kalerkantho


বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমপিরা নিজ দলেই প্রতিরোধের মুখে

আওয়ামী লীগে মনোনয়নদৌড়ে ছিটকে পড়বেন অনেকে

আবদুল্লাহ আল মামুন   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমপিরা নিজ দলেই প্রতিরোধের মুখে

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও এবার নিজ দলেই প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। চার বছর আগে কোনো রকম প্রতিরোধ-প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই দলীয় মনোনয়নের জোরে এমপি নির্বাচিত হন তাঁরা। তাঁদের অনেকে লাগামহীন দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বেশির ভাগ এমপি অনেক আগে থেকেই জনবিচ্ছিন্ন। সম্পর্ক নেই দলীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে। একজন তো নিজ দলের নেতাকে হত্যার অভিযোগে এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলে রয়েছেন। এই অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন লড়াইয়ে তাঁদের অনেকেই ছিটকে পড়তে পারেন। তবে জোটের শরিক ও মিত্র দলের প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি নির্ভর করছে বিএনপির নির্বাচনে আসা না-আসার ওপর। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদীয় বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান এমপিদের প্রত্যেকের জনপ্রিয়তা যাচাই করা হচ্ছে। তাঁদের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। যাঁরা জনবিচ্ছিন্ন ও যাঁদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ তাঁরা কোনোভাবেই দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এবার ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। 

আওয়ামী লীগে তৃণমূল সংগঠনের সুপারিশের ভিত্তিতে দলের সংসদীয় বোর্ড জাতীয় সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করে থাকে। ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা-মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সুপারিশের ভিত্তিতে একজন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে তা কেন্দ্রে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সারা দেশ থেকে আসা আসনওয়ারি নামের তালিকা দলের সংসদীয় বোর্ডে উপস্থাপন করে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তৃণমূলের সুপারিশ এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে দলের তৃণমূল নেতারা এবার সুযোগটি ভালোভাবে কাজে লাগাবেন। এতে বর্তমান এমপিদের প্রতি বিভিন্ন কারণে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে।  

দশম জাতীয় সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি রয়েছেন ১৫৩ জন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২৮ জন, জাতীয় পার্টির ১৯ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) তিনজন, ওয়ার্কার্স পার্টির দুজন এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এমপিদের বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে খোঁজ নিতে গেলে উঠে আসে তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে দলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের চিত্র। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতারা ওই এমপিদের ‘চরম শিক্ষা’ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তৃণমূলে ভোটাভুটির মাধ্যমে তাঁরা এমন সুপারিশ করবেন। তাঁদের ওই সুপারিশ কেন্দ্রে আমলে নেওয়া হলে মনোনয়ন লড়াইয়েই ছিটকে পড়তে পারেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অনেক এমপি।

ঠাকুরগাঁও-২ : বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি আওয়ামী লীগের দবিরুল ইসলাম শারীরিকভাবে অসুস্থ। গম কেলেঙ্কারিতে বেশ সমালোচিত হয়েছেন তিনি। তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তাক আলম টুলু এবং বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার রায়।

মোস্তাক আহমেদ টুলু কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ কনস্টেবল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও পিয়ন পদে নিয়োগে অনিয়ম এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণে বর্তমান এমপি চরমভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। সংখ্যালঘুদের জমি দখলের কারণে তারা নিরাপত্তাহীন বোধ করছে। এই অবস্থায় চরমভাবে অজনপ্রিয় দবিরুল ইসলামকে দিয়ে এ আসন আর ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই পরিবর্তন দরকার। তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন। আশা করছেন, তৃণমূলের সুপারিশ তাঁর পক্ষে যাবে।

এমপি দবিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এগুলো সব বানোয়াট। জেলা কমিটির সভাপতি হওয়ার পর এসব চক্রান্ত শুরু হয়। সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনসহ তাঁর অনুসারীরা এসব করে বেড়াচ্ছে।’ দবিরুল ইসলাম দাবি করেন, এলাকার জনগণ তাঁর পক্ষে রয়েছে।

গাইবান্ধা-৫ : বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি বর্তমান ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া এলাকায় এক প্রকার কোণঠাসা। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের পক্ষে বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

