kalerkantho


ত্রিপুরায় লাল দুর্গের পতন গেরুয়ার উত্থান

উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির অগ্রযাত্রা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ত্রিপুরায় লাল দুর্গের পতন গেরুয়ার উত্থান

ভারতের ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে বামদের হটিয়ে জয়লাভ করেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর দখল নিতে মরিয়া বিজেপি আসাম দখলের পর এবার ত্রিপুরায়ও বিজয় নিশান উড়াল। বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর সাত বছরের মাথায় এবার ত্রিপুরায়ও বাম দুর্গের পতন হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য দুই রাজ্য নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের বিধানসভা নির্বাচনেও চমক সৃষ্টি করেছে গেরুয়া শিবির বিজেপি। নাগাল্যান্ডে ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক দল নাগা পিপল ফ্রন্টকে (এনপিএফ) টেক্কা দিয়েছে তারা। আর মেঘালয়ে অঙ্কের হিসেবে মাত্র দুটি আসন পেলেও কেন্দ্রীয় নির্বাচনী জোট এনডিএর শরিক দল এনপিপির সঙ্গে মিলে সরকার গঠনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। ফলে তিন রাজ্যেই বিজেপির অগ্রগতি স্পষ্ট।

গতকাল শনিবার ভারতের নির্বাচন কমিশন এই তিন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করে। ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ তিনটি রাজ্যের প্রতিটির বিধানসভায়ই ৬০টি করে আসন রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের দিকেই ছিল সারা ভারতের নজর। বিশেষ করে এখনো টিকে থাকা সিপিআইএমের প্রদীপ এ রাজ্যেও নিভে যাবে কি না সেই কৌতূহল ছিল সবার। শেষ পর্যন্ত ২৫ বছরের লাল দুর্গের পতন হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী মানিক সরকারের ২০ বছরের শাসনেরও ইতি ঘটেছে।

যে বিধানসভায় কোনো দিন পা-ই রাখতে পারেনি বিজেপি, সেই ত্রিপুরায় এবার দুই-তৃতীয়াংশ আসন দখলে নিয়ে বাজিমাত করেছে দলটি। এই ফলকে অপ্রত্যাশিত বললেও ধারণা করা হচ্ছিল, রাজ্যটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো লড়াই-ই হলো না, বিজেপি পেল ভূমিধস জয়।

এই তিন রাজ্যের নির্বাচনের ফল, বিশেষ করে ত্রিপুরার ফল পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বিজেপি নেতা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি এক ভাষণে হোলি উৎসবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) ভারত সব রঙের উৎসবে মেতেছিল। কিন্তু আজ (গতকাল শনিবার) সব রং গেরুয়ায় পরিণত হলো।’

গতকাল সকাল থেকে তিন রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু করে নির্বাচন কমিশন। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আসনের ফল ঘোষণা করা হয়। গতকাল রাত ১০টার দিকে পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ত্রিপুরায় ৬০ আসনের মধ্যে ৫৯টি আসনের (একটি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত) ফল ঘোষণা করা হয়। তাতে বিজেপি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে। ক্ষমতাসীন বাম দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সিস্ট (সিপিআইএম) জয়লাভ করে মাত্র ১৬টি আসন। বাকি আটটি আসনে জয় পায় আঞ্চলিক আদিবাসী দল ও বিজেপির জোট শরিক আইপিএফটি। সে হিসাবে বিজেপি-এইপিএফপি জোট মোট ৪৩টি আসনে জয় পায়।

ত্রিপুরায় শুধু ক্ষমতা হারানো নয়, সিপিআইএমের বড় বড় নেতাও ধরা খেয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার কোনো রকমে নিজের আসনটি বজায় রাখতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্যই পরাস্ত হয়েছেন গেরুয়া শিবিরের কাছে। বিজেপির নেতারা এই জয়কে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব এই বিজয়ের জন্য ত্রিপুরাবাসীকে ধন্যবাদ জানান এবং একে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেন। নির্বাচনে জয়লাভের পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি বিপ্লব দেবই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য নাগাল্যান্ডে ৫৮টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়। দুটি আসনে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। তাতে রাজ্যটিতে ক্ষমতাসীন দল আঞ্চলিক দল নাগা পিপলস ফ্রন্ট (এনপিপি) ২৭টি আসনে জয়লাভ করে। বিজেপি জয়লাভ করে ১১টি আসনে। এ ছাড়া বিজেপির জোটসঙ্গী এনডিপিপি জয়লাভ করে ১৬টি আসনে। শেষ পর্যন্ত বিজেপি-এনডিপিপি মোট ২৭টি আসনে জয় পায়। চারটিতে স্বতন্ত্র ও অন্যরা জয়লাভ করে। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ায় ছোট দলগুলো তাদের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে সেখানে বিজেপি-এনডিপিপি সরকার গঠন করতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো থেকে কংগ্রেস হটাও ‘কর্মসূচি’তে মেঘালয়েও সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। স্থগিত একটি আসন ছাড়া রাজ্যটির ৫৯টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়। এতে এ রাজ্যে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ২১ আসনে জয় পায়। বিজেপি পায় দুটি আসন এবং তাদের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী মিত্র ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) পায় ১৯টি আসন। কেন্দ্রীয় জোটের অধীনে হলেও এ রাজ্যে বিজেপি-এনপিপি জোটগতভাবে নির্বাচন করেনি। তবে নির্বাচনের আগেই বিজেপি ও এনপিপি একসঙ্গে সরকার গঠন করবে বলে সমঝোতা করেছিল। ফলে এ রাজ্য সরকারেও বিজেপির উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। এ রাজ্যে বাকি আসনগুলোর মধ্যে এনসিপি পায় একটি, এইচএসপিডিপি দুটি, ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক পার্টি ছয়টি, পিডিএফ চারটি ও কেএইচএনএএম পায় একটি আসন। এ রাজ্যে ঝুলন্ত বিধানসভার সম্ভাবনাই বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এমন একটি অঞ্চলে বিজেপির এই উত্থান ঘটল, যেখানে পাঁচ বছর আগে বিজেপির হয়ে লড়াই করার কোনো খেলোয়াড়ই ছিল না। ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ১৯টিতে বর্তমানে ক্ষমতায় আছে বিজেপি। এখন বিজেপির এই অগ্রযাত্রা ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতেও বিস্তার ঘটল। মূলত নির্বাচনী প্রচার কৌশল, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসকে ব্যবহার, স্থানীয় ও আদিবাসী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোট এই সাফল্য এনে দিয়েছে বিজেপির। সূত্র : পিপিআই, আনন্দবাজার।

 

 



মন্তব্য