kalerkantho


প্রাইমারি শিশুদের পরিচয়পত্র দিতে বিলাসী প্রকল্প!

বিস্মিত খোদ পরিকল্পনা কমিশন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রাইমারি শিশুদের পরিচয়পত্র দিতে বিলাসী প্রকল্প!

শিক্ষা খাতে একের পর এক বিলাসী প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের মত হচ্ছে, শিক্ষা খাতে এমন এমন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি টাকার অপচয় হবে বলেই আশঙ্কা তাদের। এর আগে মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুলে চলন্ত সিঁড়ি বসানো এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কমিশনে। সর্বশেষ রবিবার কমিশনে এলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘একক পরিচিতি নম্বর’ দেওয়ার নামে প্রকল্প, যা বাস্তবায়নে ব্যয় করতে হবে হবে পৌনে দুই শ কোটি টাকা। এসব প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। তাঁরা মনে করছেন, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয় সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। গত রবিবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরে অনুষ্ঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় প্রকল্পটির পরিকল্পনা পেশ করা হয়।

প্রাথমিক স্তরের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক পরিচিতি কার্ড তৈরির খরচও দেখানো হয়েছে তুলনামূলক অনেক বেশি। সংখ্যাটি হবে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দুই কোটি ১৭ লাখ। একটি কার্ড বানাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা খরচ ধরেছেন ৮৩ টাকা। এতে বিস্ময় ব্যক্ত করে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচিতি কার্ড তৈরির খরচ দেখিয়েছে কার্ডপ্রতি ৫৭ টাকা, এখানে ২৬ টাকা বেশি কেন! তখন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এখন তাঁদের দুই কোটি ১৭ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নাম, ক্লাস, রোল নম্বর, পারিবারিক তথ্য নিয়ে ‘প্রফাইল ডাটা বেইস’ তৈরি করতে চায় তাঁরা। ১৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পে এক কোটি টাকা রাখা হয়েছে বিদেশ ভ্রমণে। কমিশন থেকে জানতে চাওয়া হয়, কার্ড তৈরি করতে কেন বিদেশ ভ্রমণ করতে হবে? কোনো জবাব আসেনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কার্ডটি একজন শিক্ষার্থীকে দুইবার গণনা করা ঠেকাবে, সহজ হবে বই বিতরণ ও উপবৃত্তিসহ অন্যান্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এ সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরা হয়। কমিশন জানতে চায়, যেহেতু ২০২০ সালে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যাবে, তাহলে পরের বছর থেকে যারা প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি হবে তাদের কী করা হবে? শিশুরা কার্ড হারিয়ে ফেলবে। নতুন কার্ডের টাকা কোত্থেকে আসবে?

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষে কতটুকু টেকসই হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ আমাদের দেশে একটি প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পর এর পরে আর কোনো খবর রাখা হয় না। সার্বিক বিষয়ে জানতে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অবশ্য কমিশনের যুগ্ম প্রধান খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের কিছু বিষয় সংশোধন করতে তাদেরকে বলেছি। তারা ওই সব বিষয় সংশোধন করে আবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাবে।’ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন একজন প্রতিনিধি জানান, কার্ড তৈরির খরচসহ অন্যান্য বিষয়ে সংশোধন করা হবে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি বসানোর একটি প্রস্তাব দেওয়া হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ধারণাটিকে অযৌক্তিক ও বিলাসী বলে আখ্যা দিয়েছে কমিশন। প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্বাচিত ১৬৩টি স্কুলে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করার প্রস্তাব দেয় অধিদপ্তর। প্রতি জোড়া চলন্ত সিঁড়ির খরচ ধরা হয়েছে প্রায় সাত কোটি টাকা। প্রস্তাবটি শিগগিরই পরিকল্পনামন্ত্রীকে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের ২৪ হাজার স্কুলে এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। যেখানে এত বিশালসংখ্যক স্কুলে বিদ্যুৎ সুবিধাই নেই, সেখানে মাধ্যমিক স্কুলে চলন্ত সিঁড়ি বসানো বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রীর সামনে তুলে ধরার জন্য কমিশন যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্কুলে চলন্ত সিঁড়ি বসানো হলে এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হতে হতে নষ্ট হয়ে যাবে। বিদ্যুতের অপচয় হবে। একই সঙ্গে অর্থেরও অপচয় হবে। চলন্ত সিঁড়ির পরিবর্তে শুধু সিঁড়ি বসানোর পক্ষে কমিশন। এ ছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালু করতে ১৮৬ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে সরকারের উন্নয়ন বাজেট থেকে। শিক্ষাদানের এমন প্রস্তাবেও আপত্তি জানিয়েছে কমিশন। প্রকল্পটি সংশোধন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কমিশন থেকে।

 

 



মন্তব্য