kalerkantho


নির্বাচনেই সমাধান খুঁজছে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচনেই সমাধান খুঁজছে বিএনপি

বিএনপিকে আগামী জাতীয় নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা নিয়ে কারাগারে যাওয়ার বিষয়টিকেও তাঁরা সরকারের কৌশলের অংশ বলে মনে করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনের পথেই থাকবে বলে তাঁরা জানান।

দলীয় প্রধান কারাগারে যাওয়ায় বিএনপি এখন বেশ কিছু সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঐক্য বজায় রেখে সঠিকভাবে দল পরিচালনা করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো। দ্বিতীয়ত, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ফল অনুকূলে নেওয়া। তবে কারাগারে যাওয়ার আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংকটকালে দলের সব নেতাকে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়ে গেছেন। দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে দলের নেতাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

জানা যায়, রায়ের দিন বাংলাদেশে বিদেশি কূটনীতিকদের পাশাপাশি বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পথে প্রতিবাদ করার অনুরোধ করা হয়েছিল বিএনপিকে। গত বুধবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, ‘নো হরতাল নো সহিংসতা।’ নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ওই বৈঠক চলাকালে প্রভাবশালী একটি দেশের রাষ্ট্রদূতের বাসায় যান দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য। ফিরে এসে তিনি খালেদা জিয়াকে ‘সহিংসতা’ না করার বিষয়ে কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে পাঠানো বার্তা পৌঁছে দেন। পরে শান্তিপূর্ণ পথে থাকার বিষয়ে বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি বিএনপির মধ্যে সহিংসতা ঘটাতে সক্ষম নেতাদেরও কঠোর বার্তা দেওয়া হয় ওই বৈঠক থেকেই।

কূটনৈতিক অঙ্গনের একই সূত্র থেকে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের কাছেও ইতিবাচক পথে থাকার বার্তা দেওয়া হয়। ফলে খালেদা জিয়া কারাগারে চলে যাওয়ার পর তারেক রহমানও বিএনপি নেতাদের শান্তিপূর্ণ পথে থাকার নির্দেশনা দেন বলে জানা যায়। ফলে দলের ভেতরে ও বাইরে নানা গুঞ্জন সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি পরিহার করে বিএনপি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্য গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে জানান, দলের যে প্রস্তুতি ছিল তাতে রায় ঘোষণার দিন ইচ্ছা করলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটানো যেত। কিন্তু

কৌশলগত কারণেই সে পথে বিএনপি যায়নি। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সহিংসতা কেউ  সমর্থন করে না। দ্বিতীয়ত, বিএনপির লক্ষ্য সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। ফলে নির্বাচন ভণ্ডুল হয় এমন পরিকল্পনা আমরা নিইনি।’

বিকল্প ধারার সভাপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, জনগণের বড় একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে থাকলেও বিএনপি পরিচালনার দুটি কেন্দ্র থাকা দলটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ না নিতে পারলে চ্যালেঞ্জ হতেও পারে, নাও পারে। কারণ এরশাদ কারাবন্দি থাকাকালীন পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। উল্টো তিনি জনগণের সহানুভূতি পেয়েছেন। তবে দল পরিচালনা, নীতি ও সিদ্ধান্তে ভুল করলে সেটি হবে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ।

বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ কী জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপিকে এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে, আর অহিংস পথে থেকে কর্মসূচি পালন করতে হবে। তাঁর মতে, খালেদা জিয়ার রায়ের দিন সহিংসতা না করে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। জনগণ এটি পছন্দ করেছে। এখন এক সপ্তার মধ্যে জামিনে খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন। কিন্তু তাঁর বসে থাকলে চলবে না। পর পর অন্তত পাঁচটি জনসভা করতে পারলে পরিস্থিতি ঘুরে যাবে।

বিএনপির সিনিয়র তিন নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলাপকালে কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ। তাঁদের মতে, দলের কারো মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অসন্তোষ থাকলেও গত ১০ বছরে সরকারের অন্যায়-অত্যাচারে তা দূর হয়ে গেছে। সবাই বুঝতে পেরেছে যে এই সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না থাকলে কারোরই অস্তিত্ব থাকবে না। এ ছাড়া দল ভেঙে নিজ দলেই কর্মীদের রোষানলে পড়তে কেউ রাজি হবেন না বলে মনে করেন তাঁরা। 