ওই আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী মাহমুদ হাসান রিপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছি। যদি তৃণমূলের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রার্থিতার মতামত নেওয়া হয়, তাহলে দলের নীতিনির্ধারণী মহল অবশ্যই আমাকে বিবেচনা করবে বলে বিশ্বাস করি।’

ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কথাটা সত্য নয়। যদি নির্বাচিত কমিটি দিয়ে ভোটাভুটি হয়, তাহলে ইউনিয়ন ও উপজেলার ৯৯.৯৯ শতাংশ নেতার সমর্থন আমি পাব। রিপন চিরকুট কমিটির কথা বলে বিভ্রান্ত করছেন। আসলে এটা বৈধ কমিটি নয়।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ : বিদ্যুৎ আন্দোলনের নেতা গোলাম রাব্বানী ২০০৮ সালের নির্বাচনে গণফোরামের প্রার্থী ছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতিপক্ষ মনে করেন। তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. সামিউল উদ্দিন আহমদ শিমুল। এ ছাড়া আছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সামিউল উদ্দিন আহমদ শিমুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি গোলাম রাব্বানী এলাকায় জনবিচ্ছিন্ন। টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি সরকারি চাকরি ছেড়ে এসে মানুষের সেবা করছি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, তৃণমূল আওয়ামী লীগের সুপারিশ আমার পক্ষে যাবে।’ 

এমপি গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউ কেউ এ ধরনের কথা বলতে পারেন। তবে ২০১৩ সালে অবরোধের জ্বালাও-পোড়াওয়ের সময় তাঁরা কোথায় ছিলেন? তাঁদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অশান্ত জনপদকে আমি শান্তি করেছি।’ তিনি দাবি করেন, কতিপয় নেতা বাদ দিয়ে সব আওয়ামী লীগের সব নেতা তাঁর সঙ্গে আছেন।

রাজশাহী-১ : এই আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী মূলত ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পান। পরে প্রতিমন্ত্রীও হন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি মাদক কারবারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। এ আসনে দলে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মতিউর রহমান। তিনি এবার দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী।

মতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয় এমপি একটা রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করেননি। তিনি নিজেকে সম্রাট আর জনগণকে প্রজা মনে করেন। অসৎ ও দুর্বৃত্তদের সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা এবং মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করাই তাঁর কাজ। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অসহায় হয়ে পড়েছে।’  

সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, ইমোশনাল বক্তব্য হতে পারে। তিনি দাবি করেন, কমপক্ষে ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করিয়েছেন। সর্বশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় তাঁর নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল।

টাঙ্গাইল-৩ : বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি আমানুর রহমান খান রানা আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় আসামি হয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। এতে তাঁর ভাবমূর্তিতে চিড় ধরেছে। ওই আসনে দলে তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম লেবুও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। 

মনোনয়নপ্রত্যাশী শহীদুল ইসলাম লেবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনি জেলে যাওয়ার পর উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা হত্যার বিচার চেয়ে আমরা মিছিল-মিটিং করে যাচ্ছি। ঘাটাইলের ছয় ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা আমার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। তাদের সুপারিশ আমার পক্ষেই যাবে, সে ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত।’

নেত্রকোনা-৫ : বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। দুজনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমান এমপিকে দিয়ে আসন ফিরবে না, পরাজয় নিশ্চিত। তিনি মনে করেন, এই এমপির থেকে তিনি ভালো প্রার্থী। জনগণ তাঁর সঙ্গে রয়েছে। তার পরও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা তিনি অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেবেন বলে জানান। 

এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা (কে ভালো প্রার্থী) জনগণ ভালো বুঝবে। এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভালো বুঝবেন।’

ঢাকা-১৪ : বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন আসলামুল হক আসলাম। নানা অভিযোগ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী ও সংরক্ষিত আসনের এমপি সাবিনা আক্তার তুহিন। তিনি গত চার বছর ধরে এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবিনা আক্তার তুহিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগের কারণে এলাকায় বর্তমান এমপির ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এলাকার মানুষ এখন দলের প্রার্থী পরিবর্তন চায়। আমি ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মিরপুরের মানুষ আমাকে ভালো জানে। আমার বিশ্বাস আসনটি ধরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল বিষয়টি বিবেচনা করবে।’

এমপি আসলামুল হক আসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা (ভাবমূর্তি) দল দেখবে। দলের জরিপ কার্যক্রম চলছে। তার ভিত্তিতে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।’



মন্তব্য