kalerkantho


৩৬ বিশ্ববিদ্যালয়, ৮ কলেজে মাদক বাণিজ্য

অপরাধীর তালিকায় ছাত্রনেতা-পুলিশ গ্রেপ্তারে গড়িমসি

এস এম আজাদ   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অপরাধীর তালিকায় ছাত্রনেতা-পুলিশ গ্রেপ্তারে গড়িমসি

যুবসমাজকে কারা মাদকের বিষে ধ্বংস করে দিচ্ছে, সেটা জানতে গোয়েন্দারা সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করেন। সরকার সেই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাঠে নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তারা সংশ্লিষ্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে অভিযান চালাতে চায়। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ মাদক কারবারে জড়িত শিক্ষার্থীদের সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য সময় চেয়ে নেয়। এর মধ্যে দফায় দফায় প্রতিবেদন চালাচালি হলেও সংশোধন বা অভিযানের কোনো সুরাহা হয়নি। মাঝখান দিয়ে পেরিয়ে গেছে নিষ্ফল কয়েকটি মাস। কারবারিরা বহাল তবিয়তে শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে যাচ্ছে মাদকের বিষ।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদক বাণিজ্য চালানো দুই হাজার ৮৩৪ জনের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক কারবারে জড়িত ৪৬৯ জনের তালিকা করেছেন গোয়েন্দারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও আটটি কলেজ রয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে এক সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, তালিকাভুক্তদের মধ্যে তিনজন মারা গেছে। ২১ জন এখন মাদক কারবারে নেই। বাকি ৪২৭ জন এখনো মাদক কারবারে জড়িত। এদের মধ্যে মাত্র ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানায়, শিক্ষার্থী, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী, আশপাশের দোকানদার, এমনকি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারাও শিক্ষার্থীদের হাতে মাদকদ্রব্য তুলে দিচ্ছে। 

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, তালিকাভুক্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মাদকের আগ্রাসন আছে। প্রভাবশালী একটি ছাত্রসংগঠনের নেতা, পুলিশ ও প্রভাবশালীদের মদদে সেখানে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা হয়। তালিকাভুক্তদের অনেকে পাস করে বের হলেও ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক অপকর্মে এখনো জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাদের নাম তালিকায় থাকায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সহায়তা না পাওয়ায় অভিযান চালানো হচ্ছে না বলে জানায় ডিএনসির একাধিক সূত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক কারবারিদের তালিকার ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আমার কথা বলার প্রয়োজন নেই। কারণ এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। আর মূল কাজটি করবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’

ডিএনসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকে মেধাবী তরুণ প্রজন্ম এখন বিপথগামী। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমরা নজরদারি করছি। কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিয়ে অভিযান চালানো হবে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিএনসি সূত্র জানায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে তিন দফায় মন্ত্রণালয় থেকে ডিএনসিকে তালিকা দিয়ে যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ডিএনসির কর্মকর্তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ও প্রক্টরকে তালিকার ব্যাপারে এরই মধ্যে জানিয়েছেন। বাকিগুলোতেও জানানোর প্রক্রিয়া চলছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চাইছে ডিএনসি। তবে কর্তৃপক্ষ অভিযোগ যাচাই করে অভিযুক্তদের সতর্ক করার সুযোগ চেয়েছে। গত ১৪ জানুয়ারি ডিএনসি কার্যালয়ে একটি অগ্রগতি বৈঠক হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তৃতীয় অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।  জানতে চাইলে ডিএনসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের মাদক কারবারিদের তালিকা চূড়ান্ত হচ্ছে। গোয়েন্দাদের তালিকা সমন্বয় করে মন্ত্রণালয় আমাদের দিচ্ছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।’ 

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এর ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের নজরদারি বাড়ছে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অভিযুক্তরা না শোধরালে বিপদে পড়বে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ ছাত্রনেতার ছত্রচ্ছায়া : গোয়েন্দা সংস্থার তালিকার সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে মাদকের কারবার চলছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চানখাঁরপুল মোড়, পলাশী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বুয়েট, আনন্দবাজার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, নীলক্ষেত, কাঁটাবন ও নিউ মার্কেট এলাকায় বিক্রি হচ্ছে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজা। ফুটপাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে চলছে মাদক সেবন। প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের দোহাই দিয়ে টোকাইরাও মাদক বিক্রি করছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে শহীদুল্লাহ ও মহসিন হলের দুজন শিক্ষার্থী প্রায় একই সুরে বলেন, ‘প্রভাবশালী একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা হলের ভেতরেও গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করে। বাইরের লোকজনও করে। তবে নেতাদের নাম ভাঙানোর কারণে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। পুলিশও এই সুযোগে মাসোয়ারা আদায় করে। তারা কোনো অভিযান করে না।’

গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক মাদকের পৃষ্ঠপোষক ও কারবারি হিসেবে ১৪ জনের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা হলেন—একটি প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জসীমউদ্দীন হলের আশিক পাঠান সেতু, আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক দারুস সালাম শাকিল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহসিন হলের আপেল মাহমুদ সবুর, সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য মহসিন হলের ওয়াসিম ভুঁইয়া আলম, সহসম্পাদক বঙ্গবন্ধু হলের কামরুজ্জামান, আপ্যায়ন সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, উপ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক মহসিন হলের মাহবুবুল ইসলাম, শামসুন নাহার হলের সভাপতি নিশিতা ইকবাল বদি, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নাজমুল হক (শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শহীদুল্লাহ হলের মেহেদী হাসান, একই হলের সাবেক সহসভাপতি নিজামুল হক,  কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এসএম হলের আনোয়ার হোসেন আনু, সলিমুল্লাহ হলের সভাপতি তাহসান ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এহতেশামুল আলম রুমি।

ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, একদিকে তাঁরা নেতা, এর ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এ কারণে তাঁদের আলামত (মাদকদ্রব্য) ছাড়া ধরা কঠিন।

মাদকসংশ্লিষ্টদের তালিকা এবং ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান গত ১৭ জানুয়ারি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয় আমার জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’ 

ডিএনসি কর্তৃপক্ষের কাছে আবারও জানতে চাইলে ডিএনসির ঢাকা-মেট্রো উপ-অঞ্চলের দুজন কর্মকর্তা ১৮ ও ২৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরের সঙ্গে মাদকের ব্যাপারে আলাপ করার কথা জানান। এক কর্মকর্তার দাবি, ‘আমরা ভিসি স্যারকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রক্টর স্যারের সঙ্গে এ নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা কথা বলেছি।’ এবার জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী গত শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি কিছুটা অবহিত আছি। এ ক্ষেত্রে আমরা নজরদারি করছি। প্রশাসনকেও আমরা সহায়তা করে থাকি।’

জগন্নাথে ‘মাদকসম্রাট’সহ ছয় কারবারি: গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী, পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক কারবারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছয়জন। তাঁরা হলেন- ব্যবস্থাপনা বিভাগের সপ্তম ব্যাচের পারভেজ, ফিন্যান্সের অষ্টম ব্যাচের সৌরভ, ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী আনোয়ার হোসেন, অর্থনীতি বিভাগের নবম ব্যাচের তুষন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের জুয়েল এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দশম ব্যাচের সম্রাট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছয়জনই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। তাঁরাও একটি ছাত্রসংগঠনের মদদপুষ্ট বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সম্রাটকে ক্যাম্পাসের অনেকেই মাদকসম্রাট বলে চেনে। এই সম্রাটের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছেও অভিযোগ আছে। ক্যাফেটেরিয়ার কর্মচারী আনোয়ার এখন হিসাব শাখায় কাজ করেন।

জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নূর মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসন থেকে আমাদের এদের নামের তালিকা দিয়ে জানানো হয়েছে। এখানে আমাদেরও দায়িত্ব থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মাদকের মতো খারাপ জিনিসে এভাবে ধ্বংস হতে পারে না। এ কারণে আমরা ওদের খুঁজে বের করে শুধরানোর দায়িত্ব নিয়েছি। ব্যর্থ হলে প্রশাসন নিজের মতো কাজ করবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, সংক্ষিপ্ত নাম থাকায় দু-একজনকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।’

ঢাকা কলেজে নিয়ন্ত্রক পুলিশ কর্মকর্তাও : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিউ মার্কেট থেকে ঢাকা কলেজ এলাকা পর্যন্ত বেশ কয়েকজন মাদক কারবার করে। তবে কলেজকেন্দ্রিক কারবারের নিয়ন্ত্রক তিনজন। তাঁরা হলেন নিউ মার্কেট পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মনির, দক্ষিণখানের ফরিদ মার্কেট এলাকার সবুজ আলীর ছেলে মামুন ও ঢাকা কলেজের সদর গলির পলাশ। গোয়েন্দা তালিকায় মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম দেখে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসআই মনির এখন নিউ মার্কেট পুলিশ ফাঁড়িতে নেই। পদোন্নতি পেয়ে তিনি এখন পুলিশের পরিদর্শক। নিউ মার্কেট এলাকার কয়েকজন দোকানদার বলেন, মনিরের সঙ্গে কয়েকজন মাদক বিক্রেতা ও ছাত্রনেতার ঘনিষ্ঠতা ছিল।

জানতে চাইলে নিউ মার্কেট থানার পরিদর্শক (ওসির চলতি দায়িত্বে) মতলবুর রহমান বলেন, ‘মনির সাত-আট মাস আগে এখান থেকে প্রমোশন পেয়ে বদলি হয়েছে। ঢাকার বাইরে কোথাও আছে।’ মনির মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন অভিযোগ পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে মতলবুর রহমান বলেন, ‘এটা আসলে হতে পারে না। আমরা মাদকের অভিযোগ পেলে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিই।’ 