যদিও ‘সঠিকভাবে’ দল পরিচালনার মধ্যে বিএনপি শেষ পর্যন্ত অহিংস থাকবে নাকি সহিংস পথে যাবে তা নিয়ে দলটির নেতা ও সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে নানামুখী আলোচনা রয়েছে। কারণ ২০১৪ ও ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দুই দফা আন্দোলন ‘সহিংস’ হওয়ায় দেশের ভেতরে ও বাইরে বিএনপি দুর্নাম কুড়িয়েছে। এবার খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণার দিন দলটি শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের মতে, রায়কে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনা ঘটুক এবং এর দায় বিএনপির ওপর যাক এমনটিই সরকার ওই দিন চেয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়া এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির কঠোর নির্দেশনায় দলের নেতাকর্মীরা সে পথে পা বাড়ায়নি। 

দলীয় সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমানের নির্দেশনায় এখন বিএনপি চলছে। তিনি এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবেলার পথে আছেন। কিন্তু শেষ দিকে কী হবে সে নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর কিছু সমর্থক গোষ্ঠীকে নিয়ে বিএনপির অনেকে টেনশনে আছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, বিএনপি পরিচালনার দুটি কেন্দ্র সরকারে থাকতেও ছিল—একটি সরকার পরিচালনার এবং অন্যটি ‘হাওয়া ভবন’। এখনো একটি কেন্দ্র ঢাকায় এবং অন্যটি লন্ডনে। তখন দুটি কেন্দ্রের দূরত্ব ছিল ছয় কিলোমিটার। এখন দূরত্ব ছয় হাজার মাইল।

তারেক রহমান এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি চলবে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘তারেকের এখন উচিত হবে বলা যে পারিপার্শ্বিক অসুবিধার কারণে এখন আমি দেশে আসতে পারছি না। দল পরিচালনার দায়িত্বটা আমি দলের স্থায়ী কমিটির হাতে দিয়ে দিলাম। এটি বললে একদম মার (রাজনৈতিকভাবে লাভবান) হয়ে যাবে।’

দুর্নীতি মামলায় সাজা হলেও বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কারোরই নেতৃত্বে থাকতে অুসবিধা নেই। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা নিয়ে নানা আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও বিএনপির সব পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, দুর্নীতি মামলায় জামিন নিয়ে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে সরকার শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে এমন আলোচনা ও সন্দেহ বিএনপির পাশাপাশি অন্য দলগুলোর মধ্যেও রয়েছে। যদিও সে পরিস্থিতিতে দলটি কী করবে তা নিয়ে বিএনপিতে এখনো আলোচনা শুরু হয়নি। তবে দলটির বেশির ভাগ নেতা মনে করেন, খালেদা জিয়াকে অযোগ্য ঘোষণা বা বাদ দিয়ে নির্বাচন বিশ্ব সম্প্রদায় সমর্থন করবে না। এ ছাড়া তেমন পরিস্থিতিতে সরকারের মেয়াদের একবারে শেষ ভাগে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। তাই এ নিয়ে আগাম ভাবতে রাজি নয় বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে যাঁরা নির্বাচন করার কথা বলেন, তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের নেতৃত্বেই আমরা নির্বাচনে যাব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর পর থেকে বিএনপিকে ভাঙার তত্ত্ব প্রচার হচ্ছে। কই এ সরকারের আমলে কত নির্বাচন হলো, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে একটি কাকও তাতে অংশ নেয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপির সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। চ্যালেঞ্জ হলো আমরা যাতে নির্বাচনে না যাই এ জন্য নানা উসকানি দেওয়া হচ্ছে, ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে যাবেই।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, বিএনপি সংকটে নেই, সংকটে সরকার পড়েছে। আর সেই সংকট থেকে বিএনপিকে নিয়ে তাদের সারা দিন ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান সংকট হলো বিএনপি যাতে নির্বাচনে না যেতে পারে তার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। এ লক্ষ্যেই তারা খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা দিয়ে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত তারা সফলতা পাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি কিভাবে চলছে এ নিয়ে সরকার এত ব্যস্ত কেন? এর অর্থ হলো তারা আমাদের নিয়ে চিন্তিত। বিএনপি দুর্বল হলে তাদের এত চিন্তা নিশ্চয়ই থাকত না!’


মন্তব্য