kalerkantho


বিজ্ঞান শিক্ষায় অদ্ভুত প্রকল্প

সিঁড়িতে ৫০০ কোটি টাকা, ল্যাবের জন্য মাত্র ১২ কোটি

আরিফুর রহমান   

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সিঁড়িতে ৫০০ কোটি টাকা, ল্যাবের জন্য মাত্র ১২ কোটি

বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে নির্বাচিত ২০০ সরকারি কলেজে প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পে পরীক্ষাগার বা ল্যাবরেটরির (ল্যাব) জন্য মাত্র ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। অথচ কলেজের সুউচ্চ ভবন এবং তাতে চলন্ত সিঁড়ি বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু চলন্ত সিঁড়ির জন্যই বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। মোট বরাদ্দের মাত্র ০.৩১ শতাংশ ল্যাবের যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে রাখার প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশনও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে ল্যাবে এত কম বরাদ্দ কেন, তা জানতে চায় কমিশন। এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা।

সরকারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে। অথচ শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার প্রধান অনুষঙ্গ ল্যাবের উপকরণ কিনতে বরাদ্দ মাত্র ১২ কোটি টাকা। এর কারণ ভবন ও চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণে আর্থিক লাভবান হওয়ার যে সুযোগ থাকে, সেটা ল্যাবের উপকরণ কেনায় থাকে না। তাই ল্যাবের উপকরণ কেনার চেয়ে চলন্ত সিঁড়ি ও ভবন ঊর্ধ্বমুখীর দিকে ঝোঁক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশন ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের সম্মতিতে প্রকল্পের নামই পরিবর্তন করে ফেলা হয়। ‘নির্বাচিত ২০০টি সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে এখন রাখা হয়েছে ‘নির্বাচিত ২০০ সরকারি কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের উপপ্রধান মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিজ্ঞানের প্রধান অনুষঙ্গ ল্যাবের উপকরণ কেনায় এত কম টাকা রাখা সত্যিই বিস্ময়কর। এ বিষয়ে আপত্তি তোলার পর প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় সরকারি কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন হবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম প্রধান কাজী মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ প্রকল্পের আওতায় ল্যাবের উপকরণ কেনায় কম টাকা রাখা হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে। ল্যাবসহ অন্যান্য উপকরণে আলাদা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আরো প্রকল্প নেওয়া হবে। সেই জন্য এখানে ল্যাবে এত কম টাকা রাখা হয়েছে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আশঙ্কাজনক হারে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। প্রতিবছরই মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। যার প্রভাবে সরকারি কলেজগুলোতেও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন-পুরনো মিলে সারা দেশে এখন সরকারি কলেজ আছে ৩২৮টি। সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে নেওয়া ওই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এর পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কলেজে ১০ তলা ভবন করে তাতে চলন্ত সিঁড়ির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি গত বছর মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহীকমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলেও এ প্রকল্পে ল্যাবের ব্যয় কম ধরা, চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণ ও প্রতিটি কলেজে ১০ তলা ভবন করার প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি থাকায় এখনো সরকারি অর্ডার বা জিও জারি হয়নি। ফলে প্রকল্পের কাজও শুরু হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যুরো এডুকেশন ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিকসটিকসের (ব্যানবেইস) তথ্য মতে, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর হার ছিল ৪২ শতাংশ। সেটি এখন কমে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আর এইচএসসিতে ১৯৯০ সালে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর হার ছিল ২৮ শতাংশ। সেটি এখন কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী বছরে ১ শতাংশ হারে কমছে। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান বিভাগে যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ১৭ শতাংশ, সেটি এখন নেমে ১০ শতাংশে ঠেকেছে।

বিজ্ঞান শিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিজ্ঞান শিক্ষার পাঠদান ও ল্যাবের জীর্ণ দশা শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে ভর্তি হতে গিয়ে দেখে সেখানে ল্যাবসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নেই। অনেকটা নিরুপায় হয়ে তখন ছাত্র-ছাত্রীরা অন্য বিভাগের দিকে ঝুঁকছে।

ধামরাই সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিজ্ঞান হলো হাতে-কলমে শিক্ষা। আর হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য একটি ভালো ল্যাব আবশ্যক, যেখানে অত্যাধুনিক সব উপকরণ থাকবে। এসব নিশ্চিত করতে না পারলে কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে না।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বিজ্ঞানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে হলে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক আফতাব আলী শেখ মনে করেন, বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রধান কারণ বিজ্ঞান শিক্ষায় সুযোগ-সুবিধা নেই। ল্যাব নেই। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির যথেষ্ট অভাব আছে। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগে ভালো শিক্ষকও তেমন নেই। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা এখন বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে চায় না। বাণিজ্য বিভাগের দিকে ঝুঁকছে ছাত্র-ছাত্রীরা।

এদিকে নতুন ওই প্রকল্পের আওতায় লিফট না বসিয়ে সব কলেজে চলন্ত সিঁড়ি বসানো নিয়ে যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দিচ্ছে উচ্চশিক্ষা বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন। উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুক্তি হলো চলন্ত সিঁড়িতে শিক্ষার্থীদের ওঠানামা করতে সহজ হবে। আর লিফটের মাধ্যমে ওঠানামা করলে অনেক সময় অপচয় হবে। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটে আটকে যাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই প্রতিটি কলেজে লিফটের পরিবর্তে চলন্ত সিঁড়ি বসানোর মত উচ্চশিক্ষা বিভাগের।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সারা দেশে এখনো ২৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সুবিধাই পৌঁছেনি; সেখানে সরকারি কলেজে চলন্ত সিঁড়ি বসানো এক ধরনের বিলাসিতা। সেই কারণে প্রতিটি কলেজ ১০ তলার পরিবর্তে ছয়তলা করার পরামর্শ কমিশনের।

এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম প্রধান কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি কলেজ ১০ তলার পরিবর্তে ছয়তলার বিষয়ে সবাই ঐকমত্য হয়েছে। চলন্ত সিঁড়ি ছয়তলা পর্যন্ত নয়, তিনতলা পর্যন্ত করা হবে। বাকিটা লিফট থাকবে।’

তবে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। তিনি ৩০ এপ্রিল দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

উচ্চশিক্ষা বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, নির্বাচিত ২০০ সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে এখন সর্বমোট ৯৬ হাজার ৩৩৪ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে এইচএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থী আছে ৬৭ হাজার ৭৮৬ জন। বিএসসি পাস কোর্সে পাঁচ হাজার ৫০৫ জন এবং অনার্সে ২১ হাজার ৭৮৫ জন পড়াশোনা করছে। আর মাস্টার্সে আছে এক হাজার ২৫৮ জন।



মন্তব্য