kalerkantho


পবিত্র ভূমি আজ জঙ্গি অভয়াশ্রম

♦ বড় ভূমিকায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি
♦ প্রবাসীদের অর্থে গড়া মসজিদ মাদরাসা বাড়িসহ পাহাড় টিলা পর্যটন এলাকা ব্যবহার করছে জঙ্গিরা
♦ দমন অভিযানে শৈথিল্য

আহমেদ নূর, সিলেট   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পবিত্র ভূমি আজ জঙ্গি অভয়াশ্রম

প্রতীকী ছবি

উগ্রবাদী চিন্তার অনুকূল পরিবেশ থাকার কারণেই সিলেট জঙ্গিদের জন্য উর্বর ভূমি হয়ে উঠেছে। অনুকূল আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক পরিবেশ পেয়ে দিন দিন বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতা। সিলেটে বহুবার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও মৌলবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণ হয়েছে। জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রতিরোধের মুখে সিলেটে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও কবি শামসুর রাহমান আসতে পারেননি। সাহাবা সৈনিক পরিষদ লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মাথার মূল্য ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করেছিল। নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহ্রীর কয়েক দিন পর পর সিলেট নগরে পোস্টার লাগিয়ে নিজেদের অবস্থানের কথা জানান দিয়ে থাকে। এই সংগঠনের একটি গ্রুপের সদস্যরা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী। গত বছর মার্চ মাসে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আতিয়া মহলে এবং মৌলভীবাজারে দুটি জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করা হয়। সিলেটে গত দুই দশকে অনেক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসবেরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার সিলেটে জঙ্গি হামলার শিকার হন জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শুদ্ধ সাংস্কৃতিক জাগরণে জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০০১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচনী জনসভার দিন শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। ২০০৪ সালের ২১ মে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা, ৭ আগস্ট মহানগর আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলা, ২৪ ডিসেম্বর নগরের তাঁতিপাড়ায় সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের বাসায় আয়োজিত জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভায় বোমা হামলা, ২০০৫ সালের ২ ডিসেম্বর নগরের টিলাগড়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সিলেটে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কেউ নামাজ পড়লে, রোজা রাখলে কিংবা পর্দানশিনভাবে চলাফেরা করলে সাধারণ মানুষ সমীহ করে। এ বিষয়টিকেই কাজে লাগাচ্ছে জঙ্গিরা। তা ছাড়া অনেক মাজার থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সিলেট আসে। ফলে বহিরাগতদের ভিড়ে মিশে জঙ্গিদের বিচরণ করার কাজটি সহজ হয়। এ সুযোগে জঙ্গিরা এখানে আস্তানা গড়ে তুলছে।’ এর পেছনে জামায়াত-শিবিরেরও নেপথ্য মদদ থাকতে পারে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী একটি অংশও সিলেটে জঙ্গিপনার দিকে ঝুঁকছে বলে তিনি ধারণা করছেন। এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সালাফিদের একটি অংশ তাদের প্রচলিত মতাদর্শের মধ্যে থাকলেও অন্য একটি অংশ উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছে—এমন তথ্য তাঁদের কাছে আছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য এবং সিলেটের নাগরিকসমাজের বিভিন্নজনের মতে, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরানের (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি সিলেটে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির পেছনে অনেক কারণ জড়িত। মাজার ও পর্যটন এলাকার কারণে জঙ্গিরা এখানে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে। এখানকার প্রবাসীরা বিত্তশালী এবং তাদের অর্থায়নে ব্যাপকহারে মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সুযোগকেও কাজে লাগাচ্ছে জঙ্গিরা। তা ছাড়া প্রবাসীদের সুরক্ষিত বাড়িঘর ভাড়া নিয়ে জঙ্গিরা নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলছে। এর বাইরে সিলেট অঞ্চলে অনেকগুলো সীমান্ত বর্ডার থাকায় বিস্ফোরকসামগ্রী আনা সহজ হওয়ায় সিলেটকেই বেছে নিচ্ছে জঙ্গিরা। বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় গভীর বনাঞ্চল এবং পাহাড়-টিলা রয়েছে। ২০০৫ সালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার একটি পাহাড়ি এলাকায় র‌্যাব ভারতীয় একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের আস্তানার সন্ধান পায়। সে সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ওই সংগঠনের (এটিটিএফ) ছয় সদস্য মারা যায়। গ্রেপ্তার হয় আটজন। সে সময় তাদের কাছ থেকে ভারতীয় সাবমেশিনগান, তাজা গ্রেনেডসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের সাতছড়ি উদ্যান থেকে ট্যাংকবিধ্বংসী ১০টি রকেট এবং এর আগে ২০১৪ সালে একই এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে র‌্যাব।

