kalerkantho


খালেদার অপরাধের প্রমাণ কামাল সিদ্দিকীর চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খালেদার অপরাধের প্রমাণ কামাল সিদ্দিকীর চিঠি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার তদন্তকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত কর্মকর্তাকে দুটি চিঠি দিয়েছিলেন এই মামলার আসামি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী। দুদকের তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক মো. হারুন-উর-রশীদের কাছে পাঠানো ওই চিঠিই প্রমাণ করে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা স্থানান্তর করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মামলার রায়ে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

রায়ে আরো উল্লেখ আছে, আসামি খালেদা জিয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারার বিধান মোতাবেক আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য দেওয়ার সময় নিজ জবানিতে স্বীকার করেছেন যে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ) ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাঁকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ পাঁচজনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত সোমবার রায়ের জাবেদা নকল পেয়েছে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ।

রায়ে উল্লেখ আছে, যুক্তিতর্কের সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে জোরালোভাবে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে কোনো তহবিলই ছিল না। ওই তহবিলে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার কোনো দিনই আসেনি। খালেদা জিয়ার পক্ষে আরো বলা হয়, ওই এতিম তহবিলের বিপরীতে সোনালী ব্যাংক, রমনা শাখায় খালেদা জিয়া কর্তৃক কোনো হিসাব খোলা হয়নি। এমনকি খালেদা জিয়ার নির্দেশমতো অন্য কেউ ব্যাংক হিসাব খোলেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী নিজে ওই হিসাবটি খোলেন এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করেন। খালেদা জিয়ার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এই বক্তব্যের সূত্র ধরে আদালত মামলার নথিপত্র ঘেঁটে কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর দুটি চিঠির কথা রায়ে উল্লেখ করেন।

রায় থেকে জানা যায়, একটি চিঠি দেওয়া হয় ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট। আরেকটি দেওয়া হয় একই বছরের ১১ আগস্ট। দুটি চিঠিই অস্ট্রেলিয়া থেকে পাঠান কামাল সিদ্দিকী। তদন্ত কর্মকর্তা এই মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কামাল সিদ্দিকীকে ডেকেছিলেন। কিন্তু তিনি দেশে না থাকায় দেখা না করে চিঠি দেন। প্রথম চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি যে আপনি জিয়া ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যাপারে আমার জবানবন্দি চেয়েছেন। আমি এ বিষয়ে আমার বক্তব্য নিম্নে উপস্থাপন করছি : এসংক্রান্ত অ্যাকাউন্ট খোলা হয় প্রধানমন্ত্রীর (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া) লিখিত আদেশ ও অনুমতিক্রমে। এসংক্রান্ত অ্যাকাউন্টে টাকা জমা এবং পরবর্তীতে বরাদ্দও হয় প্রধানমন্ত্রীর লিখিত আদেশ ও অনুমোদনক্রমে। প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন, ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলসহ অন্যান্য তহবিলের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। সুতরাং উপরোক্ত বিষয়ে আমরা (যারা সরকারি কর্মকর্তা) শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর লিখিত আদেশ ও অনুমোদন অনুসরণ করেছি।’ দ্বিতীয় চিঠিতে বলা হয়, ‘বিষয়টি ১৯৯১ সালের অর্থাৎ আজ থেকে ১৭ বছর আগের। সুতরাং যা কিছু লিখছি তা অবশ্যই স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে লিখছি। আমার যতটুকু মনে পড়ে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশ থেকে (বোধ করি কুয়েত) ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর নামে চেক আসে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চেকটি হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে আমাকে ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে বলেন এবং ওই চেকটি ব্যাংকে জমা করার নির্দেশ দেন। আমি সে মোতাবেক নথিতে নোট দিই। সেই নোটে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত সম্মতি পাওয়ার পর অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা নিই এবং চেকটি জমা দিই। কিছুদিন পরে আবারও প্রধানমন্ত্রীর লিখিত অনুমোদন নিয়ে অ্যাকাউন্টটিকে এফডিআর (স্থায়ী আমানত) করার ব্যবস্থা নিই, যাতে টাকার অঙ্ক বাড়ানো যায়। পরে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত সম্মতি নিয়ে টাকাটি দুটি ট্রাস্ট ফান্ডে বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত অনুমোদন ছাড়া আমি কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করিনি।’

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, ওই অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে খালেদা জিয়া জানেন না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা গ্রহণ করার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। কামাল সিদ্দিকীর একান্ত সচিবও সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে কামাল সিদ্দিকী অ্যাকউন্ট করেছেন। বিদেশ থেকে আসা টাকা ওই অ্যাকাউন্টে জমা করেছেন। পরে এফডিআর করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে বরাদ্দ দিয়েছেন। যুক্তিতর্ক শুনানিকালে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী একপর্যায়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামীয় একটি অ্যাকাউন্ট সোনালী ব্যাংক রমনা শাখায় খোলা হয়েছিল এবং সেখানে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা করা হয়েছিল। কাজেই কামাল সিদ্দিকীর দুটি চিঠি, তাঁর একান্ত সচিবের সাক্ষ্য ও খালেদা জিয়ার আইনজীবীর বক্তব্য প্রমাণ করে, বিদেশ থেকে আসা টাকা প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে জমা, টাকা বাড়ানোর জন্য স্থায়ী আমানত করা এবং সেখান থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে বরাদ্দ দেওয়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত ছিল।

রায়ে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য উপস্থাপনের সময় (বক্তব্যের ৮৮ পৃষ্ঠায়) বলেছেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি।’ ওই বক্তব্যের প্রতি পাতায় খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দিয়েছেন। যদিও রায়ে বলা হয়েছে, জ্ঞাতসারে হোক আর অজ্ঞাতসারে হোক খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।



মন্তব্য

JamJam commented 5 days ago
Kamal Siddiqui also said that there was a plot of land in Gulshan that was acquired through illegal means using the name of this Orphanage.