kalerkantho


তারেককে আনতে জোর তৎপরতা সরকারের

► যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তির চিন্তা
► মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে

বিশেষ প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



তারেককে আনতে জোর তৎপরতা সরকারের

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে যুক্তরাজ্য থেকে ফিরিয়ে আনতে সরকার জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেও আইনি জটিলতার কারণে বিষয়টি খুব জটিল হতে পারে। ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে কী হিসেবে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে জানাতে বাংলাদেশ বারবার অনুরোধ করলেও ব্রিটিশ সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। তবে তারেক রহমানের মতো ফেরারি আসামিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। গত মাসে লন্ডনে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে আসামি প্রত্যর্পণবিষয়ক সহযোগিতার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তাই এ বিষয়ে একটি চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বিদেশি আসামি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার মৃত্যুদণ্ড হবে না, এমন নিশ্চয়তা চেয়ে থাকে। বিষয়টি যুক্তরাজ্যের আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তাই তারেক রহমানকে ফেরানোর ক্ষেত্রেও এমন নিশ্চয়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আসতে পারে। যুক্তরাজ্যের আদালত আসামি প্রত্যাবর্তনে ইতিবাচক রায় দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতেরও দ্বারস্থ হতে পারেন।

দুর্নীতির দায়ে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। এর আগে অর্থপাচারের একটি মামলায় হাইকোর্ট তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ অনেক মামলার আসামি তারেক। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ তারেকের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফেরারি আসামি হিসেবে তারেক রহমানের নামে ২০১৫ সালে ইন্টারপোল রেড কর্নার নোটিশ জারি করেছিল। কিন্তু ওই মামলাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ’ অভিহিত করে এবং এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এক বছরের মাথায় তারেকের আইনজীবীরা ইন্টারপোলের ওই নোটিশ প্রত্যাহার করান। এরপর বাংলাদেশ তারেকের নাম ‘ফেরারি তালিকায়’ তুলতে অনুরোধ করলেও ইন্টারপোল এখনো তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করলেও শুধু ধর্মীয় কারণে তাঁর সৌদি আরব যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। তারেক রহমানের একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যাওয়ার পর তিনি সেখানে যাননি, বাংলাদেশেও আসেননি। বাংলাদেশে ফেরারি আসামি হওয়ায় এবং যুক্তরাজ্যে আইনি অবস্থানসংক্রান্ত শর্তের কারণে তিনি এ দেশে বা মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি বলে ধারণা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা।

গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার সাংবাদিকরা তারেক রহমানের বিষয়ে বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশন প্রতিনিধিদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা ব্যক্তিবিশেষের বিষয়ে তথ্য জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম গত বছরের ১৮ জুলাই ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশের কোনো পাসপোর্ট বা ডকুমেন্ট নেই। তিনি কিভাবে লন্ডনে অবস্থান করছেন, সে বিষয়েও বাংলাদেশের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য নেই।

জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে তারেক রহমান তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে যুক্তরাজ্য সরকার সেটি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে ফিরিয়ে দেয়। এর পর থেকে তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট নেই।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে ব্যক্তি তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পর তারেককে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া পুরো বিষয়টিতে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশে রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা নিয়েও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আছে।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের টানা অবরোধ কর্মসূচির সময় তারেক রহমানকে ফেরত চেয়ে তত্কালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ডকে চিঠি লিখেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ওই চিঠিতে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা ও পরোয়ানার কথা উল্লেখ করা ছাড়াও লন্ডনে বসে উসকানি ও নির্দেশনা দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার অভিযোগ ছিল। চিঠিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ মনে করে যে চলমান মামলা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য তারেকের দেশে ফেরা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার রাতে লন্ডনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, যেকোনো উপায়ে তারেককে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল রবিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তারেক রহমানকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনতে আলোচনা চলছে। 

বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও কী প্রক্রিয়ায় তারেককে ফিরিয়ে আনা হবে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, “বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও এ চুক্তি করতে তো বাধা নেই। এখন ‘মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট’ বলে একটা আইন আছে। সেখানে কিছু অপরাধীর বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু আনতে পারি। সেই মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট আমাদের দুই দেশেরই আছে। এটা কিন্তু জাতিসংঘের ধার্যকৃত একটা আইন। সেই সহযোগিতাও এই দুই দেশের মধ্যে আছে।”

আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফিরিয়ে আনার জন্য যাদের সঙ্গে যে আলোচনা প্রয়োজন, সেই আলোচনা চলছে। আলোচনায় পজিটিভ (ইতিবাচক) দিক দেখছি বলেই আলোচনা চলছে। ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত এটা ফলপ্রসূ হচ্ছে কি না, সেটা কিন্তু আমি বলব না।’

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতি ছাড়ার শর্তে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। পরে ভিসার মেয়াদ শেষে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আদালতে আবেদন করেন এবং সেটি মঞ্জুর হয় বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অন্য কোনো দেশের সন্দেহভাজন অপরাধীদের যুক্তরাজ্য থেকে তাদের নিজে দেশে ফেরত পাঠাতে ব্রিটিশ আদালত ২০০৩ সালের বহিঃসমর্পণ আইন এবং ১৯৯৮ সালের মানবাধিকার আইনের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যুক্তরাজ্যের ২০০৩ সালের বহিঃসমর্পণ আইনে দুটি ধারা রয়েছে। এর প্রথমটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর জন্য এবং দ্বিতীয়টি ইইউয়ের বাইরের দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য।

জানা গেছে, দ্বিতীয় ধারা অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্য থেকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে ওই দেশের সরকারকে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও নথি জমা দিয়ে আবেদনকারী দেশকে নিশ্চয়তা দিতে হয় যে বহিঃসমর্পণ করা হলে ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না বা এরই মধ্যে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়ে থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হবে না। এ ছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সমুন্নত থাকবে বলেও নিশ্চয়তা দিতে হয়। কোনো বিদেশি অপরাধীর বহিঃসমর্পণের যথাযথ আবেদন ও তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তা আদালতে পাঠায়। আদালত প্রয়োজনীয় শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত জানায়। রায় কোনো ব্যক্তির বিপক্ষে গেলে তা পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানোরও সুযোগ আছে। এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তি করার সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ব্রিটিশ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আবার ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতেও আবেদন করতে পারেন।

 


মন্তব্য