একসময় সিলেটের বিপুলসংখ্যক মাদরাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে আসে। বর্তমানে এসব আফগান মুজাহিদরা কোথায় আছে সে বিষয়টি জানা নেই। প্রবাসীদের কেউ কেউ জঙ্গিদের অর্থায়ন করে থাকে—এমন অভিযোগও দীর্ঘদিন থেকে আছে। এমন অভিযোগে গত বছরের ৭ আগস্ট মোস্তাক খাঁ নামের এক তুরস্কপ্রবাসীকে হবিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। ওই প্রবাসী তুরস্কের বিভিন্ন এনজিও, ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করত। এই অর্থ তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে আসত দুটি এনজিওর নামে। মুসলিম রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন নামে একটি এনজিওর সদস্য ছিল সে এবং আল কাউছার নামে তার নিজস্ব আরেকটি এনজিও ছিল। তুরস্কের বিভিন্ন ‘জঙ্গিবাদী’ সংগঠনের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। সিআইডির তদন্তে এসব তথ্য পাওয়া যায়। এই প্রবাসী একসময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্যের মতে, উগ্রবাদী চিন্তার অনুকূল পরিবেশ থাকার কারণেই সিলেটে জঙ্গি তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগাছা জন্মানোর মতো উর্বর জমি থাকলে বারবার আগাছা জন্মাবেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘জঙ্গিবাদের অনেকগুলো রূপ আছে। তার মধ্যে সশস্ত্র রূপটিকেই আমরা দমন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু মৌলবাদী চিন্তা এবং জঙ্গিবাদের সামগ্রিক প্রসারের ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। যে কারণে এর বিস্তার ঘটছে। এ জন্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।’

দেশে এরই মধ্যে অনেক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটলেও সর্বজনীন প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। এই সুযোগেও জঙ্গিরা পবিত্র ভূমিতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করে অনেকে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটা নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় লেখক এবং দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তবে প্রথমে তিনি আমাদের মতো একজন মানুষ। আমি বলতে চাচ্ছি তাঁর ওপর হামলার পর পুরো দেশ যেভাবে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে, সব শ্রেণির মানুষ যে রকম সোচ্চার হয়েছেন যদি আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বেলায় এ রকম হতো তাহলে হয়তো বিষয়টা আগেই রোধ করা যেত। জাফর ইকবালও আক্রান্ত হতেন না।’ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং অপরাধের সুষ্ঠু বিচার দিয়েই এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। ফারুক মাহমুদ চৌধুরী তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের সব জেলার মানুষই সিলেটে আছেন। চাকরি, ব্যবসাসহ নানা কারণে এখানে বসবাস করেন তাঁরা। এখানে চুয়াডাঙ্গার মানুষও পাবেন, সাতক্ষীরার মানুষও আছেন। ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য জেলায় এ রকম দেখতে পাওয়া যায় না। নানা জায়গার মানুষের সম্মিলন ঘটার কারণে এখানে আত্মগোপন করা যায় সহজে। জঙ্গিদের সিলেটকে বেছে নেওয়ার এটা একটা কারণ। তা ছাড়া সিলেটের মানুষ শান্তিপ্রিয়। পারতপক্ষে তারা অন্যের বিষয়ে নাক গলাতে বা ঝামেলায় জড়াতে চায় না। সিলেটে জঙ্গিদের আস্তানা গাড়ার পেছনে এটাও একটা কারণ বলেই মনে হয়’।

এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সময় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারাকেও এ জন্য দায়ী মনে করা হচ্ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘আস্তানা গড়ে তোলার সুযোগ আছে বলেই জঙ্গিরা সিলেটে আস্তানা গাড়ছে। এখানে কিছু করে সহজে পার পাওয়া যাবে বলেই জঙ্গিরা সিলেটকে নিরাপদ ভাবছে।’ তিনি বলেন, জঙ্গিদের দমন করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের কাজটি করতে দিতে হবে। তাদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। তা ছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যেন মানুষই এদেরকে ঠেকায়।

সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্বও পবিত্র ভূমি সিলেটকে জঙ্গিদের জন্য উর্বর ভূমি করছে। সাংস্কৃতিক সংগঠক এনামুল মুনীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমগ্র উপমহাদেশেই জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটছে। আর আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বললে, আমরা নতুন প্রজন্মের সামনে কোনো আদর্শ সেভাবে তুলে ধরতে পারিনি। সাংস্কৃতিক আদর্শ, রাজনৈতিক আদর্শ কোনো কিছুই সেভাবে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে উগ্রপন্থীরা। শক্ত আদর্শিক ভিত্তি না থাকায় আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তারা খুব সহজেই তাদের লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর বিপরীতে সোচ্চার থাকায় জাফর ইকবালের মতো মুক্তচিন্তার মানুষগুলো তাদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন।’ সিলেটে একাধিক জঙ্গিবাদের ঘটনার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিলেটের মানুষ তুলনামূলক ধর্মপ্রাণ। তাদের এই অনুভূতির জায়গাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে জঙ্গিরা। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।’ এ ছাড়া আদর্শিক ও শুদ্ধ সাংস্কৃতিক জাগরণই জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

গত বছর ১১ জানুয়ারি সিলেটে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, সিলেটে জঙ্গি তৎপরতার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার কথা তিনি বলেছিলেন। তাহলে পুলিশ কী করছে জানতে চাইলে, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি এমনকি বিভিন্ন সময়ে অভিযানও চালানো হচ্ছে। জঙ্গি দমনে মহানগর পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে দাবি করে তিনি বলেন, কেউ যদি আত্মঘাতী হয়ে যায় তখন তো কিছু করার থাকে না।

সিলেটে হরকাতুল জিহাদসহ কয়েকটি ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর কমপক্ষে সাতটি সশস্ত্র জঙ্গি গ্রুপ সক্রিয় থাকারও প্রাথমিক খবর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছে।



মন্তব্য

Woshim commented 11 days ago
একমতপোষণ করছি।