kalerkantho


জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল

তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা নিয়ে ছেলেখেলা!

আরিফুর রহমান   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা নিয়ে ছেলেখেলা!

জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব মোকাবেলায় সরকার গত আট বছরে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সুফল সামান্যই মিলেছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, নেই নজরদারির ব্যবস্থা। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি) থেকে বিভিন্ন জেলায় ৪৫০টির মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, অথচ নিজস্ব লোকবল মাত্র ৭০ জন।

সাত জেলার ২০ প্রকল্প সরেজমিনে ঘুরে এবং সাধারণ মানুষ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বিসিসিটি কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদক জেনেছেন, জলবায়ু তহবিল নিয়ে রয়েছে নানা সমস্যা, বিস্তর অভিযোগ। এর মধ্যে আছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় প্রকল্প দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে বঞ্চিত করে কম ঝুঁকির এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, নজরদারি না থাকা, শর্ত থাকার পরও জলবায়ু তহবিলের টাকার প্রকল্পে সাইনবোর্ড লাগানো বাধ্যতামূলক হলেও তা না টাঙানো, পাস হওয়া নকশা পরিবর্তন করে ফেলা, নিম্নমানের কাজ, বারবার মেয়াদ বাড়ানো প্রভৃতি।

বেপরোয়া অনিয়মের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, জলবায়ু তহবিলের আওতায় নেওয়া প্রকল্পগুলো নিরীক্ষা করছে না মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়। প্রকল্প নজরদারি করে না পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও (আইএমইডি)। অবশ্য ট্রাস্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের নিজস্ব কমিটি প্রকল্পগুলো নজরদারি করছে; এ ছাড়া বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো আলাদাভাবে নজরদারি করছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও প্রকল্প পরিদর্শন করা হয়। তবে

প্রকল্প এলাকার মানুষ বলছে, নজরদারি চলার কথা তাদের জানা নেই। ট্রাস্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (বিআইডিএস) দিয়ে ২৭টি প্রকল্প মূল্যায়ন করানো হচ্ছে।

নাটোর জেলার গুরুদাসপুর পৌরসভার রসুনহাটা মাদরাসা থেকে বাবুল মেয়রের বাড়ি পর্যন্ত নন্দনকুজা নদীর পাড় রক্ষা প্রকল্প এবং ময়মনসিংহ পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের নকশা মানা হয়নি। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই সব কার্যক্রম শেষ। রক্ষণাবেক্ষণ বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে না।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে জনবল কাঠামো ৮২ জনের। এর মধ্যে পদ খালি আছে ১২টি। জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পগুলো নজরদারি করে থাকে ট্রাস্ট ফান্ডের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। এ বিভাগে একজন পরিচালকের নেতৃত্বে পাঁচজন কর্মকর্তা আছেন। ট্রাস্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে ১৪০ জনের নিয়োগসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন।

সাতক্ষীরা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে তহবিলের ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বেতনা নদী পুনঃখননের সিদ্ধান্ত নেয় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টি বোর্ড। প্রকল্পের কাজ শুরুর পর দেখা যায়, পুনঃখননের পর নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় চার কোটি টাকা খরচও হয়ে গেছে। মাঝপথে এসে প্রকল্পটির কাজ স্থগিত করে দেওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড কর্তৃপক্ষ এখন স্বীকার করছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এই প্রকল্প নেওয়া সমীচীন হয়নি। এতে সরকারি টাকার অপচয় হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলার বেতনা নদী পুনঃখনন, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুর ইউনিয়নে কালনী-কুশিয়ারা নদীভাঙন থেকে পাহাড়পুর বাজার রক্ষা এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শিমুলিয়া বাজার নদীভাঙন  থেকে রক্ষা প্রকল্পও মাঝপথে বাতিল হয় সমীক্ষা ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে। এ রকম আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প স্থগিত কিংবা বাতিল করেছে ট্রাস্টি বোর্ড।

এ ছাড়া ট্রাস্টি বোর্ড থেকে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রশাসনিক অনুমোদন আদেশ জারি করতে অনেক সময় লেগে যায়। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ এই সময়ে জলবায়ু তহবিল থেকে একটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকা নেওয়া যেত। কিন্তু তহবিলের টাকায় দুর্নীতি এতটা প্রকট আকার ধারণ করে, বিসিসিটি কর্তৃপক্ষ গত বছর প্রকল্পপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকার পরিবর্তে সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেয়। 

‘ঢাকা শহরের গুলশান, বারিধারা ও ধানমণ্ডি এলাকা এবং চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ ও খুলশী এলাকার বর্জ্য কমিয়ে তা পুনর্ব্যবহার’ শিরোনামের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় সেই ২০১০ সালে। পাঁচবার মেয়াদ বাড়িয়েও প্রকল্প শেষ হয়নি। মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যেও প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না বলে জানিয়েছেন পরিচালক সুবোল বোস মনি।

জলবায়ু তহবিলের টাকায় নেওয়া প্রকল্পের মেয়াদ কেন বাড়ে এ প্রসঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনাকালে একজন মেয়র, একজন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং একজন ঠিকাদার তিনজনই দুষলেন বর্তমান পদ্ধতিকে। ঝালকাঠি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু হানিফ বলেন, পৌরসভার তৈরি করা প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হয়ে তারপর যায় ট্রাস্ট ফান্ড অফিসে। অর্থ ছাড়ের বেলায় একই নিয়ম। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট পৌরসভার মেয়র নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার পৌরসভার একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির চিঠি ঢাকা থেকে যখন পৌঁছে ততক্ষণে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রথি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম মনে করেন, জলবায়ু তহবিলের টাকায় নেওয়া প্রকল্পে বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করা জরুরি।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদও মনে করেন বর্তমান প্রক্রিয়াটা অনেক লম্বা ও জটিল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের জনবল কম। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে জনবলের অভাব আছে। আমরা চেষ্টা করছি সমস্যা সমাধানে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক জেলা আছে যেখানে আর্সেনিক সমস্যা। লবণাক্ততা প্রকট। সেসব জেলার জন্য জলবায়ু তহবিলের টাকা দেওয়া উচিত, অন্য জেলার রাস্তাঘাট ও ড্রেন নির্মাণে নয়।’

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব দীপক কান্তি পাল বলেন, জনবল বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনাধীন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জলবায়ু তহবিলের প্রকল্প হওয়া উচিত বাস্তবতার নিরিখে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে; প্রভাবশালীকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নয়।’

জলবায়ু তহবিলের টাকায় নেওয়া প্রকল্পে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত।

উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠ ‘জলবায়ু পরিবর্তনের টাকা অপাত্রে’ শিরোনামে লিড নিউজ ছাপে।

 

 



মন্তব্য