kalerkantho

ডট বলেই সর্বনাশ

সামীউর রহমান, কলম্বো থেকে   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ডট বলেই সর্বনাশ

বাংলাদেশ কোনো ওভার মেডেন দেয়নি। বাংলাদেশ ১০ ওভার মেডেন দিয়েছে। জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনে এরকম যুক্তি দিয়ে রোবটকে বিভ্রান্ত করার কথা লেখা হয়েছে বহুবার। কারণ বাংলাদেশ মেডেন দেয়নি আবার ১০ ওভার মেডেন দিয়েছে, দুটো বাক্যই সত্যি হতে পারে না। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পেরেছে! ৪ ওভার করে বোলিং কোটা পূরণ করা ভারতের ৫ বোলারের কারো নামের পাশেই স্কোরকার্ডে মেডেনের ঘরে শূন্য। অথচ গোটা ম্যাচে মোট ডট বলের সংখ্যা ৫৫! ৯ ওভারের চেয়েও ১ বল বেশি, অর্থাৎ ১২০ বলের খেলায় ৫৫ বল থেকে কোনো রানই নেয়নি বাংলাদেশ। তার পরও যে রানটা ১৩৯ পর্যন্ত গেছে সেটাই তো বড় কথা!

এমন কথা সংবাদ সম্মেলনে এসে যদি দলের পক্ষে কেউ এমনটাই দাবি করতে পারেন। অতীতেও নানা সময়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে খোঁড়া যুক্তিতে অক্ষমতা আড়ালের প্রবণতা দেখা গেছে। তাই আশঙ্কাটা অমূলক নয়। যদিও টি-টোয়েন্টিতে ৫৫ বলে কোনো রান করতে না পারার মতো উইকেট ছিল না প্রেমাদাসায়, অন্তত ভারতের ব্যাটিং দেখে তা মনে হয়নি। আসলে বাংলাদেশ বেশি ডট বল দিয়েছে দ্রুত রান তোলার প্রচেষ্টায়, স্কোরকার্ড তো এটাই সাক্ষ্য দেয়।

দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে শুরু সৌম্য সরকারের। দুই বল পর আবারও একই শট খেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বলের লেন্থ মাপতে করেছিলেন ভুল। ফল, ফাইন লেগে ক্যাচ। তামিম ইকবাল একবার রোহিত শর্মার হাতে ক্যাচ তুলে দেওয়া থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন, কাভারে তাঁর ঠিক সামনে পড়েছিল বলটা। এরপর শার্দূল ঠাকুরের বলে আম্পায়ার লেগ বিফোর উইকেটের আবেদনে সাড়া দিলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। আম্পায়ার কেন আউট দিলেন, সেই রাগটা ঝারতেই পরের দুটো বলে বাউন্ডারি মারলেন, তৃতীয়টা মারার চেষ্টায় সেই ফাইন লেগেই ক্যাচ দিলেন। এরপর মুশফিক, পুল করে ছক্কা মারলেন, পরের বলটা ছেড়ে দিলে হয়তো ওয়াইডই পেতেন। মুশফিক এগিয়ে এসে ব্যাট চালিয়েছিলেন, কানায় লেগে বল গেছে দীনেশ কার্তিকের গ্লাভসে। এবার মাঠের আম্পায়ার আউট দেননি, কিন্তু রোহিত শর্মা রিভিউ নিলে দেখা যায় ব্যাটে লেগেছিল বল। ১৫তম ওভারের শেষ বলটায় চার মারলেন সাব্বির, পরের ওভারের প্রথম বলেই লিটন দাস আউট। এভাবেই যতবার গতির পাল্লাটা বাড়াতে গেছে বাংলাদেশ, ততবারই হোঁচট প্রথম পদক্ষেপেই। নতুন ব্যাটসম্যান আসা মানেই সেট হতে খানিকটা সময় নেওয়া অথচ সময় আসছে ফুরিয়ে। ফলে তৈরি হচ্ছে চাপ। তার থেকে ভুল এবং উইকেট পতন। এই এক ভুলের দুষ্টচক্রে পড়েই তো ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া বাংলাদেশের।

অনুপাতের হিসাবে ডট বল সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন মাহমুদ উল্লাহ। তাই অধিনায়ক যে অন্যদের দিকে ডট বল বেশি দেওয়ার অভিযোগের আঙুল তুলবেন, সেই উপায়ও নেই। ৮ বল খেলে ১ রান করে এক্সট্রা কাভারে ক্যাচ দিয়েছেন মাহমুদ। ম্যাচের আগের দিন অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আর নিজেদের কাজটা ঠিকভাবে করার কথা বলেছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ে। কাল অমন ইনিংসের পর নিজেকে হয়তো মিথ্যাবাদীই মনে হবে তাঁর। মাহমুদের এই ১২.৫০ স্ট্রাইকরেটের ইনিংসটা বাদ দিলে বাকিদের স্ট্রাইকরেট কিন্তু খালি চোখে দৃষ্টিকটু মনে হবে না। তামিম ১৬ বলে করেছেন ১৫ রান, মুশফিক ১৪ বলে ১৮, লিটন ৩০ বলে ৩৪। তবে ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে স্কোরিং শটের অঙ্কে, শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই।

