kalerkantho


এটা মুক্তমনা মানবতার ওপর হামলা

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



এটা মুক্তমনা মানবতার ওপর হামলা

এটা কোনো ব্যক্তি বিশেষের ওপর হামলা নয়, এটা মুক্তমনা মানবতার ওপর হামলা। সন্দেহ নেই, অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী যুবক অন্ধকারজগতের অজ্ঞ ও হিংস্র ধর্মান্ধচক্রের প্রতিনিধি। সে ক্রীড়নক। তার বা তাদের পেছনে আছে ধারালো অস্ত্রধারী একটি সংঘবদ্ধ ধর্মান্ধচক্র। বহুকাল ধরেই সিলেটে তাদের শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। দেশের বহু স্থানে এই ঘাঁটি ভাঙা সম্ভব হলেও সিলেটে তা এখনো সম্পূর্ণভাবে সম্ভব হয়নি।

আমার সন্দেহ, এই বর্বর হামলা জামায়াত-শিবিরচক্র অথবা তাদের সহযোগী কোনো হিংস্র মৌলবাদীচক্রের কাণ্ড। বাংলার মাটি থেকে এদের সম্পূর্ণ উৎখাত করা এখনো সম্ভব হয়নি। অধ্যাপক জাফর ইকবাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর মুক্তমনা, প্রগতিশীল মনোভাব ও কথাবার্তার জন্য তাঁকে দীর্ঘকাল ধরেই নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তিনি সাহসী ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক। অশুভ শক্তির কাছে মাথা নত করতে জানেন না। তিনি জাতির সুস্থ বিবেকের একটি পিলসুজও বটে। সব হুমকির মুখেও তিনি সিলেট ভূমি ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ত্যাগ করতে রাজি হননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির অত্যন্ত ছাত্রপ্রিয় শিক্ষক। তাঁর ওপর আঘাত করার অর্থ জাতির মুক্তবুদ্ধি, স্বাধীনচিন্তা ও স্বাধীন জ্ঞানচর্চার ওপর আঘাত করা।

তাঁকে শাবি ক্যাম্পাসেই ছুরিকাঘাত (জামায়াত-শিবিরের প্রিয় অস্ত্র) করা হয়েছে—এ কথা শুনে ক্রোধে ও শঙ্কায় বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। যখন শুনলাম, তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছে এবং তিনি শঙ্কামুক্ত, তখন বিমূঢ় অবস্থা অনেকটা কেটেছে। আরো স্বস্তি পেয়েছি যখন খবর পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পূর্বতন প্রধানমন্ত্রীর মতো এই হামলাকে লঘুভাবে নেননি। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব নিয়েছেন এবং চিকিৎসাধীন জাফর ইকবাল সম্পর্কে নিজে খোঁজখবর নিচ্ছেন। অপরাধীদের ধরা ও শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই ভূমিকার পাশাপাশি সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার কথাও মনে পড়ছে। আমাদের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমানের ওপর তাঁর শ্যামলীর বাসায় ঢুকে যখন এক জামায়াতি গুণ্ডা একই ধরনের ছুরিকাঘাতে তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল এবং তাঁর স্ত্রী ছুটে এসে বাধা দেওয়ায় তিনি রক্ষা পান, তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনি এই জঘন্য হত্যাচেষ্টাকে কিছুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রচারণায় সাহায্য জোগানোর জন্য এটা একটা নাটক করা হয়েছে।’ হুমায়ুন আজাদের ওপর নৃশংস হামলার সময়ে (যে হামলার পরিণতিতে তিনি মারা যান) তিনি প্রথমে একই হৃদয়হীন মন্তব্য করেছিলেন। যাত্রাবাড়ীর এক জনসভায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি খবরটি পান এবং প্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এই বলে যে ‘আওয়ামী লীগের জন্য একটি ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে।’ আমি আশ্বস্ত এই ভেবে যে জাফর ইকবালের জীবননাশের চেষ্টার সময়ে খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী নন।

অধ্যাপক জাফর ইকবালের লেখার আমি একজন নিয়মিত পাঠক। তিনি ধর্মকে কটাক্ষ বা সমালোচনা করে কখনো কিছু লেখেননি। রাজনীতি সম্পর্কেও তাঁর লেখাজোখা কম। তিনি দেশের শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা, ছাত্রদের কল্যাণ ও লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে, দেশের সামাজিক অবক্ষয় নিয়েই বেশি লেখাজোখা করেন। এই অবস্থায় কী কারণে অজ্ঞ ও বিদ্বেষান্ধ ঘাতকের হিংসার ছুরি তাঁর মাথার ওপর ঝলসে উঠল? এটা পুলিশি তদন্তে বের হয়ে আসা উচিত।

আরো খতিয়ে দেখার ব্যাপার, জাফর ইকবালকে পুলিশি পাহারার মধ্যেই হামলা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না তা-ও তদন্ত হওয়া দরকার। যাই হোক, অধ্যাপক জাফর ইকবাল প্রাণে বেঁচে গেছেন, এটা গোটা জাতির জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর। আমি এই সাহসী ও মুক্তমনা মানুষটির দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করি। 

 

লন্ডন ৩ মার্চ, শনিবার, ২০১৮


মন্তব্য