kalerkantho


সড়কে পিষ্ট কর্মক্ষমতা

পার্থ সারথি দাস ও এস এম আজাদ    

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সড়কে পিষ্ট কর্মক্ষমতা

পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগে গত বুধবার দুপুরে কাতরাচ্ছিলেন দুই বোন হাসিনা বেগম ও শারমিন আক্তার, তাঁদের রক্ত দেওয়া হচ্ছিল। প্রত্যেকের বাঁ পা ভেঙে গেছে। প্রতিদিনের মতো সকালে তাঁরা গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে ভ্যানে চড়ে কোনাবাড়ী যাচ্ছিলেন। কোনাবাড়ী পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের সামনে ১০ চাকার একটি ড্রাম ট্রাক তাঁদের বহনকারী ভ্যানটিকে চাপা দিলে উভয়ের পা থেঁতলে যায়। হাসিনা তসুকা ট্রাউজার্সের এবং শারমিন ল্যাম্পস গ্রুপের কর্মী। দুর্ঘটনার পর তাঁদের প্রথমে নেওয়া হয় ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে, পরে পঙ্গু হাসপাতালে।

দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকটি স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের। হাসপাতালে উপস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামের কাছে চিকিৎসা সহায়তা চাইছিলেন হাসিনা ও শারমিনের স্বজনরা। কিন্তু শরীফুলকে ট্রাকচালকের দোষ এড়াতেই ব্যস্ত দেখা যায়। শারমিনের বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘শারমিনের আয়ে সংসার চলত। এখন শারমিনের চিকিৎসার অর্থই বা কে দেবে?’ হাসিনার ফুফাতো ভাই রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাসিনাকে দুপুরের মধ্যে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। খরচ আরো বাড়বে, কে দেবে তা?’ 

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, দেশে দিনে গড়ে ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যানুসারে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে এক হাজার ৪২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ৩৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছে চার হাজার ৩৮০ জন, যাদের মধ্যে ৫২ শতাংশেরই অঙ্গহানি বা অঙ্গ অচল হয়েছে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ৫২ শতাংশ মানুষই কর্মক্ষম ছিল।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ।

গবেষকরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনার পর ৮৭ শতাংশ ঘটনার তথ্যই সংগ্রহ করা হচ্ছে না। পুলিশের মধ্যস্থতায় সমঝোতা এর একটি বড় কারণ। ক্ষতিপূরণ মিলবে না মনে করে মামলা করতে আগ্রহ দেখায় না ক্ষতিগ্রস্ত বেশির ভাগ লোক। আইনি লড়াইয়ে বছরের পর বছর খরচ চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় না। কারণ ক্ষতিগ্রস্তদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভিকটিমোলজি ও রেস্টোরেটিভ জাস্টিস বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বেশির ভাগ অক্রান্ত হয় সাধারণ গরিব মানুষ। ভিকটিমরা অধিকারের ব্যাপারে সচেতন নয় বলেই সমঝোতা করে। মাথায় রাখতে হবে, সামান্য টাকায় সমঝোতা করলে নিজের যেমন দুর্ভোগ হবে তেমনি বেপরোয়া চালক এটিকে কোনো অপরাধ মনে করবে না। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সুনির্দিষ্ট আইনই নেই।’

মণ্টুর ক্ষতিপূরণের রায় ২১ বছর পর : দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে। ওই দুর্ঘটনার ২১ বছর পর ২০১০ সালে দুই কোটি এক লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ছয় বছর পর গত ডিসেম্বরে তাঁর পরিবারকে চার কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের মতে, দুর্ঘটনা আসলেই দুর্ঘটনা নয়, তার পেছনে চালক ও কম্পানির দায় আছে। এমনকি ইনস্যুরেন্স কম্পানিরও দায় আছে। দায় থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে বাস মালিক, চালকসহ সংশ্লিষ্টরা।

বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মোটরযান অধ্যাদেশের ১২৭ ধারায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আছে। জেলা জজ আদালতে মামলা করা যায়। কিন্তু অনেকে বিষয়টি জানে না। ফলে ক্ষতিপূরণও পায় না।

হাসপাতালে বাড়ছে অঙ্গহানির রোগী : সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করছে বছরে কয়েক হাজার মানুষ। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সিআরপিসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ফিজিওথেরাপি কেন্দ্রে তারা চিকিৎসা নিচ্ছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার শিকার মানুষের মধ্যে কর্মজীবীই বেশি। নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক মো. আবদুল গনি মোল্লার মতে, কর্মজীবীরা বেশি পঙ্গুত্ববরণ করছেন। পুরুষদের মধ্যে কর্মক্ষমই বেশি।

নিটোর কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত সেখানে ১৩ হাজার ৯৩১ জন চিকিৎসা নেয়। ২০০০ সালে চিকিৎসা নিতে যায় ৫৭ হাজার ৭৪৮ জন। ২০০১ সালে চিকিৎসা নেয় ৯৬ হাজার ৯৭৯ জন। ২০১৭ সালে এক লাখ ৩৩ হাজার ৪৯৩ জন সেবা নেয়।

