kalerkantho


মাদকে খুলনা ডুবিয়ে টাকার পাহাড়ে এমপি মিজান

হায়দার আলী   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মাদকে খুলনা ডুবিয়ে টাকার পাহাড়ে এমপি মিজান

খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এই কয়েক বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের আলিশান বাড়ি, খুলনার শহরতলিতে ৫০ কোটি টাকার জমি, স্ত্রীর নামে সোনাডাঙ্গায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের তিনতলা বাড়ি এবং নিজের সন্তানদের নামে কয়েক শ বিঘা জমি কিনেছেন। এ ছাড়া রাজধানীর গুলশান ও ধানমণ্ডিতে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। নিজের পরিবারের বাইরেও স্বজনদের নামে এবং বেনামে সম্পদ রয়েছে তাঁর। এমপি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদক সূত্রে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি কিছু অনুসারী দিয়ে মাদক ব্যবসা ও টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। জনপ্রতিনিধিত্বের দায়িত্বটি তাঁর জন্য ধরা দেয় আলাদিনের চেরাগ হিসেবে। এমপি মিজানকে গতকাল সোমবার দুদকে ডাকা হয় এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে জানিয়ে কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অনুসন্ধানের প্রয়োজনে উনাকে আবারও ডাকা হতে পারে।’

মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজিসহ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদ গড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এমপি মিজান সব অভিযোগই অস্বীকার করেন। তিনি নিজ দলের ওপর মহলের কোনো ব্যক্তির ইশারায় অভিযোগ আসছে বলেও দুদক কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ তোলেন। কিন্তু ঢাকা ও খুলনায় জমি, ফ্ল্যাট এবং গাড়ি-বাড়ির মালিকসহ কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন কিভাবে—এমন প্রশ্নের যুক্তিসংগত জবাব দিতে পারেননি এমপি মিজানুর। দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি আমলে নিয়েই অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।’

দুদকে আসা অভিযোগের সূত্র ধরে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনুসন্ধানে নেমে এমন অভিযোগে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন। দুদকের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুদক অনেক অভিযোগ নিয়েই অনুসন্ধানে নামে। যেসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদি পায় সেসব অভিযোগের বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। একইভাবে এমপি মিজনুর রহমানের বিষয়েও প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজনে উনাকে আবার ডাকা হতে পারে।’

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, সিটি করপোরেশনে একচেটিয়া টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্নভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গতকাল মিজানুর রহমানকে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলে। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ প্রায় সোয়া পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এমপি মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। গত ৪ এপ্রিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার পর গতকাল মিজান দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদক কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল বিকেলে এমপি মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দুদক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাকে ডেকেছিল, আমি এসেছি এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। আমি দুদককে বলেছি, এ ধরনের বিষয়ের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আপনারা যাচাই-বাছাই করেন, অনুসন্ধান করে দেখেন। আমার বিশ্বাস কিছু মানুষ আমার জনপ্রিয়তায় ভিত হয়ে ষড়যন্ত্র করে এ ধরনের বানোয়াট মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে সুনাম নষ্ট করতেই এমন অভিযোগ করেছে দুদক কার্যালয়ে। এমপি মিজান আরো বলেন, ‘আমি চাই দুদক যেন সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে; আর ডিজিটালের যুগে তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। দুদক সব তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সঠিকভাবে তদন্ত করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। আমি মনে করি এটারও প্রয়োজন আছে। ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্ত করে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছিল কেউ।’ এমপি মিজান আরো বলেন, ‘আমি মনে করি অতিসত্বর তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যেকোনো দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জন এ ধরনের কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমি কখনোই ছিলাম না এবং আগামীতেও সম্পৃক্ত হব না। আমার বিশ্বাস সঠিকভাবে তদন্ত করলে এটা বেরিয়ে আসবে।’

জানা গেছে, খুলনা মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে অলিতেগলিতে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। সরকারের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খুলনা নগরীর মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় এমপি মিজানুর রহমানসহ ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মীর নাম উঠে আসে। এরপর এমপি মিজানসহ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খুলনা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক ছাড়াও খুলনা সিটি করপোরেশনসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন এমপি মিজান। তাঁর ঘনিষ্ঠ হাফেজ শামীম, মহানগর আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক ও মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেল, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও ২১ ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামসুজ্জামান মিয়া স্বপনসহ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। এমপি মিজানের সঙ্গে আছেন রাজাকার পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিস বিশ্বাস। আনিস বিশ্বাস খুলনা সিটির ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমপি মিজানের বিরুদ্ধে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহীদ ইকবাল বিথার খুনের অভিযোগ রয়েছে। বিথার খুনে চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি। প্রভাব খাটিয়ে এমপি মিজান তাঁর বোন অ্যাডভোকেট সুলতানা রহমান শিল্পীকে পিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি শিল্পীর পিপি পদ বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেভেন মার্ডারের হোতা নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনের সঙ্গে এমপি মিজানুর রহমানের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং খুলনায় মাদক ব্যবসা বিস্তারে সম্পর্কটির প্রভাব ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, খুলনার পরিবহন খাতও এমপি মিজান ও তাঁর ক্যাডারদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতি দখল করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন এমপি মিজান। খুলনা শহরে অবৈধ ইজি বাইক চলাচলকারীর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক তিনি। সেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকার বেশি চাঁদা উত্তোলন করা হয়।

খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কালের কণ্ঠকে জানান, এমপি মিজানুর রহমান মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজি আর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ৫০০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। স্কুল ও কলেজের ছেলেরাও এখন ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে। একজন নেতা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘এমপি মিজানের মদদে রাজাকারের ছেলেও নগরীর ভারপ্রাপ্ত মেয়র হয়ে যায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় এবং নিজের পথের কাঁটা ভেবে এমপি যুবলীগ নেতাকেও হত্যা করতে পিছপা হননি।’

খুলনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেই বিষয় নিয়ে আমার কথা বলাই ঠিক নয়। একজন এমপির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আমরা দলের নেতা হিসেবে প্রত্যাশা করি না।’

খুলনা জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত এ খোদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে অসন্মানিত বোধ করি এবং আমরা বিব্রতকর হই।’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে ছেয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এলাকার যুবক ও তরুণরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’

এ ছাড়া অবৈধ সম্পদ ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিক, ঝালকাঠির এমপি বি এইচ হারুন, নরসিংদীর কামরুল আশরাফ খান পোটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে দুদক। বিএনপির প্রভাবশালী শীর্ষ আট নেতার বিরুদ্ধেও ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিক লেনদেন এবং অর্থপাচারের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক।

 


মন্তব্য