kalerkantho


ভয়ংকর বধ্যভূমি রাখাইন

পাঁচ বিশ্বমোড়লকে দুষছে জাতিসংঘ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাঁচ বিশ্বমোড়লকে দুষছে জাতিসংঘ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন ভয়াল বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন। আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিতে পারার জন্য তিনি দায়ী করেছেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রকে। গতকাল সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৩৭তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বসংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এমন বক্তব্য দেন।

ওদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও অব্যাহত নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে যাচ্ছে। দেশটির ওপর বিদ্যমান অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক বাহিনীর (তাতমাদো) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ আরো জোরদারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইইউর ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। গতকাল সোমবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে ইইউ পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ফেডেরিকা মঘেরিনির প্রতি আহ্বান জানায়।

জাতিসংঘ দুষছে বিশ্বমোড়লদের : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান। গত বছর আগস্ট মাসে রাখাইনে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন শুরুর পর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে তিনি একে ‘আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এরপর নভেম্বর মাসে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে তিনি মিয়ানমারে গণহত্যার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধানের এমন বক্তব্য ও শঙ্কা সত্ত্বেও পাঁচ পরাশক্তির মতপার্থক্যের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ এ সংকট সমাধানে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এমনকি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতির খোঁজ নিতে যে ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অং সান সু চির সরকার তাও প্রত্যাখ্যান করে দেশটিতে ঢুকতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সু চির সরকার মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লিকেও দেশটিতে ঢুকতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে যায়ীদ রা’দ আল হুসেইনের বক্তব্যে পাঁচ বিশ্বমোড়লের সমালোচনা ছিল স্পষ্ট।

যায়ীদ রা’দ বলেছেন, নিরপরাধ মানুষের যন্ত্রণা প্রশমনে যখন ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন ‘ভেটো’ ক্ষমতাসম্পন্ন ওই পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) তা আটকে দেয়। বিশ্বে অব্যাহত যন্ত্রণার দায় ওই পাঁচ দেশের। নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কাছে তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

এর আগে গতকালই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার সময় রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। অতীতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বেশ কবার মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্য সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বঞ্চিত-অবহেলিত গোষ্ঠী। মিয়ানমার তাদের নাগরিকত্ব থেকে শুরু করে সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে, যা জাতিগত নির্মূলের উদাহরণ।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে গত বছর চিঠি পাঠানো প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ১৯৮৯ সালের পর নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়ে মহাসচিবের চিঠি পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের চুক্তি তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, মানবাধিকার বিলাসিতা নয়। বিশ্বে সবার অধিকার সমান। কোনো অজুহাতেই কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ৭০তম বার্ষিকীর এই বছরে যখন তিনি সবার অধিকারের পক্ষে কথা বলছেন, তখন বিশ্বে নিপীড়ন আবারও ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। দুর্গ রাষ্ট্র (সিকিউরিটি স্টেট) আবারও ফিরে এসেছে। মৌলিক স্বাধীনতা থেকে পিছু হটেছে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চল।

যায়ীদ রা’দ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন, বুরুন্ডি, ইয়েমেনের তাইজ, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কাসাইস ও ইতুরি, পূর্বাঞ্চলীয় ঘউটা ও দখলকৃত সিরিয়ার অন্যান্য এলাকা ভয়ংকরতম বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক প্রতিরোধে শুরুতে ও সম্মিলিতভাবে যথেষ্ট উদ্যোগ না নেওয়া।’

যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অমানুষের মতো আচরণ ও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের বাড়িঘরেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। এসব উদাহরণ আমাদের বিপর্যস্ত করছে। তারা অত্যন্ত বিপদে আছে জানা সত্ত্বেও আমরা এসব থামাতে তেমন কিছুই করছি না?’

