kalerkantho


শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে যুক্তরাজ্য

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে যুক্তরাজ্য

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল গণভবনে সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী বরিস জনসন । ছবি : বাসস

বেসামরিক ফ্লাইটের নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশের উদ্যোগের জোরালো প্রশংসা করে শিগগিরই ঢাকা-লন্ডন কার্গো ফ্লাইট চলাচল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন সফররত ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথবিষয়ক মন্ত্রী বরিস জনসন। গতকাল শুক্রবার রাতে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ উত্তর দেন। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে তারও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তিনি। রোহিঙ্গাদের দ্রুত স্বেচ্ছায়, সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পর আগামীতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরো জোরালো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সব ইস্যুর পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় আসেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। প্রায় ১০ বছর পর কোনো ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম ঢাকা সফর।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে আলাদা বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসে লন্ডনে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীশিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতিরও প্রশংসা করেছে যুক্তরাজ্য।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেরি হলে জটিলতা বাড়বে। তাঁর এ বক্তব্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একমত পোষণ করেন। তাঁরা উভয়েই মনে করেন, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ (ইউএনএইচসিআর) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যাতে রোহিঙ্গাদের জন্য সেবা দিতে পারে সে জন্য  মিয়ানমারের সুযোগ দেওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সু চির আন্তরিকভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গাদের বিশাল বোঝার কথা উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের কী করা উচিত সে বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য একই ধারণা পোষণ করে।

বৈঠকে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের প্রাক্কালে গত বুধবার লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে বিএনপির হামলার বিষয়টি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তুলেছেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলার বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশের দায়িত্ব বিদেশি দূতাবাস ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান হলো বিচারব্যবস্থা স্বাধীন। আদালতের বিচারেই ওই রায় হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার সংবিধান অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে কাজ করবে। নির্বাচন আয়োজন করবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গতকাল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বরিস জনসনের এটিই প্রথম বাংলাদেশ সফর। তিনি খুবই চমত্কৃত ও খুশি হয়েছেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন।

সফরের প্রাক্কালে বরিস জনসন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুর্দশা এবং তারা যে কষ্ট সহ্য করছে তা আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর অন্যতম। এটি মনুষ্যসৃষ্ট ট্র্যাজেডি, যা সঠিক রাজনৈতিক ইচ্ছা, সহনশীলতা ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।’

বরিস জনসন বলেন, ‘ওই লোকগুলো কী ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা আমি নিজেই দেখতে ও শুনতে চাই। আর এই মর্মান্তিক সংকট মোকাবেলায় আমরা কিভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারি সে বিষয়ে আমি স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও অন্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলব।’

এদিকে তাঁর এশিয়া সফরের প্রাক্কালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তর একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছে। এর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে—‘রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।’

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তর জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন তাঁর চার দিনের সফরে এশিয়া সফরে বাংলাদেশ ছাড়াও মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সফর করবেন। তিনি আজ শনিবার কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতি সচক্ষে দেখবেন এবং রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বসতভূমিতে ফেরার উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে করণীয় বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন। মিয়ানমারে তিনি স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং রাখাইন রাজ্যে যাবেন। এরপর তিনি ব্যাংককে গিয়ে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেয়াথ চান ও-চার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া তিনি রাখাইন পরামর্শক কমিশন বিষয়ে পরামর্শক বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক থাই উপপ্রধানমন্ত্রী সুরাকিয়ার্ত সত্যার্থীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন।


মন্তব্য