kalerkantho


ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট

দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে অংশীদার হতে চায় এডিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দ্বিতীয় পদ্মা সেতুতে অংশীদার হতে চায় এডিবি

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অবশ্যই অংশীদার হতে চায় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট জাপানি বংশোদ্ভূত তাকেহিকো নাকাও। তিন দিনের ঢাকা সফরের শেষ পর্যায়ে গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটির প্রধান এ আগ্রহের কথা জানান।

তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর জন্য ৫০০ কোটি ডলারের (৪০ হাজার কোটি টাকা) পুরোটাই এডিবির পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট। সে ক্ষেত্রে তিনি অন্য কোনো দেশ বা সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন।

রাজধানীর শেরেবাংলানগরে এডিবি কার্যালয়ে ওই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ চাইলে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদেরও সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এডিবি। এর আগে বিশ্বব্যাংকও রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে চেয়েছিল। তবে সে ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ স্বীকৃতি দিয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং তাদের নিজ দেশে পাঠানো কঠিন হবে ভেবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে টাকা চাইছে না সরকার।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভূয়সী প্রশংসা করে এডিবি প্রেসিডেন্ট বলেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সূচকে অসামান্য সাফল্য এসেছে। তা ছাড়া গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেও এডিবি প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেছেন, চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এডিবি প্রেসিডেন্ট বলেন, তা অসম্ভব নয়, তবে কঠিন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরকারি বিদেশি বিনিয়োগ কম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি, যা মোট জিডিপির ১ শতাংশের মতো। চীন ও ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই দুটি দেশ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে পারায় তারা আজ এই অবস্থানে।’

অন্যদিকে আর্থ-সামাজিক খাতের বৈষম্য নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তাকিহিকো বলেছেন, বাংলাদেশে যেভাবে অসমতা বাড়ছে, তাতে এখনই লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন।

আর আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এডিবির মনোভাব জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘একটি দেশে নীতির ধারাবাহিকতা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে সিভিল সার্ভিসও। অবশ্য এখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সব কিছু স্থির থাকবে; স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করবে।’

তিন দিনের সফরে গত সোমবার বাংলাদেশে আসেন এডিবির প্রেসিডেন্ট। সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে দেখা করেন। একই সঙ্গে এডিবির অর্থায়নে চলমান কয়েকটি প্রকল্পও পরিদর্শন করেন। আজ বৃহস্পতিবার তাঁর ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।

এডিবি প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের বিভিন্ন দিক জানাতে গতকালের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকাস্থ এডিবি কার্যালয়। এতে প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ইয়োচিরো ইকেদা, ঢাকায় নিযুক্ত সংস্থাটির আবাসিক প্রধান মনমোহন প্রকাশ, দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক হান কিমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা করে তাকেহিকো নাকাও বলেন, মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশের ওপরে অর্জিত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার কমে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মূল্যস্ফীতিও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।

তবে উন্নত দেশের কাতারে যাওয়া প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশ হতে হলে ১০ শতাংশের ওপর জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ডলারে নিতে হবে। একই সঙ্গে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সেটি দেশি বিনিয়োগ। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও। কিন্তু তোমাদের এখানে সরকারি বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম।’

এডিবি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর যে বৈঠক হয় সেখানে বাংলাদেশে বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয় তাকেহিকো নাকাওকে। সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পে সরকার ঋণ চাইলে সেসব প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি আছে এডিবি। প্রতিশ্রুত ঋণের বাইরে অতিরিক্ত সহায়তা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সমীক্ষার কাজ এডিবির মাধ্যমে করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

ঋণের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০১১ থেকে ২০১৫ এই পাঁচ বছরে এডিবি বাংলাদেশকে যত ঋণ দিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২০ এই সময়ে তা ৬০ শতাংশ বেশি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পরিবহন ও জ্বালানি খাতে আরো বেশি করে অর্থায়ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান এডিবি প্রেসিডেন্ট। তাকিহিকো বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে এডিবির সহযোগিতা আরো বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে রেল, সড়ক, গ্রামীণ অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এডিবির ঋণ বাড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে এডিবি প্রেসিডেন্টের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে শিগগিরই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার স্বীকৃতিপত্র পাচ্ছে; তখন কি এডিবির ঋণের শর্ত কঠিন হবে?

জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আমার মনে হয়, এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তার পরও বলব, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলেও এখনই সহযোগিতা ও ঋণের শর্তে তেমন পরিবর্তন আসবে না।’ 

বাংলাদেশ এখন এডিবি থেকে দুইভাবে ঋণ পেয়ে থাকে। এসব ঋণের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ। এডিবি প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রাথমিক ও শিক্ষা খাত, কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এডিবির অর্থায়ন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণেও এডিবি ঋণ দেবে।

‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে’ : এদিকে বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন এডিবি প্রেসিডেন্ট। তাতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অসামান্য অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে এডিবি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক দেশ বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

এডিবি ১৯৭৩ সাল থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তাকিহিকো নাকাও বলেন, দেশের আরো অর্থনৈতিক উন্নয়নে তারা সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অন্যান্য খাতে কাজ করতে আগ্রহী।’

এডিবি প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই জনগণ স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করুক এবং এ জন্য আমরা তাদের জন্য নানা কল্যাণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম এবং এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

 


মন্তব্য