kalerkantho


অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী

নিজ সংস্কৃতি ও ভাষাকে মর্যাদা দিন

১২ লেখককে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নিজ সংস্কৃতি ও ভাষাকে মর্যাদা দিন

অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন স্টল ঘুরে বই দেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে দুয়ার খুলল মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি নিজ দেশের ভাষা ও কৃষ্টি, শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র উদ্বোধন করার পাশাপাশি আগামী ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই অনুষ্ঠানে ২০১৭ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কারও প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা, নিজেদের শিল্প-সাহিত্যকে যদি আমরা মর্যাদা দিতে না পারি, তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে আরো উন্নত হতে পারব না।’

বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক ও শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ, যে বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও তাদের ভাষার চর্চা করতে পারবে। তা ছাড়া আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হবে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘এই বাংলা একাডেমিতে আজকে বইমেলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার বই বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে, আমাদের বাংলা ভাষার লেখাগুলোও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিবার যখন বইমেলা হয় তখন কোনো না কোনো দেশের কবি-সাহিত্যিকরা এখানে উপস্থিত হন; যাঁদের অনেকেই বাংলা ভাষার চর্চা করেন, তাঁরা আমাদের উৎসাহিত করেন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা বিশ্বে আরো বৃদ্ধি পায়।’ প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ‘আমাদের শিল্প-

সংস্কৃতি কেবল বাংলাদেশের সীমানায় না, বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে পৌঁছে যাবে।’

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আলোকে দেশের ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে ধরে রাখায় তাঁর সরকার বরাবরই আন্তরিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বইমেলা কিন্তু কেবল বই কেনাবেচার জন্য নয়। বইমেলা কিন্তু আকর্ষণ করে। আমাদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটা প্রসারিত করে। অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়। কাজেই আমরা নিজেরাই এই বইমেলাকে বলি এটা আমাদের প্রাণের মেলা।’

লেখক, পাঠক ও পরিবেশক সবাইকেই অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতি ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অনুষ্ঠিত এই বইমেলা দেশের অনেক নবীন লেখককে তাঁদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশের সুযোগ করে দেয়, আবার অনেক পাঠক সৃষ্টি করে।’ তিনি বলেন, ‘এই মেলা জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। এই ভাষার চর্চা আরো বৃদ্ধি পাক, সেটাই আমরা চাই।’

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেসকো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউনেসকোর এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষাকে আজকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। দেশের সংস্কৃতিকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে আমরা মর্যাদা পেয়েছি, স্বীকৃতি পেয়েছি। এই ধারাবাহিকতা আমাদের বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, অশুভ পথে, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা না সংস্কৃতির চর্চা করতে জানে, না ভাষার চর্চা করতে জানে। এদের মানসিকতা একটু ভিন্ন।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বক্তব্য দেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের কবি ও লেখক এগনিস মিডোসম, ক্যামেরুনের কবি ও সৃষ্টিশীল লেখক অধ্যাপক ড. জয়েস অ্যাসউনটেনটং, মিসরের লেখক ও প্রখ্যাত টেলিভিশন সাংবাদিক ইব্রাহিম এলমাসরি এবং সুইডেনের কবি ও সাহিত্য সমালোচক অরনে জনসন বক্তব্য দেন।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের ভূমিকার প্রশংসা করে এগনিস মিডোসম বলেন, ‘বাংলাদেশ কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে জায়গা দিয়েছে। আমি সত্যি লজ্জিত। আমরা আমাদের দেশে একজন শরণার্থীকে জায়গা দিতে গিয়ে চিন্তা করি।’

অনুষ্ঠানে এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী ১২ জন কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের হাতে পুরস্কারের ক্রেস্ট, সম্মাননা স্মারক ও নগদ অর্থের চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এবার কবিতায় মোহাম্মদ সাদিক ও মারুফুল ইসলাম, কথাসাহিত্যে মামুন হুসাইন, প্রবন্ধে অধ্যাপক মাহবুবুল হক, গবেষণায় অধ্যাপক রফিকউল্লাহ্ খান, অনুবাদে আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে কামরুল ইসলাম ভুঁইয়া ও সুরমা জাহিদ, ভ্রমণকাহিনিতে শাকুর মজিদ, নাটকে মলয় ভৌমিক, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে মোশতাক আহমেদ এবং শিশুসাহিত্যে ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ পুরস্কার পেয়েছেন।

এর আগে ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে একুশের গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সূচনা সংগীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশিত হয় এবং অমর একুশের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে অতিথি হিসেবে আসা বিদেশি লেখকদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখেন এবং প্রকাশক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সূত্র : বাসস।



মন্তব্য