kalerkantho


রাখাইনে আরো পাঁচ গণকবর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাখাইনে আরো পাঁচ গণকবর

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের একটি গ্রামে আরো পাঁচটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে প্রায় ৪০০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যার পর এসিড ঢেলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। এর পরই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ার কারণে মাটি সরে যাওয়ায় মরদেহগুলো ভেসে ওঠে। গতকাল বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এপির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। 

এদিকে মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লি বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সফর শেষে গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযানে গণহত্যার সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে। রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন-নিপীড়ন গণহত্যা কি না সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো ট্রাইব্যুনাল বা আদালত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে। তবে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি যা দেখেছেন তা গণহত্যার নিদর্শন।

নতুন গণকবরের সন্ধান পাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইয়াংহি লি বলেন, তাঁর কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাঁকে অং সান সু চির সরকার মিয়ানমারে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং কোনো সহযোগিতাও করছে না। নতুন গণকবরের সন্ধান বিষয়ে তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার ইঙ্গিত করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি নমুনা।’

ইয়াংহি লি বলেন, এ ধরনের খবরগুলোর বিষয়ে অবশ্যই অনুসন্ধান চালাতে হবে। এ কারণেই জাতিসংঘ একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বসতিগুলোতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এগুলো গণহত্যার নিদর্শন।

এদিকে এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনের গু দার পিন গ্রামে গত আগস্ট মাসে গণহত্যায় কয়েক শ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পাঁচটি গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ২০ জনেরও বেশি ব্যক্তি ও নিহতদের স্বজনদের সাক্ষ্য এবং হামলার পর মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ দেখে এ ধারণা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজটিতে সময়ও উল্লেখ আছে।

ধারণা করা হচ্ছে, মিয়ানমারের সেনারা ৪০০-এরও বেশি রোহিঙ্গাকে ওই গ্রামে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে এক দল রোহিঙ্গা ছিল যাদের ‘চিনলোন’ (ফুটবলের মতো খেলা) খেলার জন্য দল বাছাই করা হচ্ছিল। মিয়ানমারের সেনারা তখন সেখানে গিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়।

গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া নুর কাদির নামের এক রোহিঙ্গা জানান, ওই ঘটনার পর দুটি আলাদা গণকবরে তিনি তাঁর ছয় বন্ধুর মরদেহ পেয়েছেন। পরনে প্যান্টের রং ছাড়া তাদের চেনার আর কোনো উপায় ছিল না। বার্তা সংস্থা এপির কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, মরদেহগুলো পোড়াতে এসিড ব্যবহার করা হয়েছে।

গত বছরের ২৭ আগস্ট ওই গণহত্যাটি সংঘটিত হয় বলে ধারণা করা হয়। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা বার্তা সংস্থা এপিকে জানায়, নৃশংসতার প্রমাণ আড়াল করতে সেনাবাহিনী চেষ্টা চালিয়েছে। মুষলধারে বৃষ্টির পর গণকবরের মরদেহগুলো ভেসে ওঠে এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা মোবাইল ফোনে সেগুলোর ভিডিও করতে সক্ষম হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, এপির এই প্রতিবেদন মিয়ানমারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতা আরো বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ওই প্রতিবেদন মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘের নেতৃত্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তাকে আরো জোরালো করেছে।

রবার্টসন বলেন, মরদেহ পোড়াতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এসিড ব্যবহার থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ওই নৃশংসতা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেনাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপের এটিই সময়।

মিয়ানমার এর আগে রাখাইনের ইন দিন গ্রামে একটি গণকবরে ১০টি মরদেহ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছিল, ওই মরদেহগুলো সন্ত্রাসীদের। তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ওই ঘটনাকে পানিতে ভাসমান বরফ খণ্ডের দৃশ্যমান অংশের সঙ্গে তুলনা করেছিল।

গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

গত নভেম্বর মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি সইয়ের পর বর্তমানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। তবে এখনো রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তের ওপার মিয়ানমার অংশে গত বুধবার রাতেও আগুন দেখা গেছে। জানা গেছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে নতুন করে আগুন দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। দুই দিন ধরে থেমে থেমে গুলির শব্দ আসছে। এ নিয়ে সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থানরত প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির ইয়াঙ্গুনের বাড়িতে গতকাল কে বা কারা একটি পেট্রলবোমা ছুড়েছে। সু চি সে সময় বাড়িতে ছিলেন না। চ্যানেল নিউজ এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সু চিকে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা বিরল। অং সান সু চি বর্তমানে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে সরকারি বাসভবনে বাস করেন।


মন্তব্য