kalerkantho


যেভাবে বিচারের মুখোমুখি খালেদা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



যেভাবে বিচারের মুখোমুখি খালেদা

ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ বৃহস্পতিবার। ঢাকার বিশেষ জজ-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করবেন। গত ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত এই রায়ের তারিখ ধার্য করেন।

রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে খালেদা জিয়ার এই মামলার বিচার চলছে। আজ আদালতে খালেদা জিয়ার হাজির হওয়ার কথা রয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ কে (১) ধারামতে আদালত রায় ঘোষণা করবেন। ওই ধারায় বলা হয়েছে, আদালত মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি ও আইনগত ব্যাখ্যা শোনার পর রায় ঘোষণা করবেন। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, রায়ে আদালত আসামিকে খালাস দেবেন অথবা শাস্তি দেবেন। রায় ঘোষণা কোনো কারণে না পেছালে আজই নির্ধারিত হবে খালেদা জিয়া কারাগারে যাবেন, নাকি মামলা থেকে খালাস পাবেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর-রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।

মামলায় খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান পলাতক রয়েছেন। তাঁদের পলাতক ঘোষণা করে অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগ গঠনের পর

সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এই মামলায় মোট ৩২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে খালেদা জিয়া ১০ কার্যদিবসে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। গত বছর ১৯ ডিসেম্বর মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ করে। এরপর খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির পক্ষে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তিতর্ক শুনানি করা হয়। যুক্তিতর্ক শুনানির পর এখন আদালতের সামনে রায় ঘোষণা বাকি আছে।

খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এ কারণে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা, ১০৯ ধারা ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ৪০৯ ধারায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, আর ৫(২) ধারায় ক্ষমতার অবব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ৪০৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর দুদক আইনের ৫(২) ধারায় সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা হচ্ছে অপরাধে পরস্পরকে সহযোগিতা করা। দুটি ধারার অভিযোগ প্রমাণ হলে আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

মামলার অভিযোগে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা : মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের রমনা করপোরেট শাখায় প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে একটি হিসাব খোলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীকে দিয়ে ওই ব্যাংক হিসাবটি খোলা হয়। হিসাবটি পরিচালনা করার দায়িত্ব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীকে দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ৯ জুন ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় চার কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা) প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে একটি ডিডির মাধ্যমে জমা হয়। ওই সময় থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের কোনো এতিমখানায় ওই টাকা ব্যয় না করে সরকারি তহবিলেই রাখা হয়। এরই মধ্যে খালেদা জিয়া তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো এবং জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। তারেক রহমানকে ওই ট্রাস্টের ‘সেটেলর’ বা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের ওই টাকা থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে গুলশান নিউ নর্থ সার্কেল রোড শাখার সোনালী ব্যাংকে একটি হিসাব খোলা হয়। ওই হিসাবে টাকাগুলো জমা হয়। সেখান থেকে দুই লাখ ৭৭ হাজার টাকা দিয়ে বগুড়ার গাবতলী থানার দারাইল মৌজায় ২ একর ৭৯ শতাংশ জমি কেনা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। কিন্তু ১৯৯৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর এতিমখানার জন্য কোনো স্থাপনা তৈরি করা হয়নি। এতিম বা দুস্থদের নামে কোনো টাকাও ব্যয় করা হয়নি। এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ব্যাংক হিসাবে অব্যবহৃত টাকা সুদ-আসলসহ ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিন কোটি ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৭৫৭ টাকায় দাঁড়ায়। এদিকে ট্রাস্টি ও সদস্য তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত পাঁচটি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা গুলশান শাখা প্রাইম ব্যাংকে স্থায়ী হিসাব (এফডিআর) খোলা হয়। বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামালকে দিয়ে নগদায়ন করা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। পরে কাজী সালিমুল হক কামালের ব্যক্তিগত নামে স্থায়ী হিসাব খোলা হয়। এরপর সালিমুল হক ও সাইদ নামের এক ব্যবসায়ীর হিসাব খুলে সেখানে টাকাগুলো স্থানান্তর করা হয়। তারপর ওই টাকা গিয়াস উদ্দিন নামের আরেকজনের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে আসামি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের নামে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা স্থানান্তর করা হয়। ওই টাকা সবাই মিলে আত্মসাৎ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, এক ব্যাংক হিসাব থেকে আরেক ব্যাংক হিসাবে আসামিদের অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের সমর্থনে সব ব্যাংকের কাগজপত্র এই মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে। ওই সব কাগজপত্র আদালতেও দাখিল করা হয়েছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর ব্যাপক কর্মকাণ্ড চলেছে। তবে কী কী কর্মকাণ্ড চলেছে তা আদালতে প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামীয় অর্থ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত টাকা। কোনো সরকারি টাকা নয়। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারও শেষের পথে : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচারও শেষের পথে। যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলেই এ মামলার রায়ের দিন ধার্য করা হবে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ বিচারাধীন এ মামলার বিচারকও ড. মো. আখতারুজ্জামান। এই মামলার বিচারও চলছে রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে। একই আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করবেন আজ।


মন্তব্য