kalerkantho


প্রসূতি মায়ের অ্যাম্বুল্যান্সে ঘাতক ট্রাক

সীমান্ত সাথী, রংপুর   

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



প্রসূতি মায়ের অ্যাম্বুল্যান্সে ঘাতক ট্রাক

‘পার হয়ে কত নদী কত যে সাগর/এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর/কোন রূপ-লোকে ছিলি রূপকথা তুই/রূপ ধরে এলি এই মমতার ভুঁই’—মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীর আলোয় আসা মানবশিশুর কোমল মায়াবী রূপ দেখেই হয়তো বিস্ময়-বিমুগ্ধ কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন এই কবিতা। এ রকমই অপার বিস্ময়ের অনুরণন অপেক্ষা করছিল মনি আর আজাদের নতুন সুরবাঁধা জীবনে। মাতৃত্বের শেষ বেদনামধুর মুহূর্তের ডাক শুনে মনিকে নিয়ে আজাদের স্বজনরা ছুটছিল হাসপাতালে। কিন্তু সব স্তব্ধ করে দিল ঘাতক ট্রাক। তাদের বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সকে মুখোমুখি আঘাত করে দুমড়ে-মুচড়ে দিল। এপারে আসা হলো না আর শিশু জাদুকরের। মায়ের গর্ভেই মায়ের সঙ্গেই চলে গেল পরপারে।

দুই বছর আগে বিয়ে হয় মনি বেগম ও মোফাচ্ছের হোসেন আজাদের। সংসারের হাল ধরতে বিয়ের এক বছর পর ঢাকায় গার্মেন্ট শ্রমিকের কাজ নিয়ে চলে যান আজাদ। প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়িতে থেকে যান স্ত্রী মনি। এর মধ্যে মনি বেগম অন্তঃসত্ত্বা হন। মোবাইলে প্রতিদিন খোঁজখবর নিতেন আজাদ। দুজনে মিলে স্বপ্ন বুনতেন অনাগত শিশুটির। কয় দিন আগে ছুটি নিয়ে মনি বেগমকে দেখে আবার ঢাকায় ফিরে যান। ইচ্ছা ছিল সন্তান হওয়ার আগে ছুটি নিয়ে বাড়িতে স্ত্রীর পাশে আসবেন। প্রথম শিশুর মুখ দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন মনি ও আজাদ, সঙ্গে তাঁদের স্বজনরা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার রাত ১০টার দিকে প্রসব বেদনা শুরু হয় ১০ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মনি বেগমের। স্বজনরা তাঁকে প্রথমে নিয়ে যায় ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাঁকে স্থানান্তর করা হয় দিনাজপুুর আব্দুর রউফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হলে মনি বেগমকে মধ্যরাতে একটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে পরিবারের সদস্যরা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে ৪টার দিকে দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের পাগলাপীর এলাকায় পৌঁছলে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি এলাকায় পিলারভর্তি একটি ট্রাকের সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অ্যাম্বুল্যান্সটি দুমড়ে-মুচড়ে সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে গুরুতর আহত হন ১০ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মনি বেগম (২০), তাঁর চাচি আপিয়া বেগম (৫০) ও অ্যাম্বুল্যান্স চালকের সহকারী তুষার মিয়া (২০)। ঘটনার অনেক পর খবর পেয়ে তারাগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিনজনই মারা যান। গুরুতর আহত অ্যাম্বুল্যান্সচালক আলতাফ হোসেন (৪০) ও জুয়েল মিয়াকে (৩৫) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।  চালকের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

গতকাল দুপুরে নিহতদের সুরতাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের স্বজনরা রংপুর হাসপাতাল থেকে লাশ নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, রাত সাড়ে ৮টায় মনি বেগমকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মনি বেগমের এক আত্মীয় বাবুল মিয়া জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তারদের বলা হয়েছিল মনি বেগমের গর্ভের সন্তানকে কোনোভাবে বাঁচানো যায় কি না। কিন্তু ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখেন গর্ভের সন্তানটিও মারা গেছে।

গতকাল দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় নিহত আপিয়া বেগমের ছেলে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাই আজাদ ঢাকায় থাকেন। ভাবির সন্তান হওয়ার সময় তাঁর ঢাকা থেকে বাড়ি আসার কথা ছিল। মনি ভাবির হঠাৎ প্রসব বেদনা শুরু হলে প্রথমে তাঁকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে দিনাজপুর। সেখানেও সুষ্ঠু চিকিৎসা না হলে রাতেই অ্যাম্বুল্যান্সে করে রংপুর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ঘাতক ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে আমার মাসহ অন্তঃসত্ত্বা ভাবি মারা গেছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে মোফাচ্ছের হোসেন আজাদ পাগলপ্রায়। তিনি এখন বাড়ির পথে। দুর্ঘটনায় মনি ভাবির মাথা ফেটে যায়। পেটেও প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি।

দুর্ঘটনাস্থলের পাশের চা দোকানি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভোরের দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওই সময় সবাই ঘুমিয়ে থাকায় আহতের উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি। রাস্তাও ছিল ফাঁকা। পঞ্চগড় থেকে পিলারবাহী একটি ট্রাক যাচ্ছিল। এ সময় অ্যাম্বুল্যান্সের সঙ্গে ট্রাকটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অ্যাম্বুল্যান্সটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

তারাগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খবর পাওয়ার পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে অ্যাম্বুল্যান্সের যাত্রীদের মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনজন মারা যান। গুরুতর আহত অ্যাম্বুল্যান্সচালক ও অন্য একজনের চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে। ঘাতক ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো ১৪-৮৭২৭) আটক করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ট্রাকের চালক পালিয়ে যায়।’

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তৌফিক আহম্মেদ বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা নারীটি মাথা ও পেটে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। প্রায় একই অবস্থা নিহত অন্য দুজনেরও।’ 

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. অজয় কুমার রায় জানান, মুমূর্ষু অবস্থায় দুর্ঘটনায় আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাঁরা মারা যান। গুরুতর আহত দুজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।



মন্তব্য