kalerkantho


দুর্নীতির দণ্ড, খালেদা কারাগারে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুর্নীতির দণ্ড, খালেদা কারাগারে

রায় শুনে গতকাল আদালত থেকে বেরিয়ে কারাগারে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়া। ছবি : সংগৃহীত

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। পুরান ঢাকার বকশীবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে দুপুর ২টা ৩২ মিনিটে রায় ঘোষণা করা হয়। খালেদা জিয়ার বয়স, শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাঁকে অন্যদের চেয়ে কম সাজা দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন বিচারক। রায় ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্য চারজন হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

এ রায় ঘিরে গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ঢাকা ছিল কার্যত বিচ্ছিন্ন। জনমনে ছিল আতঙ্ক।

এটি হলো দেশের দ্বিতীয় কোনো সরকারপ্রধানের শাস্তি পাওয়ার ঘটনা। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে কয়েকটি মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছিল।

তারেক রহমান এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দণ্ডিত হলেন। এর আগে সিঙ্গাপুরে অর্থপাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়ার মামলায় তারেক রহমান নিম্ন আদালত থেকে খালাস পেলেও হাইকোর্ট তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজা পরোয়ানা নিয়ে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন।

রায় ঘোষণার পর খালেদা জিয়া তাঁর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে বলেন, ‘দেশবাসী যেন শান্ত থাকে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবে। কোনো বিশৃঙ্খলা করবে না।’

খালেদা জিয়াসহ সব আসামির বিরুদ্ধে এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় তারেক রহমান, কাজী সালিমুল হক কামাল, শরফুদ্দিন আহমেদ, মমিনুর রহমান ও ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা জরিমানা করা হয়। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে—উল্লেখ করে আদালত রায়ে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বয়স, তাঁর শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।’

আসামি তারেক রহমান, মমিনুর রহমান ও ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী পলাতক রয়েছেন। তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর বা আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর সাজা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালত রায়ে বলেন, ১১টি বিষয় সামনে রেখে এই বিচার করা হয়েছে। এক. প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল কি না। দুই. ওই অ্যাকাউন্টে সৌদি আরব থেকে টাকা জমা হয়েছিল কি না। তিন. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে একটি ট্রাস্টি গঠন করা হয়েছিল কি না। চার. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে গুলশানের সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল কি না। পাঁচ. ওই ট্রাস্টে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা স্থানান্তর হয়েছিল কি না। ছয়. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা স্থানান্তর করে তারেক রহমান ও মমিনুরের অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়েছিল কি না। সাত. ওই টাকা কাজী সলিমুল হক কামালের নামে তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থায়ী হিসাব (এফডিআর) করা হয়েছিল কি না। আট. সেখান থেকে আসামি শরফুদ্দিন আহমেদের ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না এবং তা আত্মসাৎ হয়েছে কি না। ৯. আসামিরা দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় অপরাধ করেছেন কি না। ১০. রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে কি না। এবং ১১. অপরাধ করে থাকলে আসামিরা শাস্তি পাবেন কি না।

আদালত বলেন, এই ১১টি বিষয় সাক্ষ্যপ্রমাণে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং এই মামলায় দাখিলকৃত দলিলপত্র প্রমাণ করে যে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকবেন তাঁর গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগম। গতকাল রায় ঘোষণার পর আইনজীবীরা বিচারকের কাছে এ জন্য আবেদন জানালে বিচারক তা গ্রহণ করেন।

আদালতের পরিবেশ : বিচারক দুপুর আড়াইটায় এজলাসে ওঠেন। প্রথমে খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান আদালতকে বলেন, ‘রায় যাই হোক। আমরা জাবেদা নকলের জন্য আজই দরখাস্ত করছি। রায়ের পর আমাদের রায়ের একটি ফটোকপি আদালতের সিল-স্বাক্ষরসহ যেন সরবরাহ করা হয়।’ এরপর বিচারক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আদালত কক্ষে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর যাঁরা আছেন তাঁদের বের করে দেওয়া হোক।’ তখন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বের করে দেওয়া হয়। বিচারক ২টা ৩২ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু করেন। তিনি জানান, ৬৩২ পৃষ্ঠা রায় লেখা হয়েছে। তবে তিনি রায়ের উল্লেখযোগ্য অংশটুকু পড়ে শোনাবেন। তিনি বলেন, এই মামলায় অভিযোগ গঠনের পর বারবার আসামিপক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে যাওয়া হয়, যে কারণে সাক্ষ্যগ্রহণে বিলম্ব হয়। বারবার আদালত পরিবর্তনের আবেদনও হাইকোর্টে করা হয় বলে বিচারক উল্লেখ করেন। আদালত বলেন, তাঁর প্রতিও খালেদা জিয়া অনাস্থা দেন। তবে তাঁর আদালত থেকে অন্য আদালতে মামলা স্থানান্তরের আবেদন উচ্চ আদালত নামঞ্জুর করেন। এরপর মামলার ঘটনা ও এজাহার পড়ে শোনানো হয়। পরে রায়ের শুধু আদেশ অংশটুকু ঘোষণা করেই বিচারক এজলাস থেকে নেমে যান। ওই সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মৃদু হৈচৈ করে ওঠেন। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ফলস কেস, ফলস কেস।’

