kalerkantho


খালেদার জামিন স্থগিত

বিএনপির চ্যালেঞ্জ এবার টিকে থাকা

এনাম আবেদীন   

২২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপির চ্যালেঞ্জ এবার টিকে থাকা

উচ্চ আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে চ্যালেঞ্জে পড়েছে দলটি। কারণ আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপিকে। বিশেষ করে খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত মুক্ত না হলে তাঁকে ছাড়াই বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না; গেলে দলটির মূল নেতৃত্বে কে থাকবেন—এসব প্রশ্ন এখনই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, এসব প্রশ্নে দলটির নেতাদের মধ্যকার ঐক্য ধরে রাখাও যেমন কঠিন, তেমনি ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করাও নেতাদের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

আবার খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাদ রেখে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে সে ব্যাপারেও প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে রয়েছে। রয়েছে মনোনয়নদান এবং শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দলটিতে স্পষ্ট করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ দলটির সামনের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া গেছে, যদিও বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে তা মানতে নারাজ।

এ ছাড়া বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং মন্ত্রিসভা বা সরকার পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতা কারা; সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে বহুদিন ধরে কৌতূহল রয়েছে বলে জানা যায়। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভেতরেও নানা আলোচনা আছে।

অনেকের ধারণা, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বে কে থাকবেন, বিশেষ করে নির্বাচনে জয়লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, আর বিরোধী দলে গেলে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, সেসব বিষয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তরফ থেকে প্রশ্ন তোলা হতে পারে। আর এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও কৌশলগতভাবে কঠিন হবে দলটির নেতাদের জন্য। কারণ বিএনপির কোনো নেতার এ ধরনের উত্তর খুঁজতে যাওয়ার অর্থই হলো খালেদা বা তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার ষড়যন্ত্র; যেটি সরকার চাইছে বলে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে বহুবার উঠে এসেছে।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তারেক রহমানের পরামর্শে যৌথ নেতৃত্বে বিএনপি চলছে। দলের মধ্যে ঐক্যও আগের তুলনায় বেড়েছে বলে বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হলে সেই ঐক্য সামনের দিনগুলোতে কতটা অটুট থাকবে তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিএনপির ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে বর্তমানে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন ৯ নেতা। তাঁরা হলেন—ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কারাগারে, সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতে রয়েছেন। অসুস্থ রয়েছেন এম তরিকুল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। অন্য চারটি পদ শূন্য রয়েছে।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এখনকার স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতে সভাপতিত্ব করছেন সবচেয়ে সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আর বাইরে দলীয় কর্মকাণ্ড তথা মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে, খালেদা জিয়ার জামিন কত দিনে হবে সেটি বলা সম্ভব নয়। আবার ২১ আগস্টের মামলায় কী হয় সেটিও বলা মুশকিল। ফলে নেতৃত্বের বিষয়টি এ মুহূর্তে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বিএনপির বিকল্প নেতা তারেক রহমান তো লন্ডন থেকে দল চালাচ্ছেন। তিনি নেতৃত্ব ছাড়বেন বলে মনে হয় না। ফলে তাঁর শুভবুদ্ধি, বিচারক্ষমতা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দেশপ্রেমের ওপর বিএনপির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।

তবে তারেক রহমান যদি উল্টো পথে হাঁটেন তাহলে পরিস্থিতি আরেক রকম হবে—যোগ করেন বিকল্পধারার সভাপতি।

খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিএনপির জন্য ‘মারাত্মক চ্যালেঞ্জ’ উল্লেখ করে শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনে যাওয়া এবং সঠিক নেতৃত্বে দল পরিচালনাসহ বিভিন্ন ইস্যু এখন বিএনপিকে সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। এগুলো মোকাবেলা করতে না পারলে সংকট থেকে বিএনপির উত্তরণ ঘটানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ছাড়াই সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এ পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে।

