kalerkantho


খুলনায় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে নৌকায় ভোট দিন

বিএনপি নেত্রীর সাজা দিয়েছেন আদালত, সরকারের কিছু করার নেই

গৌরাঙ্গ নন্দী ও কৌশিক দে, খুলনা   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে নৌকায় ভোট দিন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয় হবে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত নির্বাচনে যেমন নৌকায় ভোট দিয়েছেন উন্নয়ন হয়েছে। এই নির্বাচনে আপনারা যদি উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে চান তাহলে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে খুলনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় এসব কথা বলেন।   

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জনসভায় উপস্থিত জনতার প্রতি এই আহ্বান জানালে তারা দুই হাত তুলে তাঁকে এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জয়যুক্ত করার অঙ্গীকার করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে খুলনাসহ সারা দেশে অনেক উন্নয়নকাজ করেছিলাম, অনেক কাজ শুরু হয়েছিল; পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। আমরা দেশের জন্য কাজ করি। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই আমাদের লক্ষ্য।’

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই সার্কিট হাউস ময়দানে জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি খালিশপুরের মিলগুলোকে চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি মিলগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমরা ক্ষমতায় গিয়ে আবারও সেই মিল চালু করেছি। বিদ্যুৎ একেবারেই ছিল না, আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে  তখন এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতো; এখন ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদিত হয়।’ ভোলায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাওয়া গেছে, এই সুখবর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশাল হয়ে খুলনায় আসবে।

খুলনা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনার রশিদ। এতে স্থানীয় ও জাতীয় নেতারাও বক্তৃতা করেন।

বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার আশায় তারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। স্কুলে আগুন দিয়েছে। খুলনায় হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করেছে। আজ সারা দেশের সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। দেড় কোটি মানুষের চাকরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা ১২৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মীর বিদেশে চাকরি হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে চাকরি করতে যেতে পারবেন। বিদেশে চাকরির জন্য কারো জমিজমা-সম্পদ বিক্রি করতে হবে না। সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। এতে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, এখন বছরের প্রথম দিন বই উৎসব হয়। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৫ কোটির বেশি নতুন বই বিতরণ কার হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে ডিগ্রি ও পিএইচডি পর্যন্ত দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী বৃত্তি ও উপবৃত্তি পাচ্ছে। বৃত্তি-উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মায়েদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ৩৬৫টি কলেজ সরকারীকরণ করা হয়েছে। যেসব উপজেলায় সরকারি স্কুল বা কলেজ নেই, সেখানে একটি করে স্কুল ও কলেজ সরকারীকরণ করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন থেকে গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ ১৪২টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে ৬৭ লাখ লোক উপকৃত হচ্ছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক তৈরি করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প চালু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওয়াদা অনুযায়ী আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। বিচার চলছে, রায় কার্যকর করা হচ্ছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের সঙ্গে কোনো আপস নেই। বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না।’ তিনি প্রত্যেক মা, বোন, শিক্ষক, সচেতন নাগরিক, আলেম-ওলামাসহ সব অভিভাবককে নিজেদের ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ইসলাম জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না। সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে বিচার হবে। বিএনপি নেত্রীর বিচার হয়েছে, আদালত তাঁকে সাজা দিয়েছেন। এতে সরকারের কিছু করার নেই।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা; আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, কামরুল ইসলাম কুটু, সরদার আব্দুর রাজ্জাক, ইদ্রিস শিকদার, আবু তাহের, তুষার আহসান লেলিন, সাইদুল ইসলাম সাইদ, তানভিরুল ইসলাম, মোর্শেদ খান লাবু, চান মিয়া শিকদার, শ্রমিক লীগ নেতা বাদশা মিয়াকে স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী সুইচ টিপে খুলনা জেলায় মোট ১০০টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এগুলোর মধ্যে ১১টি দপ্তরের ৪৭টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পগুলো এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ১৪টি দপ্তরের ৫৩টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান এমপি, শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা এস এম কামাল।

এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন খুলনা মহানগর সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক মন্ত্রী দীপু মণি, সাবেক ফুটবলার ও ব্যবসায়ী নেতা সালাম মুর্শেদী, শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আব্দুর রহমান এমপি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি, এম মোজাম্মেল হক এমপি, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

এ ছাড়া মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য, সালমান এফ রহমান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এমপি, সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এমপিসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যবৃন্দ।

জনসভায় নারীদের প্রাধান্য

খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জনসভায় অগ্রাধিকার পেয়েছে নারী নেতাকর্মীরা। গোটা জনসভায়ই ছিল নারীদের সরব উপস্থিতি। মিছিলে স্লোগান তোলা থেকে শুরু করে দলের প্রতীক নৌকা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রিয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হেলালসহ স্থানীয় নেতাদের প্ল্যাকার্ড বহনে পিছিয়ে ছিল না তারা।

নগরজুড়ে মিছিল

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই দীর্ঘদিন অবহেলিত খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। গতকাল জনসভার আগে এমন ৪৭টি উন্নয়ন প্রকল্প ও নতুন ৫৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। তাই প্রধানমন্ত্রীর এ জনসভাকে ঘিরে জেগে উঠেছিল খুলনা অঞ্চল, যার প্রভাব পড়েছে খুলনার জনসভায়। সকাল ৯টা বাজতেই বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে একের পর এক মিছিল নগরীতে প্রবেশ করতে শুরু করে। দুপুর দেড়টার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয় জনসভাস্থল ও আশপাশের এলাকা। ঢাকঢোল, বাদ্য বাজিয়ে লাখ লাখ নেতাকর্মীর পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে মহানগরী খুলনা। একপর্যায়ে নগরীর সব পথ মিশে যায় খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে।


মন্তব্য