসহ নানা বিষয়ে সমন্বয় করা উচিত।’

তবে এলাকায় ঘুরে নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে কাজ করতে দেখা গেছে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেলকে। তিনিও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু দল জাহাঙ্গীর আলমকে টিকিট দেওয়ার পর থেকেই নৌকার প্রার্থীর জন্য বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন দাবি করে রাসেল সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেত্রীর মুখে হাসি ফোটাতেই আমরা নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। বিপুল ভোটের ব্যবধানে নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আমরা কাজ করছি। আশা করছি নৌকার প্রার্থীই বিজয়ী হবেন। যারা এখনো মাঠে নামেনি, তারাও নামবে।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আফজাল হোসেন সরকার রিপন বলেন, ‘গাজীপুরের প্রবীণ নেতা আজমত উল্লা খানকে মনোনয়ন না দেওয়ায় দলের প্রবীণ নেতাদের অনেকের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ আছেই। আর এসব কারণেই হয়তো কেউ কেউ মাঠে নামেনি। তবে আজই আজমত উল্লাসহ অনেকেই মাঠে নেমেছেন। অন্যরা মাঠে নামবেন, নৌকার প্রার্থীর জন্য আমরা সবাই যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. ওয়াজউদ্দিন মিয়া বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। দুই দিন আগে বাসায় ফিরলেও চিকিৎসক বলেছেন, আরো দুই সপ্তাহ তাঁকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। এ জন্য বাসায় থেকেই নেতাকর্মীদের নির্বাচনী নির্দেশনা দিচ্ছেন।

টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর কমিটির নির্বাহী সদস্য রজব আলী জানান, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে আছেন। এ জন্য এখনো পুরোপুরি নামতে পারেননি। তবে প্রতিদিনই দলীয় কার্যালয়ে তাঁরা প্রস্তুতি সভা করছেন। দু-এক দিনের মধ্যে তিনি পুরোপুরি মাঠে নামবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক এক শীর্ষ নেতা জানান, ৭১ সদস্যের মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটির মধ্যে সাত-আটজন কাউন্সিলর নির্বাচন করছেন। বাকিদের মধ্যে ৮০ শতাংশই এখনো প্রচারে নামেনি। যাঁরা নেমেছেন তাঁদের মধ্যেও অনেকে আছেন লোক-দেখানো। তিনি স্বীকার করে বলেন, তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সমন্বয় হলে প্রচার আরো গতি পাবে।

আজমত উল্লা মাঠে নামায় চাঙ্গা জাহাঙ্গীর সমর্থকরা : ২০১৩ সালের গাজীপুর সিটি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন এবার দলের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। ওই নির্বাচনে ব্যাপক আলোচনায় চলে আসেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন জাহাঙ্গীর। সেই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। আজমত উল্লা খানের সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, জাহাঙ্গীর সমর্থকরা নৌকার বিপক্ষে কাজ করায় দলের প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি।

এবারের নির্বাচনে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম দুজনই ছিলেন নৌকার শক্ত প্রার্থী। শেষ পর্যন্ত দল জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেয়। আজমত উল্লা খান জাহাঙ্গীরের পক্ষে কবে মাঠে নামবেন তার অপেক্ষায় ছিল জাহাঙ্গীর সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কুনিয়া বড়বাড়ির জয়বাংলা সড়কে জাহাঙ্গীর আলমকে সঙ্গে নিয়ে প্রচারে নামেন আজমত উল্লা। জাহাঙ্গীরকে পাশে নিয়ে নৌকায় ভোট চান তিনি। দুই নেতাকে পাশাপাশি দেখে জয় বাংলা সড়ক জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝেও উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। ভোটারদের উদ্দেশে আজমত উল্লা খান বলেন, ‘সকল ভেদাভেদ ভুলে নেত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে আমাদের। আর নৌকা তথা জাহাঙ্গীর আলমকে বিজয়ী করতে আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছি।’

 


মন্তব্য