kalerkantho


কারাগারে এক মাস খালেদা

‘ফিরোজা’য় কেউ নেই যায়ও না কেউ

শফিক সাফি   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘ফিরোজা’য় কেউ নেই যায়ও না কেউ

ফাইল ছবি

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দি জীবনের একটি মাস পার হয়ে গেল। জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের সাজার রায় ঘোষণার পর থেকে নাজিমুদ্দীন রোডের কারাগারে অন্তরীণ তিনি। আর সেদিন থেকেই তাঁর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ সুনসান, নীরব। কেউ নেই বাসায়। কেউ যায়ও না।

পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে খালেদা জিয়ার সময় কাটছে ইবাদত-বন্দেগি করে এবং বই ও পত্রিকা পড়ে। গত এক মাসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বিএনপি নেতা, চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক মহিলা এমপিরা কারা ফটক থেকেই ফিরে এসেছেন। কারা অধিদপ্তরের অনুমতি মেলেনি। তবে এই সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্য, তাঁর আইনজীবী এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন।

কারাগারে যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেন তাঁর বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতিমাসহ পরিবারের সদস্যরা। সর্বশেষ বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষাতের সুযোগ পান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এম বি এম আবদুস সাত্তার। বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার পর গত এক মাসে তাঁর সঙ্গে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এটাই প্রথম সাক্ষাৎ।

এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আইনজীবীরা কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। গতকাল বৃহস্পতিবারও আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। পাঁচজনের এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন আবদুর রেজ্জাক খান, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সানাউল্লাহ মিয়া।

জানতে চাইলে সানাউল্লাহ মিয়া গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, “জেল সুপারর পাশে ওয়েটিং রুমে আমরা ম্যাডামের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছি। প্রায় এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের এই সাক্ষাতে মূলত মামলা নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে। মামলার বিষয়ে আলোচনা শেষে তিনি আমাদের কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অন্যায়ভাবে আমাকে জেলে রাখা হয়েছে। এর পরও দেশবাসী, সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, দলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর আমি রাখছি। আমি কোনো অন্যায় করিনি।’ আর অসত্যের সঙ্গে কোনো আপস করবেন না বলেও জানিয়েছেন।”

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারাগারে খালেদা জিয়ার বেশির ভাগ সময় কাটে ইবাদত-বন্দেগি করে। এ ছাড়া তিনি পত্রিকা ও বই পড়েন। কক্ষে একটি টিভি দেওয়া হলেও সেটি দেখেন না।

চেয়ারপারসনের সঙ্গে বুধবার সাক্ষাৎ করা মির্জা ফখরুলসহ স্থায়ী কমিটির নেতারা জানান, কারাগারে খালেদা জিয়ার দিন কাটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। কারাগারে নেওয়ার পর তাঁকে ডিভিশন দেওয়া হয়নি। ওই তিন দিন আদালতের আদেশ সত্ত্বেও তাঁর গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগমকে একই কক্ষে রাখা হয়নি। ৭৩ বছর বয়সে এসে খালেদা জিয়ার হৃদযন্ত্র, চোখ ও হাঁটুর সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে নিয়মিত নানা রকম ওষুধ সেবন করতে হয়। সে জন্য খাবারের মেন্যুতে বাদ-বাছাইয়ের বিষয়ও রয়েছে। নেত্রীর জন্য কারাগারেই খাবার রান্না হচ্ছে। সাক্ষাৎকালে স্বজনরা খাবার নিয়ে গেলেও তা পরীক্ষা করে দেওয়া হয়।

দলীয় প্রধান কারাগারে কেমন আছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশনেত্রীর মনোবল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘এখন দল চলছে যৌথ নেতৃত্বে। দেশনেত্রী কারান্তরীণ হওয়ার পর থেকে আমরা একটা যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালনা করছি, আন্দোলন পরিচালনা করছি। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করেই আমরা সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।’

মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম ওনার (খালেদা জিয়া) শরীর নিয়ে। কিন্তু গতকাল (বুধবার) তাঁর সঙ্গে দেখা করে মনে হয়েছে, উনি মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় আছেন, সুস্থ আছেন।’ কর্মসূচির ব্যাপারে জানাতে গেলে ‘পত্রিকা পড়ে জানছেন’ বলে নেতাদের জানিয়ে দেন তিনি।

সুনসান ‘ফিরোজা’ : খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নিরাপত্তা প্রহরী ও ভেতরের কর্মীরা সবাই আছেন। বাসভবনের একাধিক কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ম্যাডাম নেই, বাড়িটা একেবারেই খালি। আমরা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি কবে ম্যাডাম ফিরবেন।’ এক কর্মী বলেন, ‘বাসা সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে।

ম্যাডামের লাগানো ফুলের বাগান রয়েছে। সেগুলো আমরা প্রতিদিন পরিচর্যা করি। শীতের সময় লাগানো সবজি ইতিমধ্যে খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি নেই।’

কারাগারে যাওয়ার দিন কেঁদে চোখ ভেজানো গাড়িচালক নুরুল আমিন আলো বলেন, ‘প্রতিদিনই গাড়ি পরিষ্কার রাখি। অপেক্ষায় থাকি কখন ম্যাডামকে নিয়ে আবারও অফিসে যাব। ম্যাডাম কারান্তরীণ হওয়ার পর তাঁর ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা কানিজ কয়েক দিন এসেছিলেন এখানে। তাঁরা কিছুক্ষণ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে চলে গেছেন।’


মন্তব্য