সাভার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বা সিআরপি সূত্রে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু স্পাইনাল কর্ডে আঘাতপ্রাপ্তদের সেখানে ভর্তি করা হয়। এখন আছে ২৯ জন, যাদের ২৫ জন পুরুষ।

গাড়ির মালিক পাত্তাই দেয় না : গত ১০ এপ্রিল রাজধানীর ফার্মগেটে বাসচাপায় পা থেঁতলে যায় র‌্যাংগস প্রপার্টিজের অভ্যর্থনাকারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী রুনি আক্তারের। তাঁকে প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে এবং পরে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। রুনির পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে তিনবার। সর্বশেষ বড় অস্ত্রোপচার হয় গত ১৭ এপ্রিল। চিকিৎসকরা জানান, তাঁর পায়ের আঘাত গুরুতর। তাঁর সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাঁর চিকিৎসায় তিন লাখ টাকা দরকার। অফিসের সহকর্মীরা কিছু টাকা জোগাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু দায়ী বাসচালক ও মালিকরা রুনির খোঁজও নেননি। দুর্ঘটনায় জড়িত নিউ ভিশন পরিবহনের বাসচালক আবদুল মোতালেবকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। মামলাও হয়েছে। র‌্যাংগস প্রপার্টিজের মানবসম্পদ বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আরেফিন কালের কণ্ঠকে বলেন, তেজগাঁও থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে। বাসমালিক পাত্তাই দিচ্ছেন না। জানা গেছে, পাঁচ সদস্যের পরিবার চলত রুনির রোজগারে। রুনি এখন ইবনে সিনা হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখায় একটি কেবিনে আছেন।

পুলিশ-গাড়িমালিক সমঝোতা : গত ২৭ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগ এলাকায় হাশেম রোডে হিমাচল পরিবহনের বাসের ধাক্কায় নিহত হয় শিশু মিতু আখতার (১২)। মিতুর মা শিরিন বেগমও (৪০) আহত হন। মিতু ছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার পর বাসটি জব্দ করা হয়। মিতুর বাবা মিজানুর রহমান গতকাল বলেন, মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তাঁর স্ত্রী শিরিনের আরেকটি অস্ত্রোপচার করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় নিয়ে রাখা হলেও মেয়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানানো হয়নি শিরিনকে। মিজানুর কেঁদে বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা আমার পরিবারটিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ থানায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল মামলা করব কি না। আমার মানসিক অবস্থা তখন ভাল ছিল না। আমি না বলি। তখন পুলিশ বাসের মালিকের কাছ থেকে আমাকে এক লাখ টাকা নিয়ে দেয়। তারা বাস ছেড়ে দেয়। আমার স্ত্রীর চিকিৎসায়ই এর চেয়ে বেশি টাকা চলে গেছে। মেয়েটা তো আর ফিরেই পাব না। সবাই বলল, মামলা করলে কিছু পাবি না। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি আজই (গতকাল) ওসি হিসেবে এ থানায় যোগ দিয়েছি। ঘটনাটি খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।’

সিরাজগঞ্জ সদরের সুরিমেছরা গ্রামের বিজিবি সদস্য কামরুল ইসলাম ও সানোয়ারা ইসলাম দম্পতির একমাত্র মেয়ে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তামান্না ইসলাম (২২) কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে ধানমণ্ডিতে একটি মেসে থাকতেন। সেখানে বেড়াতে এসেছিলেন মা সানোয়ারা। গত ১২ জানুয়ারি সকালে বাড়ির উদ্দেশে মাকে বাসে উঠিয়ে দিতে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান তামান্না। ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বেপরোয়া গতির একটি বাস তাঁকে সজোরে ধাক্কা দেয়। তিনি পড়ে যান সড়কের মাঝখানে। প্রচণ্ড ধাক্কার কারণে তামান্নার স্পাইনাল কর্ড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আঘাত পান মাথায় ও বাঁ কানে। তামান্নার মামা রোকনুজ্জামান পথচারীদের সহায়তায় তাঁকে নিয়ে যান সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে তামান্নার চিকিৎসা চলে এক মাসেরও বেশি। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের চেন্নাইয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে ফিরে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল তামান্না সাভারে সিআরপিতে ভর্তি হন। তামান্না বলেন, ‘কোমরের নিচ থেকে আমার নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে। এখন হুইল চেয়ারই চলাচলের একমাত্র উপায়। ঘটনার পর পুলিশ বাসটি আটক করেছিল। মালিক সমিতির লোকজন ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। একজন লোক তখন এসে নাকি খোঁজ নিয়েছিল। আমার খারাপ অবস্থা দেখে সটকে পড়ে। পরে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি। পুলিশের এক কর্মকর্তা তখন মামলা করার বিষয়ে জানতে চান। তবে আমাকে নিয়ে ছোটাছুটির কারণে কেউ সেদিকে যায়নি।’ তামান্নার বাবা কামরুল ইসলাম বলেন, তাঁর মেয়ের চিকিৎসায় এরই মধ্যে ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। পুরো পরিবারটি এক বিপদের মধ্যে পতিত হয়েছে। দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, ‘তামান্নার ঠিক কোনো ঘটনা মনে নেই। একটি ঘটনা মনে আছে, ভিকটিম মামলা করতে চায়নি। তবে আমরা মামলা করে ড্রাইভারকে বিজ্ঞ আদালতে চালান দিয়েছি।’

