kalerkantho


৭ই মার্চের বর্ণাঢ্য সমাবেশে শেখ হাসিনা

খুনি দুর্নীতিবাজ ক্ষমতায় নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



খুনি দুর্নীতিবাজ ক্ষমতায় নয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় নেতাকর্মী-সমর্থকদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

যুদ্ধাপরাধী, খুনি, আগুন সন্ত্রাসকারীরা যেন আর রাষ্ট্রক্ষমতায় না আসতে পারে সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং সজাগ থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটি উদ্‌যাপনে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ইউনেসকোর বিশ্বস্বীকৃতি লাভের পর বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের দিবস উদ্‌যাপন এবারই প্রথম। 

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে সারা বিশ্ব বাংলাদেশের পাশে আছে, সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে সম্মান জানাচ্ছে। আমরা মানবতার জন্য কাজ করি। কিন্তু যারা মানবতার বিরুদ্ধে কাজ করেছে, যারা এ দেশের মানুষকে গণহত্যা করেছে, মা-বোনদের ইজ্জত লুটেছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে, আপনাদের কাছে আমার আহ্বান, এই যুদ্ধাপরাধী, খুনিরা যেন কোনো দিন আর বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে। তার জন্য সবাইকে, সমস্ত বাংলাদেশের জনগণকে, যাঁরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস রাখেন, প্রতিটি মানুষের উন্নয়নে বিশ্বাস করেন তাঁরা সজাগ থাকবেন।’

বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এতিমের টাকা চুরি করে, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে, যারা দেশের মানুষকে হত্যা করে, আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, পুলিশ বাহিনী থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি, তারা যেন আর কোনো দিন দেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে।’

বিকেল ৩টার কিছু আগে শুরু হওয়া সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে। প্রায় ৪৫ মিনিটের ভাষণে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য, সেদিনের স্মৃতিচারণা, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের দুর্নীতি-সন্ত্রাসের সমালোচনা, আওয়ামী লীগ সরকারের নানা উন্নয়ন-অর্জন তুলে ধরেন। তিনি আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচারণা চালাতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিকেল ৩টার কিছু আগে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ উপলক্ষে গতকাল দুপুরের আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে আসতে থাকে। অনেকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বর্ণাঢ্য সাজে আসে। যুবলীগের নেতাকর্মীরা সবুজ টি-শার্ট ও ক্যাপ পরে সমাবেশস্থলে আসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের লেকে বেশ কয়েকটি সুসজ্জিত নৌকা ভাসায় নেতাকর্মীরা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ অনেক উন্নয়ন করলেও পরের নির্বাচনে ক্ষমতায় না আসতে পারার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ২০০১ সালে সরকারে আসতে পারলাম না। কেন পারলাম না? বাংলাদেশের সম্পদ গ্যাস আমেরিকান কম্পানি তুলবে, বিক্রি করবে ভারতের কাছে। আমি বললাম, এই গ্যাসের মালিক তো আমরা না, এই গ্যাসের মালিক জনগণ। তাদের জন্য ৫০ বছরের গ্যাস রিজার্ভ থাকবে। এর অতিরিক্ত যদি হয় আমি বিক্রি করতে পারি। তা ছাড়া আমি পারি না। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ আমি দেখেছিলাম বলেই গভীর ষড়যন্ত্র হলো, চক্রান্ত হলো। আওয়ামী লীগ ভোট বেশি পেয়েছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগকে সিট পেতে দিল না। আমরা সরকারে আসতে পারলাম না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এর পরে ওই বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসেছে। যেভাবে জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেছিল, একইভাবে খালেদা জিয়া ওই যুদ্ধাপরাধীদের হাতে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা তুলে দিল। খুনিদের যাদের বিচার হয়েছিল তাদের চাকরি দেওয়া, তোষামোদ করা, এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনি রশীদ, ফারুকদের পার্লামেন্টে বসাল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে?’

