kalerkantho


লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা

নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার পাইলট আবিদের মৃত্যুর খবরে তাঁর শোকস্তব্ধ পরিবার। ছবি : কালের কণ্ঠ

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মৃতদেহ চিহ্নিত করার জন্য। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় তারা কাঠমাণ্ডুতে পৌঁছালেও সারা দিনে লাশের কাছে যেতে পারেনি। লাশ কবে নাগাদ দেশে পৌঁছাবে তা জানেন না বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিষয়টি স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় নেপালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘নেপাল কর্তৃপক্ষ সব ধরনের সহায়তা করবে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই লাশ দেশে নেওয়া হবে।’ নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, ‘লাশ দেখতে না দেওয়ার বিষয়টি আমরা জানি না। এই মাত্র জানলাম। আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’

ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ছয় কর্মকর্তাকে বদলি : উড়োজাহাজটির দুর্ঘটনায় পড়ার সময় নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে (এটিসি) দায়িত্বরত ছয় কর্মকর্তাকে ওই কার্যালয় থেকে বদলি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এ ছয় কর্মকর্তার মানসিক আঘাত প্রশমনে এ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নেপালের ইংরেজি দৈনিক মাই রিপাবলিকার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপমহাপরিচালক রাজন পোখারেল বলেছেন, ‘নির্মম ঘটনার পর মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে এটাই মানসম্মত পদ্ধতি। তাঁরা বিশাল একটি দুর্যোগের সাক্ষী। এ কারণে তাঁদের মানসিক চাপ কমাতে আমরা তাঁদের অন্য বিভাগে বদলি করেছি।’ বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট ও এটিসি টাওয়ারের কর্মকর্তাদের সর্বশেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের সঙ্গে তাঁদের বদলির সম্পর্ক নেই বলে জানান তিনি।

এক ঘণ্টা বাড়তি আকাশে উড়ল মন্ত্রীকে বহনকারী বিমান : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাঠমাণ্ডুগামী ফ্লাইট (বিজি-০০৭১) গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়। নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে সেটির ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের কথা ছিল। কিন্তু রাডারের কোনো সিগন্যাল না পাওয়ায় সেটি ওই সময় অবতরণ করতে পারেনি। প্রায় এক ঘণ্টা আকাশে সেটি চক্কর দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল এভিয়েশনের দুই কর্মকর্তা ও একজন সাংবাদিক। ওই ফ্লাইটে ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামালসহ সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ছিলেন বাংলাদেশি সাংবাদিকসহ শতাধিক যাত্রী। এ সময় তাঁদের মধ্যে উত্কণ্ঠা তৈরি হয়। একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক জানান, দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে বিমানের ক্যাপ্টেন ঘোষণা দেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে কাঠমাণ্ডু বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছি। তবে আমাদের এখনো ল্যান্ডিং টাইম (অবতরণের সময়) দেওয়া হয়নি। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অতিরিক্ত ফ্লাই করে ল্যান্ড করতে পারব।’ তাঁর এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মধ্যে উত্কণ্ঠা দেখা যায়। এর ১০ মিনিট পর আসে নতুন ঘোষণা। ক্যাপ্টেন বলেন, ‘বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছি এবং ল্যান্ডিং টাইম পেয়েছি। আমাদের স্থানীয় সময় ১২টা ৫০ মিনিটে অবতরণের কথা থাকলেও অবতরণের সময় দেওয়া হয়েছে ১টা ৫০ মিনিট। আশাকরছি ১টা ৫০ অথবা ২টার মধ্যে আমরা নিরাপদে কাঠমাণ্ডুতে অবতরণ করব।’ এরপর স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে।

স্বজনদের নেপালে থাকার খরচ বহন করবে ইউএস-বাংলা : ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জিএম কামরুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের টিম নেপালে পৌঁছেছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে বলছি, বিমানে ক্যাপ্টেন, ক্রুসহ বাংলাদেশের ৩৬ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন মারা গেছেন। ১০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসধীন। আমরা অপেক্ষায় আছি, যত দ্রুত সম্ভব সেখানকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে এনে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য। সেখানে যাঁরা চিকিৎসধীন আছেন তাঁদের যাবতীয় চিকিৎস খরচসহ অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করছে ইউএস-বাংলা।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ৪৬ জনকে আমরা সকালে কাঠমাণ্ডু পাঠিয়েছি। প্রয়োজনে তাঁরা সেখানে যত দিন থাকবেন তার যাবতীয় খরচ বহন করবে ইউএস-বাংলা। আমরা তাঁদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছি।’ তিনি বলেন, যেহেতু বার্ন ইস্যু রয়েছে, তাই মরদেহ চিহ্নিত করতে বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন চলছে। দুর্ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ এই এয়ারক্রাফটি এর আগেও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা ঠিক না। আমি নিশ্চিত করে বলছি, এই এয়ারক্রাফট সেই এয়ার ক্রাফট না।’

বিমানমন্ত্রীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন : গতকাল দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী শাহজাহান কামাল। তিনি আহতদের দেখতে বিভিন্ন হাসপাতালে যান। সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নেপালের সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে তারা প্রাথমিক ধারণা দিয়েছে। ব্ল্যাক বক্সের রিপোর্ট পাওয়া গেলে সব কিছু জানা যাবে। ওদের তদন্তে আমাদের বিশেষজ্ঞরাও যোগ দেবেন।’

তদন্ত শুরু করেছে নেপাল : বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের সংগৃহীত ডেটা রেকর্ডার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক এ তথ্য জানিয়েছেন। রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কানাডার বোমবার্ডিয়ার বলেছে, তারা তদন্তের কাজে নেপালে একটি দল পাঠাচ্ছে। বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেত্রি বলেন, ‘ধ্বংসাবশেষ থেকে ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা সেটি নিরাপদে রেখেছি।



মন্তব্য