দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার এই স্বল্প সময়ে অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও বৈদেশিক সম্পর্কোন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। দেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে সরকারের সামনে রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ।
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিপর্যস্ত অর্থনীতি টেনে তুলে মজবুত ভিত্তি দিতে চায় এই সরকার। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মাসে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জোর দেন তিনি। নির্বাচনী অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ছিল অন্যতম অর্জন। এই কার্ডধারীরা সুফল পাচ্ছেন এবং সরকারের কাছে তাঁদের কৃতজ্ঞতাও তাঁরা নানাভাবে প্রকাশ করছেন। এ ছাড়া কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে সুদসহ ঋণ মওকুফের উদ্যোগে। খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া কার্ড বিতরণের উদ্যোগও প্রশংসা কুড়িয়েছে। বন্ধ শিল্প-কারখানা (যেমন—বন্ধ চিনিকল, পাটকল ও স্পিনিং মিল) পুনরায় চালু ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপযোগী সব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সংসদে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাজেট অনুমোদনের পর চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যেভাবে আকর্ষণ করা হচ্ছে, তাতে এক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে দেশ।’
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, সেই পরিস্থিতি খুবই জটিল ছিল। বলা চলে, ফেব্রুয়ারির আগের সময়টায় অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ—উভয় পরিস্থিতিই খুবই প্রতিকূল ছিল এবং সেই প্রতিকূল অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু তারাই সমাধান করতে সক্ষম হয়নি। ফলে এই নির্বাচিত সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন কিন্তু একটা সমস্যাসংকুল অর্থনীতি তারা ইনহেরিট করে। এই পাঁচ মাসের মধ্যে সরকার সেই সমস্যাগুলো সমাধানের প্রস্তুতিটা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের ১৮০ দিনের যে কর্মপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দেওয়া হয়েছিল তার বহুলাংশে সফল হয়েছে।
এদিকে পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ‘গণভোট ও জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে বিরোধী দলের ‘অপকৌশল’ রুখে দিয়েছে তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্ব। কোনো ইস্যুতেই ‘হালে পানি পায়নি’ বিরোধী পক্ষ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জনগণের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সংযোগ ঘটাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন। দল ও দলের বাইরের অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই গতিকে ‘রকেট গতি’র সঙ্গে তুলনা করছেন। ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কাজ করছেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায়। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হয়।
সম্পতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকগুলোয় দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মত বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের বেইজিংয়ে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ করতে শিগগির দেশটিতে (চীন) বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে বাংলাদেশ সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, সরকারি সেবার ডিজিটাইজেশন, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ ও সমন্বিত করতে গত বুধবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী দিন জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ পাস হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টিরও বেশি খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানো হয়েছে ট্যাক্স হ্রাস করার মাধ্যমে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে বিনিয়োগনির্ভর এবং কর্মসংস্থানে প্রাধান্য দিয়ে ডি-রেগুলেশন ইকোনমিক লিবারালাইজেশন এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কার্যক্রম গতিশীল হচ্ছে।’