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতিত হওয়ার নানা ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশটাকে নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলা শুরু করল। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে। সংসদ সদস্য দুইজনকে হত্যা করেছে। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে অগণিত মা-বোনকে পাশবিক অত্যাচার করেছে, যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্যাতন করেছিল। গ্রামে গ্রামে তারা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার করেছে। সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেছে। এভাবে সারা দেশে বিএনপির সন্ত্রাসীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অন্যদিকে দুর্নীতি, লুটপাট করেছে। তাদের এসব অপকর্মের জন্যই এলো কেয়ারটেকার সরকার।’

২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপির আন্দোলনের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেন একটা উৎসব! খালেদা জিয়ার একটা উৎসব ছিল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করা। কোনো দিন শুনি নাই, জনগণের জন্য রাজনীতি করি আর মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা নাকি আন্দোলন। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকাসক্তদের কোনো স্থান হতে পারে না। আমরা চাই ছাত্ররা, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ যত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে এবং অভিভাবক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ, তারা সকলেই আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সহায়তা করতে হবে যেন বাংলার মাটিতে আমরা এই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকাসক্ত হওয়া থেকে আমাদের যুবসমাজকে রক্ষা করতে পারি। তাদের যেন সুস্থ জীবন দিতে পারি।’

শিশুদের বিদ্যালয়গামী করতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক কোটি ৩০ লাখ মায়ের নামে মোবাইল ফোনে টাকা পাঠাই, যারা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠায়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠালে বৃত্তি মায়ের নামে দিয়ে দিচ্ছি। ২০ লাখ মায়ের হাতে মোবাইল ছিল না। আমরা মোবাইল কিনে মায়ের হাতে হাতে দিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ইনশাআল্লাহ আগামী মাসেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের বুকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অতি শিগগিরই স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি। আমরা মর্যাদার সঙ্গে চলব। জাতির পিতা আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের কাছে আরেকটি আহ্বান থাকবে—আজকে আপনারা বিবেচনা করে দেখেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। আমার প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়, কিন্তু তার পূর্বে যারা ছিল, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া কোনো সময় তো দেশ এত উন্নতি করতে পারে নাই। কেন পারে নাই? একটাই কথা—তারা তো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করত না। দেশের উন্নতি চাইত না। তারা তো স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে চলতে চাইত। তারা এ দেশের উন্নতি করবে কেন? কিন্তু নিজেদের উন্নতি করেছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আবেদন কখনো শেষ হয় না। এই ভাষণে একদিকে জাতির পিতা যেমন স্বাধীনতার কথা বলেছেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে গিয়েছেন। তিনি যখন অর্থনৈতিক মুক্তির পথে পা বাড়িয়েছিলেন, কাজ শুরু করেছিলেন তখনই তাঁকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। আজকে আমাদের দায়িত্ব তাঁর সে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করে তাঁর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।’

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, সাহারা খাতুন, মুহম্মদ ফারুক খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ, দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিয়া খাতুন, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুকুর মাহমুদ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার প্রমুখ। সমাবেশে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ।

যুদ্ধাপরাধী, খুনি, আগুন সন্ত্রাসকারীরা যেন আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় না আসতে পারে সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং সজাগ থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটি উদ্‌যাপনে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ইউনেস্কোর বিশ্বস্বীকৃতি লাভের পর বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের দিবস উদ্‌যাপন এবারই প্রথম। 

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে সারা বিশ্ব বাংলাদেশের পাশে আছে, সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে সম্মান জানাচ্ছে। আমরা মানবতার জন্য কাজ করি। কিন্তু যারা মানবতার বিরুদ্ধে কাজ করেছে, যারা এ দেশের মানুষকে গণহত্যা করেছে, মা-বোনদের ইজ্জত লুটেছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে, আপনাদের কাছে আমার আহ্বান এই যুদ্ধাপরাধী, খুনিরা যেন কোনো দিন আর বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে। তার জন্য সবাইকে, সমস্ত বাংলাদেশের জনগণকে, যাঁরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস রাখেন, প্রতিটি মানুষের উন্নয়নে বিশ্বাস করেন তাঁরা সজাগ থাকবেন।’

বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এতিমের টাকা চুরি করে, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে, যারা দেশের মানুষকে হত্যা করে, আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, পুলিশ বাহিনী থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি, তারা যেন আর কোনো দিন দেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে।’

