kalerkantho


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

ঘরে-বাইরে ঝুঁকিতে বৈষম্যে নারী

কাজী হাফিজ   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ঘরে-বাইরে ঝুঁকিতে বৈষম্যে নারী

দেশে নারীদের কর্মক্ষেত্র আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে। বিচার বিভাগ, সশস্ত্র  বাহিনী, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—এসব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এবং কৃতিত্ব বাড়ছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই নারীরা। দেশের প্রধান নির্বাহী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বিরোধী দলের নেতাও নারী। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেও প্রথমবারের মতো একজন নারী কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের কোথাও কোথাও নারীরা এখনো নিরাপত্তাহীন। শ্রমঘন কাজে তারা আর্থিক বৈষম্যের শিকার। দেশে নারী নির্যাতন বন্ধে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের বক্তব্য, নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য সরকারিভাবে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও গণপরিবহন, কর্মস্থল এখনো নারীবান্ধব নয়। মাদকাসক্তি এবং সাইবার অপরাধের সঙ্গে সমান্তরালভাবে ধর্ষণ, হত্যাসহ নারী নির্যাতন বাড়ছেই। এসব বন্ধে সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।

দেশের ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০১৭ সালে এক হাজার ২৫১টি ধর্ষণ, ৪৪৪টি বাল্যবিবাহের ঘটনা এবং পাঁচ হাজার ২৩৫টি নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানায়। পরিষদের প্রতিবেদনে ধর্ষণের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, ২০১৭ সালে এক হাজার ২৫১টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৬৪ জন। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ৪০ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। অগ্নিদগ্ধ হয়েছে ৯১ জন, অগ্নিদগ্ধের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে মোট ১৪৩টি। পাচার করা হয়েছে ৯৫ জনকে এবং এর মধ্যে যৌনপল্লীতে বিক্রি করা হয়েছে ৬০ জনকে। ৭১৩ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৫৯ জনকে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৮৯ জন নারী। এদের মধ্যে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ২০৮ জনকে। ২৫ জন গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে। নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে পাঁচজন গৃহপরিচারিকা। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ২৬৪ জনকে এবং এর মধ্যে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩৪১ জন। ফতোয়ার শিকার হয়েছে ৪৫ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ৪২৩ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে এবং আরো ১৮ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। ২৫৭ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩২ জন। শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ৩২৪ জনকে। এ ছাড়া অন্যরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

মহিলা পরিষদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৭০টি ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ২৯৭ জন নারী ও কন্যাশিশুসহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ৭০টি ধর্ষণের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ছয়জনকে, এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে দুজনকে। বিভিন্ন কারণে ৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৮ জন, এর মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ছয়জনকে। দুজন এসিডদগ্ধ হয়। ১৫ জন অগ্নিদগ্ধ হয়, এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। নারী ও কন্যাশিশু পাচারের শিকার হয়েছে চারজন। গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছে একজন। উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ১৬ জনকে ও উত্ত্যক্ত করার কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে একজন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ২১ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে এবং ২৮ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে ১৯টি। শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ২৬ জনকে। এ ছাড়া অন্যরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশে নারী প্রগতি সংঘের সদস্যসচিব ও নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ‘আমাদের দেশে নারীরা বাস্তব বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে যে কাজেই যুক্ত হোক না কেন, বাসার কাজ তাকেই করতে হয়। বাসার কাজে হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পুরুষদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এটি কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য বড় ধরনের একটি প্রতিবন্ধকতা। এরপর আছে যাতায়াত সমস্যা। বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্রেই তাদের জন্য আলাদা টয়লেট সুবিধা নেই। সরকারি চাকরিতে নারী ও পুরুষের সমান বেতনব্যবস্থা থাকলেও অন্যান্য চাকরিতে বৈষম্য রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আরেকটি সমস্যা ছুটি। স্বামী-সন্তান ছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর অন্য আত্মীয়-স্বজনের বিপদে-আপদে নারীকেই আগে ছুটতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সব সময় ছুটি মেলে না এবং ভুক্তভোগী নারী পারিবারিকভাবে পীড়াদায়ক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনা তো রয়েছেই। গর্মেন্টে, কনস্ট্রাকশনে মেয়েদের পুরুষের তুলনায় কম মজুরিতে কাজ করতে হয়। সরকারের সিদ্ধান্ত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জন্য ‘ডে কেয়ার’ সেবা পান না। এ বিষয়ে সরকারের যে পলিসি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার। বাসার কাজ যে নারীদের একার নয়, পুরুষেরও অংশগ্রহণ দরকার—এ বিষয়ে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সামাজিক বিপ্লবেরও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, কর্মজীবী নারীদের মধ্যে যারা শ্রমঘন কাজে নিয়োজিত তারা আর্থিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। আর অফিসে কর্মরত নারীদের অনেকেই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। বাড়িতেও নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে নারীদের প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বেড়ে গেছে। নারীরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং দ্রুত বিচার পাচ্ছে না। সম্প্রতি রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যার দ্রুত বিচার হয়েছে। কিন্তু সাগর-রুনি, তনু, মিতা—এসব ব্যাপক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার অনিশ্চিত।

এলিনা খান আরো বলেন, ‘নারী ক্ষমতায়নের বিষয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের আমরা ভালো অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী; এসব পদে নারীরা দৃশ্যমান। কর্মক্ষেত্রের মধ্যে প্রশাসনে, বিচারব্যবস্থায়, সামরিক বাহিনীতে নারীদের অবস্থান ইতবাচক। কিন্তু এতে সাধারণভাবে নারীদের ক্ষমতায়ন হয়েছে বলা যায় না। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। সে কারণে নারী উন্নয়নের সাথে দেশের উন্নয়নও সম্পর্কিত। শুনছি, গার্মেন্টে নারী কর্মীর সংখ্যা কমে আসছে। এ তথ্য সত্য হলে এটি খুব হতাশাজনক।’

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং দেশের বিশিষ্ট নারী ও মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, ‘আমরা যদি আগের সাথে তুলনা করি তাহলে দেখব কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু পরিবার, কর্মস্থল ও গণপরিবহন এখনো নারীবান্ধব না। কর্মক্ষেত্রে নারীরা যৌন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হলেও চাকরি হারানোর ভয়ে তা চেপে রাখে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন এখনো কার্যকর নয়। এসব আইন আমাদের অর্জন। কিন্তু এর যাথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। যৌন হয়রানির সংজ্ঞা এখনো অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নারী নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার কারণে অপরাধও কমে আসে। বর্তমানে কিশোর ও যুব শ্রেণির মধ্যে অপরাধ বেড়েছে। মাদকসক্তি ও সাইবার অপরাধ বেড়ে যাওয়ার সাথে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং যৌন নির্যাতনও বাড়ছে।’



মন্তব্য