তামিমের ১৬ বলের ইনিংসে দুটো বাউন্ডারি, অর্থাৎ দুই বলেই তিনি করেছেন ৮ রান। একটি বলে হয়েছেন আউট, যার মানে হচ্ছে ইনিংসের বাকি ১৩ বল থেকে তাঁর রান মাত্র ৭। মুশফিকের ১৪ বলে ১৮ রানের ইনিংসে দুটো চারের মার আর একটি ছক্কা, তাতেই তো ৩ বলে এসেছে ১৪ রান। একটি ডেলিভারিতে হয়েছেন আউট, আর বাকি ১০ বলে নিয়েছেন মাত্র ৪ রান! সাব্বিরেরও ২৬ বলে ৩০ রানের ইনিংসে ৪টা স্কোরিং শটেই ১৮ রান। তাহলে বাকি ২২ বলে মাত্র ১২! এভাবেই এক পা দু পা করে ক্রমশ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটসম্যানদের বারবার প্রান্ত বদল করে সিঙ্গেল নিয়ে রানের চাকা সচল রাখতে না পারা, নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতন আর ইনিংসের শুরুটা পেয়েও বড় করতে না পারা; এসব ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা হয়তো আছে এই ৫৫টা ডট বলের। অথবা নেই অথবা সম্পূর্ণ নতুন কিছু!

টপ অর্ডার খারাপ করলে কখনো মিডল অর্ডার বা লোয়ার অর্ডারে কেউ একটা ক্যামিও খেলে রানটা বাড়িয়ে দেয়। সেটাও তো এলো না কারো ব্যাট থেকে।

১৪০ রানের পুঁজি টি-টোয়েন্টিতে যেকোনো দলের বিপক্ষেই বাঁচানো কঠিন। সেটা রোহিত শর্মার এই ঢাল-তলোয়ারবিহীন ভারত হলেও। মুস্তাফিজ এবারও রোহিতের উইকেটটা পেয়েছেন, ভারত অধিনায়কের স্টাম্প ভেঙেই দলকে দিয়েছেন ব্রেক থ্রু। এরপর রুবেল হোসেন ঋশভ পান্টকে আউট করলে ৪০ রানেই ২ উইকেট নেই ভারতের। এখান থেকে চাপটা বাড়ালে প্রতিপক্ষ হয়তো ভেঙে পড়তেও পারত। কিন্তু অভিজ্ঞ সুরেশ রায়না দাঁড়িয়ে গেলেন। বলা ভালো বাংলাদেশ সহায়তা করল রায়নাকে! গালিতে মেহেদী হাসান ক্যাচ ছাড়লেন ১ রানে থাকা রায়নার। সেই রায়না ২৭ বলে ২৮ রান করে শিখর ধাওয়ানের সঙ্গে ৬৮ রানের জুটি গড়ার পর রুবেল হোসেনের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হওয়ার আগেই ম্যাচের পরিণতি লিখে দিয়ে গেছেন। ধাওয়ান প্রথম ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি করে দলকে জেতাতে পারেননি, কাল পারলেন। ৪৩ বলে ৫ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় ৫৫ রানের সাবলীল ইনিংস। শেষ দিকে মণীশ পান্ডে এসে ১৯ বলে ২৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে নিয়ে গেছেন চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে। ১৮.৪ ওভারে ৬ উইকেট হাতে রেখে সহজ জয়। বলা যায়, গোটা ম্যাচে বাংলাদেশ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। টি-টোয়েন্টির হিসাবে অমন ম্যাড়ম্যাড়ে ম্যাচে টিআরপি চড়বে না।

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ৭ জন বোলার ব্যবহার করেছেন মাহমুদ, নিজেও এসেছেন বল হাতে। খুব একটা পার্থক্য গড়ে তুলতে পারেননি কেউই। মুস্তাফিজ ৪ ওভারে দিয়েছেন ৩১ রান, উইকেট একটিই। রুবেলের বোলিংয়ের ধারটা বোঝা গেছে বেশ। ৩.৪ ওভারে ২৪ রানে ২ উইকেট। মিরাজ ক্যাচটা ধরতে পারলে হয়তো...। না থাক। ক্যাচ তো ভারতের ফিল্ডাররাও অনেক ফেলেছেন। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা পারেননি সুযোগ কাজে লাগাতে, রায়না পেরেছেন। তাঁর কৃতিত্বকে তাই খাটো না করাই ভালো।

বরং উত্তরটা নিজেরাই খুঁজুন মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহরা। ৫৫টা ডট বলের পরও কি জেতার আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। অন্তত এই জায়গাতে মুশফিক বোধহয় আত্মপ্রতারণা করবেন না। 



মন্তব্য