হাজারীবাগে পাঁচ কারবারি : গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার হাজারীবাগের লেদার টেকনোলজি কলেজকেন্দ্রিক মাদক বাণিজ্য চালাচ্ছে পাঁচজন। তাঁরা হলেন গণকটুলীর সুন্দর বাবুর স্ত্রী জমিলা, হাজারীবাগ থানা যুবলীগ সদস্য রাইসুল ইসলাম রবিন, কালোনগরের রাজীব, মাজার বটতলার সোহেল ও গজমহল লেনের মহিউদ্দিন সরকারের ছেলে আলাউদ্দিন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  তালিকাভুক্তরা গণকটুলীসহ হাজারীবাগের আশপাশের এলাকায় মাদক বাণিজ্য চালায়। এরাই লেদার টেকনোলজি কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে মাদকদ্রব্য। হাজারীবাগ থানার ওসি মীর আলিমুজ্জামান বলেন, কলেজের ভেতরে কারা কিভাবে মাদক কারবার করে তা বের করা কঠিন। তবে এ এলাকায় আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই।

দুই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সিন্ডিকেট : ধানমণ্ডির ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিকেন্দ্রিক মাদক কারবার চালাচ্ছে ২৮ কলাবাগান লেনের রাশেদুর রহমান, ১০৮ পান্থপথের পাভেল এবং সরবরাহ করছে মশিউর আল সোহাগ ও জসিম। ধানমণ্ডির ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটিতেও রাশেদুর, পাভেল সক্রিয়। এ ছাড়া আছে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ঈশা খাঁ এভিনিউর শিবলু, ধানমণ্ডির ২৮ সোবহানবাগের তেহারি ঘরের পাশের আশফাক আহমেদ, উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর রোড ও ৩৪ নম্বর বাড়ির আব্দুল হাইয়ের ছেলে রিপন মিয়া। উত্তরা ইউনিভার্সিটিতেও রিপন মিয়া মাদক বাণিজ্যে জড়িত। সঙ্গে আছে ৬ নম্বর সেক্টরের শিবলু ও দক্ষিণখানের ফরিদ মার্কেটের সবুজ আলীর ছেলে মামুন। এদিকে ধানমণ্ডির ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিকেন্দ্রিক মাদক বাণিজ্যের হোতা ধানমণ্ডি থানার একটি সংগঠনের সভাপতি হাওলাদার সুজাউদ্দিন তুহিন। ধানমণ্ডি ৫ নম্বর এলাকায় ইয়াবার কারবার তার নিয়ন্ত্রণে চলে।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে মাদক কারবারি নেই। বাইরে থেকে অপকর্ম হতে পারে। প্রশাসন থেকে এখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মাদক আগামী প্রজন্মকে শেষ করে দিচ্ছে। প্রশাসন কোনো বিষয়ে সহায়তা চাইলে আমরা অবশ্যই তা করব।’

ভাসানী ও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৩ কারবারি : তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারি টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে—৪৩ জন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশ মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্য। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মিলে অপকর্ম করছে কিছু ছাত্র। গত সপ্তাহেও ক্যাম্পাস এলাকা থেকে কয়েকজন মাদকসেবীকে ধরেছে পুলিশ। জানতে চাইলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কারো কাছ থেকে তালিকা পাইনি। তবে তালিকা বা অভিযোগ পেলে আমরা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’

তালিকায় তৃতীয় সর্বোচ্চ হিসেবে নাম আছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের—৪০ জন। জানতে চাইলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে একজন কর্মকর্তা এসে একটি তালিকা দিয়েছেন। সাত-আটজনের নাম আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, যাদের নাম আছে তারা এখন আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না।’

ক্যাম্পাসেই মিলছে মাদক : তালিকায় ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে ৪২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম ঢুকেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধি আবুল বাশার মিরাজ জানান, ক্যাম্পাসে এখন হাত বাড়ালে মাদকদ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফোন দিলে হলের কক্ষে এসেও বহিরাগতরা গাঁজা, মদ, হেরোইন, ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে। ৯টি হলে প্রায় প্রতি রাতেই বসছে মাদকের আসর। ক্যাম্পাসের পাশে শেষ মোড়, পাগলার বাজার, ব্রহ্মপুত্র নদের পার, কেওয়াটখালী ও ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ঢোকে।

ডিএনসির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, বাকৃবি এলাকায় এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ তালিকাভুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে বাকৃবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আতিকুর রহমান খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের তালিকা দিয়ে এখনো সহায়তা চাওয়া হয়নি। তবে আমরা নিজেরাই মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা বাহিনীকে বলে থাকি।

আরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের বিষ : কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন, জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে ২০ জন, মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে ২৯ জন, মুন্সীগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে ছয়জন, নারায়ণগঞ্জের রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ জন, গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৬ জন, সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন, গণবিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে তিনজন, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটিতে তিনজন, পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটিতে একজন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে দুইজন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে চারজন, চাঁদপুর সরকারি কলেজে ৯ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতজন, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন, রাজশাহী  প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৪ জন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ জন, খুলনার নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও নর্দান ইউনিভার্সিটিতে ছয়জন, যশোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আটজন, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জন এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ আনা হয়েছে গোয়েন্দাদের তালিকায়।


মন্তব্য