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাসুরিয়া গ্রামের কৃষিজীবী সুবাস শিকদারের স্ত্রী সুহাসিনী শিকদার (৩০)। সাভারে সিআরপির স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি ওয়ার্ডে (ফিমেল) উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হয় তাঁকে। অনেক কষ্টে মাথা কিছুটা উঁচু করে কথা বলতে পারলেও একদম নড়াচড়া করতে পারেন না। তিনি বলেন, মেয়ে শম্পা (১৩) ও সঙ্গীতাকে (৯) নিয়ে তিনি গত বছরের ১৪ নভেম্বর একই উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামে বোন ইতিকার বাড়িতে যাচ্ছিলেন ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানে চড়ে। বাস পেছনে থেকে তাঁদের ভ্যানটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই ওই ভ্যানে থাকা তাঁর বড় মেয়ে শম্পা ও প্রতিবেশী সুমি নিহত এবং তিনি ও ছোট মেয়ে সঙ্গীতা গুরুতর আহত হয়। তাদের প্রথমে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে এবং পরে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঙ্গীতার দুই পা ভেঙে গেছে এবং তাঁর ঘাড়ের নিচ থেকে অবশ হয়ে গেছে। স্পাইনাল কর্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দফা রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি সিআরপিতে ভর্তি হন। বাড়িতে বসবাসের জন্য ২ শতাংশ জমি ছাড়া তাঁদের কিছুই নেই। অন্যের দয়ায় বেঁচে আছেন। এক মেয়েকে হারিয়ে এবং অন্য মেয়ের দুই পা হারিয়ে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকা সুহাসিনীর এখন বেঁচে থাকাই একমাত্র স্বপ্ন। সুহাসিনী বলেন, ঘটনার পর থানায় ডেকে ওই বাসের লোকজন মেয়ের দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা দেয়। এরপর আর কোনো সুরাহা হয়নি। মামলা করার কথা বললেও পরে আর কেউ করেনি।

চার বছরেও সরকারি সহায়তা নেই : চার বছর আগে ঢাকা থেকে পিকআপে করে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন সজীব শিকদার। গাড়ি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের সিএনজি অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে চট্টগ্রামে যাওয়াার পথে কুমিল্লার মিয়াবাজারে অন্য একটি পিকআপের সঙ্গে তাঁকে বহনকারী পিকআপের সংঘর্ষে ডান পা হারান সজীব। দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রীসহ ছয়জনের পরিবার টানতে হচ্ছে এ সজীবকেই। চলতে হয় লাঠিতে ভর দিয়ে। বড় মেয়ে রুমকী শিকদারের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে বাবার দুর্ঘটনার পর থেকেই। সজীব চট্টগ্রামের বাদুরতলায় নিউ শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজে বসে ব্যবসা দেখভাল করেন। দুর্ঘটনার পর কোনো মামলা হয়নি, তাঁর ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো সহায়তাও। গতকাল বৃহস্পতিবার সজীব বলেন, ‘পায়ে ভর দেওয়ার এক জোড়া লাঠি দিয়েছিলেন একজন। ছেলে হৃদয় শিকদার এসএসসি পাস করে কলেজে পড়ছে। আরেক ছেলে রিপন শিকদার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বসে থেকে যে বেতন পাচ্ছি, তাতে সংসার টেনেটুনে চলছে।’

আশরাফুলের দেড় বছর হারিয়ে গেছে : গত বছরের ২৮ আগস্ট কুষ্টিয়ার বাগচড়ায় নিয়ন্ত্রণহীন একটি ট্রাক উল্টে আহত হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অনার্স তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র মোহাম্মদ আশরাফুল। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড উপজেলার জোড়াপুকুরিয়া গ্রামের দরিদ্র ছানোয়ার হোসেনের ছেলে আশরাফুলের বাঁ পা ভেঙে দুই টুকরা হয়ে যায়। পঙ্গু হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। তবে ট্রাকের মালিকপক্ষ আশরাফুলের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দায় এড়ায়। ছয় মাসের বেশি সময় পর রড লাগিয়ে জোড়া দেওয়া হয়েছে তার পা। মানুষের সহায়তা নিয়ে চিকিৎসা করতে দেরি হয়। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারলেও শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে গেছে দেড়টি বছর। এক বছর লেখাপড়াই বন্ধ ছিল।



মন্তব্য