বিকেল ৩টার কিছু আগে শুরু হওয়া সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সমাপনী বক্তব্য শুরু করেন বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে। প্রায় ৪৫ মিনিটের ভাষণে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য, সেদিনের স্মৃতিচারণা, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের দুর্নীতি-সন্ত্রাসের সমালোচনা, আওয়ামী লীগ সরকারের নানা উন্নয়ন-অর্জন তুলে ধরেন। তিনি আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচারণা চালাতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিকেল ৩টার কিছু আগে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ উপলক্ষে গতকাল দুপুরের আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে আসতে থাকে। অনেকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বর্ণাঢ্য সাজে আসে। যুবলীগের নেতাকর্মীরা সবুজ টি-শার্ট ও ক্যাপ পরে সমাবেশস্থলে আসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের লেকে বেশ কয়েকটি সুসজ্জিত নৌকা ভাসায় নেতাকর্মীরা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিন পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ অনেক উন্নয়ন করলেও পরের নির্বাচনে ক্ষমতায় না আসতে পারার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয় ২০০১ সালে সরকারে আসতে পারলাম না। কেন পারলাম না? বাংলাদেশের সম্পদ গ্যাস আমেরিকান কম্পানি তুলবে, বিক্রি করবে ভারতের কাছে। আমি বললাম, এই গ্যাসের মালিক তো আমরা না, এই গ্যাসের মালিক জনগণ। তাদের জন্য ৫০ বছরের গ্যাস রিজার্ভ থাকবে। এর অতিরিক্ত যদি হয় আমি বিক্রি করতে পারি। তা ছাড়া আমি পারি না। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ আমি দেখেছিলাম বলেই গভীর ষড়যন্ত্র হলো, চক্রান্ত হলো। আওয়ামী লীগ ভোট বেশি পেয়েছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগকে সিট পেতে দিল না। আমরা সরকারে আসতে পারলাম না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এর পরে ওই বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসেছে। যেভাবে জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেছিল, একইভাবে খালেদা জিয়া ওই যুদ্ধাপরাধীদের হাতে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা তুলে দিল। খুনিদের যাদের বিচার হয়েছিল তাদের চাকরি দেওয়া, তোষামোদ করা, এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনি রশীদ, ফারুকদের পার্লামেন্টে বসাল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে?’

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতিত হওয়ার নানা ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশটাকে নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলা শুরু করল। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে। সংসদ সদস্য দুইজনকে হত্যা করেছে। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে অগণিত মা-বোনকে পাশবিক অত্যাচার করেছে, যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্যাতন করেছিল। গ্রামে গ্রামে তারা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার করেছে। সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেছে। এভাবে সারা দেশে বিএনপির সন্ত্রাসীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অন্যদিকে দুর্নীতি, লুটপাট করেছে। তাদের এসব অপকর্মের জন্যই এলো কেয়ারটেকার সরকার।’

২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপির আন্দোলনের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেন একটা উৎসব! খালেদা জিয়ার একটা উৎসব ছিল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করা। কোনো দিন শুনি নাই, জনগণের জন্য রাজনীতি করি আর মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা নাকি আন্দোলন। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকাসক্তদের কোনো স্থান হতে পারে না। আমরা চাই ছাত্ররা, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ যত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে এবং অভিভাবক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ, তারা সকলেই আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সহায়তা করতে হবে যেন বাংলার মাটিতে আমরা এই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকাসক্ত হওয়া থেকে আমাদের যুবসমাজকে রক্ষা করতে পারি। তাদের যেন সুস্থ জীবন দিতে পারি।’

শিশুদের বিদ্যালয়গামী করতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক কোটি ৩০ লাখ মায়ের নামে মোবাইল ফোনে টাকা পাঠাই, যারা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠায়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠালে বৃত্তি মায়ের নামে দিয়ে দিচ্ছি। ২০ লাখ মায়ের হাতে মোবাইল ছিল না। আমরা মোবাইল কিনে মায়ের হাতে হাতে দিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ইনশাআল্লাহ আগামী মাসেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের বুকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অতি শিগগিরই স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি। আমরা মর্যাদার সঙ্গে চলব। জাতির পিতা আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের কাছে আরেকটি আহ্বান থাকবে—আজকে আপনারা বিবেচনা করে দেখেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। আমার প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়, কিন্তু তার পূর্বে যারা ছিল, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া কোনো সময় তো দেশ এত উন্নতি করতে পারে নাই। কেন পারে নাই? একটাই কথা—তারা তো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করত না। দেশের উন্নতি চাইত না। তারা তো স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে চলতে চাইত। তারা এ দেশের উন্নতি করবে কেন? কিন্তু নিজেদের উন্নতি করেছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আবেদন কখনো শেষ হয় না। এই ভাষণে একদিকে জাতির পিতা যেমন স্বাধীনতার কথা বলেছেন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে গিয়েছেন। তিনি যখন অর্থনৈতিক মুক্তির পথে পা বাড়িয়েছিলেন, কাজ শুরু করেছিলেন তখনই তাঁকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। আজকে আমাদের দায়িত্ব তাঁর সে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করে তাঁর সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।’

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, সাহারা খাতুন, মুহম্মদ ফারুক খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ, দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিয়া খাতুন, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুকুর মাহমুদ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার প্রমুখ। সমাবেশে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ।



মন্তব্য

AZAD commented 4 days ago
ainay nijer chehara dekhen.