আমরা সবাই এ বিষয়ে চিন্তা করছি—জানান বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, নির্বাচনে অংশ নিয়েই বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সরকার তাদের অনেক বড় বিপদে ফেলেছে। কোনো পথ নেই। এ পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির যৌথ নেতৃত্ব দলটিকে ঠিকমতো চালাতে পারলে ঐক্যে ফাটল ধরবে না। কিন্তু নেতারা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে দলের ক্ষতি হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দলটির উদ্দেশে পরামর্শ রেখে বলেন, বিদেশিরা নেতৃত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে বলতে হবে, ভোটে জয়লাভ করলে খালেদা জিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন; কোনোক্রমেই তারেক রহমানের নাম বলা যাবে না। বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি আরো বলেন, ‘সরকার চাইছে বিএনপি যাতে বলে যে তারা নির্বাচনে যাবে না। আমি বিএনপিকে বলেছি, এটি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, সরকার উসকানি দিয়ে বিএনপিকে মাঠে নামাতে চায়, যাতে তারা ভাঙচুর করে, হামলা চালায়। আমি বলেছি, জঙ্গি হওয়া যাবে না।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছর সাজা হওয়ায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন খালেদা জিয়া। হাইকোর্ট জামিন দিলেও গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ৮ মে পর্যন্ত জামিন স্থগিত করে দেন। এর ফলে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া জামিন না-ও পেতে পারেন—এমন ধারণা বিএনপির পাশাপাশি জনমনেও সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত বিএনপিসহ সমাজের বড় অংশই মনে করত, খালেদা জিয়া জামিনে বেরিয়ে আসবেন। বিএনপির মধ্যেও এমন আশাই ছিল। গত সোমবার থেকে সেই আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে জিয়া ট্রাস্টের মামলায় ১০ বছর ছাড়াও অন্য একটি অর্থপাচার মামলায় তারেক রহমানের সাত বছরের সাজা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি লন্ডনে বসবাস করছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তাঁকে জড়িয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। বলা হচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় না এলে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসতে পারবেন না। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ছাড়াই বিএনপিকে চলতে হবে; যদিও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি কিভাবে চলবে সে বিষয়ে দলটির কর্মকৌশল এখনো ঠিক হয়নি।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে দল পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো সংকট দেখছি না।’ তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে দল পরিচালনার কৌশলের কোনো পরিবর্তন হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের চোখের সামনেই সব কিছু ঘটছে—কিভাবে অনৈতিকভাবে একটি মামলায় তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে শাস্তি দিয়ে কারাগারে রাখা হয়েছে। ফলে বিএনপির নেতৃত্ব সম্পর্কে তারা কোনো প্রশ্ন তুলবে, এমনটি মনে করি না।’ যোগ করেন দলীয় মহাসচিব। 

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপিকে খুব বেশি সংকটে পড়তে হবে না। কারণ আমাদের মধ্যে ঐক্য বেশ শক্তভাবে আছে। নেতারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। সব ইস্যুতে আমরা আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব।’

বিএনপি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে—এমনটি জানিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ইতিহাসে যেভাবে সংকট মোকাবেলা হয়েছে, বিএনপিও সেভাবেই করবে।  

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি কী করবে সে বিষয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা শুরু করেছি। কারণ বেশ কিছু ইস্যু আমাদের সামনে রয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসনকে আটকে রেখে সরকার যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, আশা করি সে সংকটও আমরা কাটিয়ে উঠব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হবে—এমন কথা আগেও অনেকে বলেছে। কিন্তু তাদের মুখে চুনকালি পড়েছে। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে, এটি তো এখন প্রমাণিত। সুতরাং তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই—দাবি করেন এই নেতা।

২০ দলীয় জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ মনে করেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচনের আগে বের হতে পারবেন না—এই উপসংহারে এখনই যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা মনে করি, অবশ্যই আইনি লড়াই করে তাঁকে বের করে আনা হবে। আর সরকার যদি তাঁকে জোর করে আটকে রাখে, সেটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেখবে। ফলে তাঁকে বাদ দিয়েই নির্বাচন হবে, এটি বলার সময় এখনো আসেনি।’

 

 



মন্তব্য