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তিনি ও তাঁর দপ্তর বারবার এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে এনেছিল। কিন্তু কখনো ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।

শিগগিরই মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে মেয়াদ শেষ হবে জর্দানের পেশাদার কূটনীতিক যায়ীদ রা’দ আল হুসেইনের। গতকাল তিনি মানবাধিকার পরিষদের সভাকক্ষে বলেন, হাইকমিশনার হিসেবে শেষ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি স্পষ্টবাদী হতে চান। তিনি বলেন, ‘মানুষকে হত্যা ও পঙ্গু করে যারা, সেই অপরাধীর মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রও দায়ী। এত যন্ত্রণা অব্যাহত থাকার দায় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের।’

সারা বিশ্বে অধিকারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষের সুর ছিল যায়ীদ রা’দ আল হুসেইনের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘শান্তির চাদর ছেঁড়া প্রথম শুরু হয় সাধারণত ব্যক্তিবিশেষের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারবঞ্চনা এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে। কোনো ধর্মীয়, আইন ও ঐতিহ্য নিপীড়নকে সমর্থন করে না। মানবাধিকারবিষয়ক আলোচনা তারাই এড়িয়ে চলে, যারা অপরাধ আড়াল করতে চায় এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে চায় না।’

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার বরাত দিয়ে যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা থেকে গত ১০০ বছরের ভয়াবহতম যুদ্ধগুলোর সূত্রপাত হয়নি, হয়েছে মানবাধিকারের অসম্মান ও অবমাননা থেকেই।

মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো দিন নৈতিক মনোবল, আত্মত্যাগ এবং মানুষের প্রতি মানবাধিকারের রক্ষকদের ভালোবাসার প্রতিলিপি হতে পারবে না।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মিরোস্লাভ লাজচাক বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষায় পরিষদের ভূমিকা বিষয়ে বক্তব্য দেন। এ অনুষ্ঠানের পর উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়। মানবাধিকার পরিষদের ৩৭তম অধিবেশন চলবে আগামী ২৩ মার্চ পর্যন্ত। আগামী ১২ মার্চ অধিবেশনে মিয়ানমারে জাতিসংঘের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ পাঠানো নিয়ে আলোচনা হবে। সেদিন মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি বক্তব্য দেবেন।

ইইউ-এর কড়া বার্তা : ইইউ মিয়ানমারকে সতর্ক করে বলেছে, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান না দেখালে ইউরোপের বাজারে মিয়ানমারের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (অস্ত্র ছাড়া সব কিছুতেই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা) ঝুঁকিতে পড়বে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই ইইউতে মিয়ানমারের বাণিজ্য সুবিধা পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমার গত বছর আগস্ট মাসে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন শুরুর পরপরই ওই দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রতি সহযোগিতা বন্ধ করে ইইউ। নব্বইয়ের দশক থেকেই মিয়ানমারে ইইউর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গতকালের বৈঠকের পর সেই নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো ইইউও রোহিঙ্গা নিধনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপে তাঁদের সম্পত্তির ওপর অবরোধ আরোপ করতে পারে।

ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিল গতকাল এক টুইট বার্তায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ জোরদারের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মিয়ানমারের উন্নয়ন, শান্তি ও পুনর্মিলনের প্রতি ইইউর অঙ্গীকারের কথা জানায়।

ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিল বৈঠকে মিয়ানমার বিষয়ে আলোচনা শেষে যে ১৩ দফা ঘোষণা প্রকাশ করেছে তার শুরুতেই মিয়ানমারে হত্যা, ধর্ষণসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হয়েছে। গত ছয় মাসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে ইইউ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সইকে ইইউ স্বাগত জানানোর পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করতে উভয় দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া ইইউ রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি করতে মিয়ানমারকে তাগিদ দিয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইইউ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনীর কাছে নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের সুযোগ প্রত্যাশা করেছে। এ ছাড়া রোম স্ট্যাটিউট অনুযায়ী মিয়ানমার বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ারকে স্বীকৃতি দিতেও মিয়ানমারের প্রতি ইইউ আহ্বান জানিয়েছে। ইইউ মিয়ানমারের কাচিন ও শান রাজ্যের পরিস্থিতিতেও উদ্বেগ জানিয়েছে। আগামী ৫ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় মানবাধিকার সংলাপের দিকেও ইইউ তাকিয়ে আছে। রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও ইইউ মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।


মন্তব্য