kalerkantho


বাংলাদেশ সম্পর্কে জাতিসংঘ কমিটির স্বীকৃতি

উন্নয়নশীল হওয়ার সব সূচক অর্জিত

২০২১ সাল পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকলেই যোগ্য বিবেচিত হবে

মেহেদী হাসান   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়নশীল হওয়ার সব সূচক অর্জিত

বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ (লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি, এলডিসি) থেকে উত্তরণের সব সূচক অর্জন করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) মূল্যায়ন শেষে এ কথা বলা হয়েছে। সিডিপি জানায়, তিন বছর পর ২০২১ সালে উন্নয়নবিষয়ক কমিটি যে মূল্যায়ন করবে সেখানেও বাংলাদেশ সব সূচক অর্জন করলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

জেনেভায় অবস্থানরত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম গতকাল শুক্রবার দুপুরে তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক কমিটি গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে নিউ ইয়র্কে বৈঠকে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উত্তরণের সব সূচক প্রথমবারের মতো অর্জন করেছে। আজকে (শুক্রবার) তারা আমাদের জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে এটা নিশ্চিত করে একটা চিঠি হস্তান্তর করবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো লিখেছেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরে পর পর দুইবার এটা অর্জন করলেই চূড়ান্তভাবে একটা দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমাদের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে এবং ২০২১ সালে আবারও তা নিশ্চিত করতে হবে একই সূচকগুলো অর্জনের মধ্য দিয়ে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সময় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু ও শহীদদের স্মরণ করেন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এদিকে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিকবিষয়ক বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও লাওস ও মিয়ানমার প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করেছে। তাদেরও উত্তরণবিষয়ক যোগ্যতা অর্জনের জন্য ২০২১ সালে পরবর্তী পর্যালোচনার সময়ও সব শর্ত পূরণ করতে হবে। উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি ভুটান, কিরিবাতি, সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপে এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জকে স্বল্পোন্নত দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিকবিষয়ক বিভাগের উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটির সভাপতি হোসে অ্যান্তোনিও ওকাম্পো বলেছেন, এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বল্পোন্নত দেশ ক্যাটাগরি শুরুর পর গত ৪৭ বছরে ওই চারটি দেশের আগে মাত্র পাঁচটি দেশ (বতসোয়ানা, কাবো ভারদে, ইকুয়েটোরিয়াল গায়ানা, মালদ্বীপ ও সামোয়া) ওই তালিকা থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছে। ২০২০ সালে ভানুয়াতু ও ২০২১ সালে অ্যাঙ্গোলার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে।

ওকাম্পো বলেন, ‘আমাদের সুপারিশগুলো ইকোসকে (জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ) গৃহীত হলে ২০১৮ সাল হবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। ইতিপূর্বে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটা দেশগুলোর সংখ্যার অর্ধেকের বেশি দেশের উত্তরণ ঘটবে এ বছর। উন্নয়নবিষয়ক পর্যালোচনা কমিটির একক কোনো বৈঠকে এতসংখ্যক দেশকে এর আগে পর্যালোচনা করা হয়নি।’

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিকবিষয়ক বিভাগ জানায়, কোনো দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন পর্যালোচনা করে উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি তার উত্তরণের সুপারিশ করে থাকে। ওই কমিটিই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করে থাকে। উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি নতুন কোনো দেশকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এবং উত্তরণের জন্য তিন বছর পর পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে। কেবল শর্ত পূরণই নয়, দেশবিষয়ক সম্পূরক তথ্য (সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ে জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাগের মূল্যায়ন, ভঙ্গুরতাবিষয়ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা আংকটাডের মূল্যায়ন) এবং সরকারের বক্তব্যও কমিটি আমলে নিয়ে থাকে।

এবারের বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া মূল্যায়নের যেসব মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে সেগুলো হলো মাথাপিছু ‘গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম (জিএনআই)’ ১২৩০ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি (শুধু আয়ের মানদণ্ডের ক্ষেত্রে দুই হাজার ৪৬০ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি), হিউম্যান অ্যাসেটস ইনডেক্স (এইচএআই) ৬৬ বা তারও বেশি, ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স (ইভিআই) ৩২ বা তার চেয়ে কম। কমিটি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে উত্তরণের সূচক বা মানদণ্ড নির্ধারণ করে থাকে। তিন বছর পর পর অনুষ্ঠেয় দুটি পর্যালোচনায় সেই সূচক বা মানদণ্ডগুলোর অন্তত দুটি পূরণ করতে হয় এলডিসি থেকে উত্তরণে আগ্রহী দেশকে। শুধু আয়ের মানদণ্ড দিয়ে কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে তার মাথাপিছু আয় জিএনআইয়ের অন্তত দ্বিগুণ হতে হবে।

২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল এক হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের এইচএআই স্কোর ৭২.৯ এবং ইভিআই ২৪.৮। সব সূচক অর্জন উপলক্ষে সরকারের উদ্যোগে আগামী ২২ মার্চ দেশব্যাপী উদ্‌যাপন অনুষ্ঠান এবং ২৩ মার্চ ঢাকার একটি হোটেলে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে।

পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ : জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিকবিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে এলডিসি থেকে উত্তরণে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো দেশ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছে বলে উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি মূল্যায়ন করার পর জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাগ (ইউএন ডেসা) সংশ্লিষ্ট দেশকে তা জানায়। তিন বছর পর পরবর্তী মূল্যায়নের আগেই আংকটাড ভঙ্গুরতাবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দেশকে তার খসড়া সরবরাহ করে। ইউএন ডেসা সম্ভাব্য প্রভাববিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দেশকে তার খসড়া সরবরাহ করে। সংশ্লিষ্ট দেশ আংকটাড ও ডেসার খসড়া প্রতিবেদনের ওপর মন্তব্য করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশ দ্বিতীয় পর্যালোচনা বৈঠকের আগে কমিটির বিশেষজ্ঞ গ্রুপের বৈঠকে তার মতামত দেবে।

তৃতীয় বছরে সংশ্লিষ্ট দেশের সব শর্ত পূরণ হলে উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি তার উত্তরণের যোগ্যতা আছে বলে নিশ্চিত করে এবং উত্তরণের জন্য ইকোসকের কাছে সুপারিশ করে। উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে ইকোসক তা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠায়।

তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশ উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সংশ্লিষ্ট দেশ চাইলে উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটিকে তার কৌশল জানাতেও পারে। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) পরামর্শক গ্রুপসহ এ ধরনের বিষয়ে সহযোগিতা দেবে। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাতিসংঘ সহযোগিতা দেবে। উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদাররাও পরামর্শমূলক বৈঠকগুলোতে অংশ নেবে। এই বছরগুলোতে (দ্বিতীয় দফায় পর্যালোচনা থেকে তিন বছর) উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি ইকোসকের কাছে ওই দেশ সম্পর্কে বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবে। ষষ্ঠ বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালে দেশটির এলডিসি থেকে উত্তরণ কার্যকর হবে এবং এলডিসি ক্যাটাগরিতে তার নাম থাকবে না।

এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট দেশ তার রূপান্তর কৌশল বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা করবে। এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর প্রথম তিন বছর বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটিকে দেবে এবং দ্বিতীয় ত্রৈবার্ষিক পর্যালোচনা থেকে প্রতি তিন বছরে একবার করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবে।

এ সময় উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, তারা এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেশের রূপান্তর কৌশল বাস্তবায়নে সমর্থন দেবে। এলডিসি হিসেবে ওই দেশের এর আগে পাওয়া সুবিধাগুলো আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেবে না।


মন্তব্য