রায় ঘোষণার সময় খালেদা জিয়া আদালতে হাজির ছিলেন। দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে নিজের পাজেরো জিপে করে হালকা ঘিয়া রঙের শাড়ি পরা অবস্থায় খালেদা জিয়া আদালতে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি আদালতকক্ষের এক কোনায় নির্ধারিত চেয়ারে বসেন। রায় ঘোষণার কিছুক্ষণ পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন তাঁর আইনজীবীরা। পরে তাঁকে আদালত থেকে তাঁর গাড়িতে করেই পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। রায়ের পর খালেদা জিয়াকে নিশ্চুপ দেখা গেছে। তাঁর চোখের কোনায় সামান্য পানি দেখা যায়। আদালতে আসার পর থেকেই তিনি বিমর্ষ ছিলেন।

অপর দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামালকে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে এবং শরফুদ্দিন আহমেদকে সকাল ৮টার দিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। আসামির কাঠগড়ায় রাখা হয় তাঁদের। রায়ের পর তাঁরা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তাঁদেরও কারাগারে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল থেকেই আদালতে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সকাল ৮টা থেকেই পুলিশ আদালত চত্বর ঘিরে রাখে। বকশীবাজার মোড় থেকে লোকজনকে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। একে একে সাংবাদিক ও আইনজীবীরা উপস্থিত হতে থাকলে প্রথমে তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তালিকা করে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়। ঢাকার আদালতে কর্মরত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের বাধা না দিলেও আসামিপক্ষের অনেক আইনজীবীকেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সিনিয়র আইনজীবী এবং যাঁরা নিয়মিত ওই আদালতে মামলার কার্যক্রমে অংশ নেন তাঁদের মধ্যে সীমিতসংখ্যক আইনজীবীকে ঢুকতে দেওয়া হয়।

তবে আদালত কক্ষে বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার ছিল না। গতকাল চেয়ারের সংখ্যা কমানো হয় বলে জানা যায়। সাংবাদিকদের কয়েকটি চেয়ার দেওয়া হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। দুদকের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম বেনু দৈনিক বণিক বার্তার সাংবাদিক প্রিয়লাল সাহাকে উঠিয়ে দিয়ে তাঁর চেয়ার কেড়ে নেন। এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরে কথাকাটাকাটি হয়।

মামলার বিবরণ : গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করেছিল দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর-রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

অভিযোগ গঠনের পর এই মামলার কার্যক্রম বাতিল করতে খালেদা জিয়ার পক্ষে বারবার উচ্চ আদালতে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবারই তা নামঞ্জুর হয়েছে। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর  সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এই মামলায় মোট ৩২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে খালেদা জিয়া ১০ কার্যদিবস বক্তব্য দেন। গত বছর ১৯ ডিসেম্বর মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শেষ করে। এরপর খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির পক্ষে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। মোট ১৬ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি করা হয় আসামিপক্ষে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার পক্ষে ৯ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি করা হয়।

খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ৪০৯ ধারায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, আর ৫(২) ধারায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়। ৪০৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর দুদক আইনের ৫(২) ধারায় সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা হচ্ছে অপরাধে পরস্পরকে সহযোগিতা করা। রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, দুটি ধারার অভিযোগই প্রমাণ হয়েছে। তবে একটি ধারায় শাস্তি দেওয়ায় অপর ধারায় শাস্তি দেওয়া হয়নি।

