kalerkantho


অসম্ভবের পেছনেই ছুটতে হবে বাংলাদেশকে

মাসুদ পারভেজ   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অসম্ভবের পেছনেই ছুটতে হবে বাংলাদেশকে

হতাশার ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়ে আলো ছড়িয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। ছবি : মীর ফরিদ

রসিকতা করেই কথাটা বললেন রোশেন সিলভা। তবে মিরপুর টেস্টের যা অবস্থা, তাতে স্বাগতিকরা অন্তত তাঁর কথামতো প্রার্থনায় ডুবে গিয়ে সুফল পেলেও পেতে পারে!

চট্টগ্রাম টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান এই ম্যাচে টানা দ্বিতীয় ফিফটিতে শ্রীলঙ্কার লিড তিন শ পার করে নিয়ে যাওয়ার পর এসেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। সেখানেই তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলো এমন টার্নিং উইকেটে ব্যাটিং অ্যাপ্রোচটা কেমন হওয়া উচিত। এর জবাবেই বললেন, ‘ব্যাটিংয়ের আগে প্রার্থনা করে যাওয়াই সেরা উপায়।’

দূর যাত্রার আগে মানুষ প্রার্থনা খুব করেও। এই টেস্ট জিততে হলেও বহুদূর যেতে হবে বাংলাদেশকে। তার আগে প্রার্থনাও এ মুহূর্তে কম জরুরি নয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য। কারণ নিজেরা এই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সর্বনিম্ন ১১০ রানে অল আউট হওয়ার পর লঙ্কানরা দ্বিতীয় দিনের শেষেই নিয়ে ফেলেছে ৩১২ রানের লিড। আজ শেষ ২ উইকেট হারিয়ে আর কোনো রান যোগ না করলেও যে এই রান তাড়া করে জেতা প্রায় অসম্ভব, সে তথ্য-উপাত্ত তো পরিসংখ্যানেই সংরক্ষিত আছে।

মিরপুরে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডই ২০৯ রানের। সেটি ইংল্যান্ডের, ২০১০ সালে বাংলাদেশের  বিপক্ষে। আর এই মাঠে ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১০১ রান তাড়া করে জেতা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। তাও আবার ৭ উইকেট হারিয়ে সেই ম্যাচ জিততেও স্বাগতিক শিবিরে কাঁপাকাঁপি ছিল প্রবল। অবশ্য ক্রিকেট পরিসংখ্যানের বহুমুখিতা অনুপ্রেরণার পথও খোলা রাখে। খোলা রাখছে বাংলাদেশের জন্যও।

যেমন স্মৃতির ধুলো সরিয়ে উঁকি দিচ্ছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে মিরপুরেই হওয়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ‘ছয় দিনের’ টেস্টও। পাঁচ দিনের টেস্টের মাঝখানে জাতীয় নির্বাচনের জন্য এক দিনের বিরতিও ছিল যে! ওই টেস্টে ৫২১ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ করেছিল ৪১৩, হেরেছিল ১০৭ রানে। তবে তখন আর এখনকার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তখন চাইলেও বাংলাদেশ এ রকম ঘূর্ণি পিচ তৈরি করতে পারত না, এখন পারে। যেজন্য চার বছর পর টেস্ট প্রত্যাবর্তনে সফল আব্দুর রাজ্জাকও আগের দিন বলেছেন যে দেশের মাটিতে এ রকম উইকেট তিনি আগে পাননি কখনোই।

এখন পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশের স্পিনাররা সাফল্যের ফুলও ফোটান। ফুটিয়েছেন ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও। কিন্তু ঐতিহাসিক ওই দুই টেস্টের সঙ্গে এই ম্যাচের পার্থক্য হলো প্রথম ইনিংস। ২০১৬-র অক্টোবরে ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে লিড নিয়েছিল ঠিক, কিন্তু তা ছিল মাত্র ২৪ রানের। গত বছর আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিডও ছিল মাত্র ৪৩ রানের। আর এই মিরপুর টেস্টে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকার ব্যবধান এর চেয়ে প্রায় তিন গুণ, ১১২ রানের।

শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংসে যেখানে ৬ উইকেটে ১১০ রান থেকে গেছে ২২২ পর্যন্ত, বাংলাদেশ সেখানে ১১০ রানে অল আউট ২০ বলের মধ্যে মাত্র ৩ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়ে। প্রথম দিনের ব্যাটিংয়েই এ রকম কিছুর শঙ্কা জেগেছিল। বাকি ব্যাটসম্যানরা কাল সেটি দূর করার বদলে উল্টো টেনে আনলেন। ৪ উইকেটে ৫৬ রান নিয়ে দিন শুরুর পর বেশিক্ষণ টেকেনি মেহেদী হাসান মিরাজ ও লিটন কুমার দাশের জুটি। সেটিতে লিটনের (২৫) দায়ই বেশি, সুরঙ্গা লাকমলের করা অনেক বাইরের বলে চালাতে গিয়ে টেনে আনেন স্টাম্পে।

তবে তখনো বোঝা যায়নি যে ইনিংসের শেষটা এ রকম হবে। মিরাজকে নিয়ে অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর জুটি দলকে এক শ পার করে নিয়ে যাওয়ার সময়ও নয়। কিন্তু আকিলা ধনাঞ্জয়ার বলে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে মাহমুদ উল্লাহ বোল্ড হতেই যেন বেজে যায় পাগলাঘণ্টি! চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ বলে অপরাজিত ৮ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচ বাঁচানোতে ভূমিকা রাখা মোসাদ্দেক হোসেনকে আবাহনীর হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে দ্রুত রান তোলার জন্য যাঁকে একাদশে নেওয়া হয়েছে, সেই সাব্বির রহমানও ম্যাচ পরিস্থিতি ভুলে তাঁর ধরা-বাঁধা ‘দায়িত্ব’ই পালন করলেন! মাত্র ৩ বল টিকলেন, ধনাঞ্জয়ার বলেই সহজ ক্যাচ তুলে দিয়ে গেলেন দীনেশ চান্ডিমালের হাতে!

মিরাজ তখনো আছেন কিন্তু সঙ্গে কোনো স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নেই। অপরাজিত ৩৮ রানের ইনিংস খেলতে খেলতে অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখলেন বাকিদের আসা-যাওয়ার মিছিলও। প্রথম ইনিংসে বল হাতে নিষ্প্রভ হলেও এবার মিরাজ (২/২৯) ফিরলেন ছন্দেও। তবে প্রথম ইনিংসে সফল দুই বাঁহাতি স্পিনার রাজ্জাক (১/৬০) আর তাইজুল ইসলামদের (২/৭২) মাঝে ভালো বোলিংয়ের পাশাপাশি আলগা বল দেওয়ার ছন্দপতনও থাকল। যে কারণে মাঝখানে দুর্দান্ত এক স্পেল করা মুস্তাফিজুর রহমানের (৩/৩৫) বোলিংও যথেষ্ট হলো না লঙ্কানদের অল্পতে আটকে রাখার ক্ষেত্রে। বরং দিমুথ করুণারত্নে (৩২), ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা (২৮) ও চান্ডিমালরা (৩০) বড় না হলেও ছোট্ট কিন্তু কার্যকর ইনিংস খেললেন। সেই সঙ্গে ৫৮ রানে অপরাজিত রোশেন সিলভা আজ এমনিতেই বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশের টার্গেট আরো বাড়িয়ে নিতে তো আছেনই।

এই দূর যাত্রার সাফল্যে বাংলাদেশের জন্য সমবেত প্রার্থনাই এখন হয়তো খুব জরুরি!


মন্তব্য