kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ খান মেনন

‘বেলেঘাটায় সভা করে প্রবাসী সরকার সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিই’

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘বেলেঘাটায় সভা করে প্রবাসী সরকার সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিই’

বহুমুখী লড়াইয়ের ফসল এই স্বাধীন বাংলাদেশ। একাত্তরে এক দল ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তরুণ-যুবকদের দীক্ষিত করেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। তাঁরা কখনো ভারতে, কখনো রণাঙ্গনে থেকে লড়াইয়ে শরিক ছিলেন। ২৬ মার্চ ৪৮তম স্বাধীনতা দিবস সামনে রেখে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ আয়োজন তাঁদের সেই লড়াইয়ের স্মৃতিচারণা নিয়ে। অনুলিখনে কালের কণ্ঠ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক লায়েকুজ্জামান

 

৪ মে, ১৯৭১। আমরা ভারতের আগরতলা পৌঁছালাম। ত্রিপুরার সিপিআইএম নেতা মানিক সরকার ও গৌতম দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তাঁদের সহযোগিতায় আগরতলা অবস্থান করি বেশ কয়েক দিন। বামপন্থী নেতাদের বলি মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করতে। আগরতলার নেতারা সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। সপ্তাহখানেক হয়েছে আগরতলা এসেছি; কাজী জাফর খবর পাঠালেন সবাইকে নিয়ে কলকাতা যেতে। আমার সঙ্গে ছিলেন হায়দার আকবর খান রনো। আমরা আগরতলা থেকে কলকাতা চলে গেলাম।

 

 কলকাতায় অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা হলো। কাজী জাফর সবাইকে নিয়ে একটি বৈঠক করার প্রস্তাব দেন। বামপন্থী নেতা, যাঁরা আমাদের মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন ন্যাপ ভাসানীসহ, আমরা সবাই কলকাতার বেলেঘাটায় একটি বৈঠক করি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় আমরা প্রবাসী সরকারকে প্রকাশ্য সমর্থন দেব এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা থিয়েটার রোডে যাই এবং তাজউদ্দীন আহমদের (প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে দেখা করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে আসি।

তবে আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়া, যুদ্ধে যাওয়া ঝামেলামুক্ত ছিল না। পশ্চিম বাংলায় সে সময়ে প্রবল বাম আন্দোলন চলছে। নকশালবাড়ী ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা বামপন্থী বলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের বিষয়টি সব সময় কড়া নজরে রেখেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও আমাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে তেমন উৎসাহী ছিল না; আবার প্রকাশ্যে বাধাও দেয়নি। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা। এটা একটা সুবিধা ছিল আমাদের জন্য।

 আমরা প্রবাসী সরকার গঠিত সেক্টর কমান্ডারদের অধীনেই যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং সেভাবেই আমাদের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণে ও যুদ্ধে পাঠানো হয়। আমাদের যেসব নেতাকর্মী উত্তরাঞ্চলে যুদ্ধ করেছেন তাঁদের সমন্বয় করার দায়িত্ব ছিল আমার। এখানে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন উইং কমান্ডার (পরবর্তী সময়ে এয়ার ভাইস মার্শাল) এম কে বাশার। দেশপ্রেমিক, সাহসী। যুদ্ধকালীন তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছি। ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলাম ১৮ ডিসেম্বর।

মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, আমার মাথার ওপর সাত বছরের জেলের রায়।

১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কাজী জাফর, হায়দার আকবর খান রনোসহ আমরা পল্টন ময়দানে একটি জনসভা করেছিলাম। সভা থেকে আমরা ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের কর্মসূচি ঘোষণা করি। এরপর সামরিক সরকার আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। জারি হয় হুলিয়া । দ্রুততম সময়ে ইয়াহিয়া খানের সামরিক আদালত দণ্ড ঘোষণা করে। আমাকে সাত বছর জেল দেওয়া হয়। মাথার ওপর এই সাত বছরের জেল নিয়ে আত্মগোপনে গেলাম।

আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় কৃষকদের মাঝে স্বাধীনতার ধারণা প্রচার করতে বিভিন্ন গ্রামে যাই। আমাদের ছাত্র সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিতে সংগঠিত করতে থাকি। আমরা নরসিংদীর শিবপুর কেন্দ্রিক সংগঠিত হতে থাকি। শিবপুর কলেজ মাঠে গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি, হাতবোমা তৈরি করার প্রশিক্ষণ হয় এখানে। স্বাধীনতার দাবি নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমাদের বিরোধ বেধেছিল। দলটির নেতা কমরেড তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার—স্বাধীনতা প্রশ্নে তাঁদের ভূমিকা ইতিবাচক ছিল না। আমি, কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো, আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ আরো অনেকে পার্টি থেকে পদত্যাগ করলাম। আমাদের অবস্থান প্রকাশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। আমরা গঠন করলাম ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি।’

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তাল হচ্ছিল। এরই মধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ চলে আসে। পুলিশও আমাদের গ্রেপ্তার করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আত্মগোপন ছেড়ে বেশ প্রকাশ্যেই চলাফেরা শুরু করি। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জনসভা করবেন শুনে ঢাকায় আসি। জহির রায়হানের সঙ্গে গাড়িতে করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনি। ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর স্বাধীনতা প্রশ্নে দ্বিধা কেটে যায়। অনুভব করি এবার দেশ স্বাধীন হচ্ছে। আমরা বরিশাল, পিরোজপুর, কুমিল্লা, বাগেরহাট এলাকায় ছোট ছোট গেরিলা গ্রুপ তৈরি করি।

আমরা পাকিস্তান জমানার শেষ জনসভা করলাম ২৫ মার্চ বিকেলে, পল্টনে। জনসভা থেকে আমরা প্রকাশ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানাই। জনসভা শেষে দীর্ঘদিন পর মধুর ক্যান্টিনে যাই। রাতেই হামলা করে পাকিস্তানিরা। ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে জহির রায়হানের গাড়িতে করে আমি, কাজী জাফর, হায়দার আকবর খান রনো যাই শিবপুরে মান্নান ভূঁইয়ার বাড়িতে। কাজী জাফর চলে যান কুমিল্লায়। আমি ও রনো যাই টাঙ্গাইলে, মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে। সেদিনই টাঙ্গাইলে পাকিস্তানি সেনারা প্রবেশ করে। হুজুরকে না পেয়ে শিবপুর ফিরে আসি। তার পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আগরতলা যাওয়ার।

(রাশেদ খান মেনন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান)

 



মন্তব্য