অভিযোগ অনুযায়ী আত্মসাতের ঘটনা : মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের রমনা কর্পোরেট শাখায় প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে একটি হিসাব খোলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীকে দিয়ে ওই ব্যাংক হিসাবটি খোলা হয়। হিসাবটি পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীকে। ১৯৯১ সালের ৯ জুন ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় চার কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা) প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে একটি ডিডির মাধ্যমে জমা হয়। ওই সময় থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের কোনো এতিমখানায় ওই টাকা ব্যয় না করে সরকারি তহবিলেই রাখা হয়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফত রহমান কোকো এবং জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন। তারেক রহমানকে ওই ট্রাস্টের ‘সেটেলর’ বা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের ওই টাকা থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে গুলশান নিউ নর্থ সার্কেল রোড শাখার সোনালী ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে তাতে জমা করা হয় ওই টাকা। সেখান থেকে দুই লাখ ৭৭ হাজার টাকা দিয়ে বগুড়ার গাবতলী থানার দারাইল মৌজায় দুই একর ৭৯ শতাংশ জমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে কেনা হয়। কিন্তু ১৯৯৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর এতিমখানার জন্য কোনো স্থাপনা তৈরি করা হয়নি। এতিম বা দুস্থদের নামে কোনো টাকাও ব্যয় করা হয়নি। এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবে অব্যবহৃত টাকা সুদ-আসলসহ ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিন কোটি ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৭৫৭ টাকায় দাঁড়ায়। এদিকে ট্রাস্টি সদস্য তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত পাঁচটি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা গুলশান শাখা প্রাইম ব্যাংকে এফডিআর খোলা হয়। বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামালকে দিয়ে নগদায়ন করা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। পরে কাজী সালিমুল হক কামালের ব্যক্তিগত নামে স্থায়ী হিসাব খোলা হয়। এরপর কাজী সালিমুল হক ও সাইদ নামের আরেক ব্যবসায়ীর নামে হিসাব খুলে সেখানে টাকা স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই টাকা গিয়াস উদ্দিন নামের আরেকজনের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা স্থানান্তর করা হয় ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের নামে। ওই টাকাটা সবাই মিলে আত্মসাৎ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, এক ব্যাংক হিসাব থেকে আরেক ব্যাংক হিসাবে আসামিদের স্থানান্তরের অভিযোগের সমর্থনে সব ব্যাংকের কাগজপত্র এই মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে। সেগুলো আদালতেও দাখিল করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১০ বছর ধরে মামলাটি পরিচালনা করে আসছি। বিচার শেষ হয়েছে, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। প্রমাণ করতে পেরেছি, এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা। খালেদা জিয়া এতিমদের টাকা দুই পুত্রকে দিয়েছেন। সেখান থেকে অন্যরা মিলে সবাই আত্মসাৎ করেছেন। আসামিপক্ষ থেকে দুদক সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।’

অ্যাডভোকেট কাজল আরো বলেন, এই মামলা এক-এগারোর সরকারের সময় দুদক করেছে। সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। এই মামলার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো প্রভাবও ছিল না।

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত খালেদা জিয়া, কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ কিছুই বলেননি। খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই রায় ফরমায়েশি রায়। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। আশা করি উচ্চ আদালত খালেদা জিয়াকে খালাস দেবেন।’

খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৭৩ বছর বয়স্ক মহিলাকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলেছেন তাঁর সচিব। কিন্তু এ ধরনের কোনো নির্দেশনার দলিল নেই। শুধু একজন সাক্ষী এটা বলেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অবশ্যই আপিল করা হবে।’

অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘প্রভাবিত রায়। খালেদা জিয়া কোনো অন্যায় করেননি। কোনো টাকা আত্মসাৎ করেননি। এমন কোনো প্রমাণ কেউ (সাক্ষীরা) দিতেও পারেননি। তার পরও অবৈধভাবে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি ন্যায়ভ্রষ্ট রায়। খালেদা জিয়া কী অপরাধ করেছেন তা মামলায়ও স্পষ্ট নয়, রায়েও স্পষ্ট করা হয়নি।

আদালতে ছিলেন যাঁরা : রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ ও খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস। খালেদা জিয়া আদালত পৌঁছার আগে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে তাঁরা আদালতে উপস্থিত হন। অবশ্য আদালত থেকে বের হওয়ার সময় শিমুল বিশ্বাসকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, মীর নাছির উদ্দিন, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মীর আলী আহমেদ সালাম, মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর, রেজাউল করিম, ঢাকা জেলা পিপি খন্দকার আবদুল মান্নান, ঢাকা মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু প্রমুখ।



মন্তব্য