kalerkantho


ভাষাশক্তি সূচকে এগিয়ে বাংলাদেশ

আবুল কাশেম ও রফিকুল ইসলাম   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভাষাশক্তি সূচকে এগিয়ে বাংলাদেশ

উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে পাকিস্তান, ভাষাশক্তির বৈশ্বিক সূচকে তারা বাংলাদেশের চেয়ে এখন ১৫ ধাপ পেছনে। ফ্রান্সভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইনসিয়েড’-এর সম্মানিত ফেলো ড. কাই এল চানের তৈরি ‘পাওয়ার ল্যাংগুয়েজ ইনডেক্স-পিএলআই-২০১৬’ এমনই তথ্য দিচ্ছে। মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় এনে সূচকটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৩০তম।

ইংরেজি দক্ষতা সূচকেও বাংলাদেশ ছয় ধাপ এগিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের তুলনায়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘ইএফ ইংলিশ প্রফিসিয়েন্সি ইনডেক্স, ২০১৭’ অনুযায়ী, ইংরেজি মূল ভাষা নয়—এমন ৮০টি দেশের মধ্যে র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬তম, পাকিস্তানের অবস্থান ৫২-তে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এসআইএল ইন্টারন্যাশনালের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি ‘ইথনোলগ’-এর এক প্রতিবেদনেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুর চেয়ে বাংলাকে অনেক শক্তিশালী ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কাই এল চানের ‘পাওয়ার ল্যাংগুয়েজ ইনডেক্স’ তৈরিতে পাঁচটি মৌলিক সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, ব্যবহার করা হয়েছে ২০টি নির্দেশক। পাঁচ মৌলিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, যোগাযোগ, জ্ঞান ও গণমাধ্যম এবং কূটনীতি। বিষয়টি বোঝাতে কাল্পনিক একটি ঘটনা ভাবা হয়েছে। একজন এলিয়েন (ভিন্ন গ্রহের কোনো প্রাণী) পৃথিবীতে এসে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে সে কোন ভাষাটি পছন্দ করবে? পৃথিবীতে সফলভাবে টিকে থাকা ও মানুষের সঙ্গে দক্ষভাবে যোগাযোগ স্থাপনে একটি ভাষা এলিয়েনকে কতটুকু সুবিধা দেবে? সূচকটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য কল্পনা করা হয়েছে। মূল ভাষার পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাষাও অনেককে ব্যবহার করতে হয় বিশেষ প্রয়োজনে। এই বিষয়টির ওপরও একটি ভাষার শক্তি নির্ভর করে।

২০১৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত ভাষাশক্তি সূচকে আনা ১৩৮টি দেশের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত ৫২, নেপাল ৭৫, শ্রীলঙ্কা ৮৪, বাংলাদেশ ১১৫ ও পাকিস্তান ১৩০ নম্বর জায়গা পেয়েছে। অন্যান্য ভাষার তুলনায় কোনো দেশের নিজস্ব ভাষার শক্তির (পিএলআই) সঙ্গে বৈশ্বিক ভাষা হিসেবে ওই দেশে ইংরেজির ব্যবহারের গড় করে ইংরেজি সক্ষমতা সূচক (ইবিআই) করে দেশভিত্তিক ভাষার র্যাংকিং করা হয়েছে। বাংলাদেশের পিএলআই স্কোর দশমিক ৩৮, পাকিস্তানের দশমিক ২৮।

কাই এল চান ভাষা ও দেশের জন্য পৃথক সূচক করেছেন। দেশ হিসেবে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম ও পাকিস্তানের ১৩০তম, তালিকায় বিশ্বের ১১৩টি সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষার তালিকায় উর্দুর অবস্থান ৩০ এবং বাংলা ৩৯ নম্বরে। এখানে উর্দুকে দেখানো হয়েছে মূলত ভারতের ভাষা হিসেবে, এ কারণেই অবস্থান ভালো। অর্থাৎ উর্দুকে ভারতের ভাষা হিসেবে বিবেচনা করে তাকে হিন্দির সঙ্গে মেলানো হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে রাখাই হয়নি। এই সূচকে প্রধান ১০টি ভাষা হচ্ছে ইংরেজি, মান্দারিন, ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ, জার্মান, পর্তুগিজি, হিন্দি ও কেনটোনিস।

এদিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘ইএফ ইংলিশ প্রফিসিয়েন্সি ইনডেক্স, ২০১৭’ অনুযায়ী, পাকিস্তানিদের তুলনায় ইংরেজি বলা ও লেখার ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। যেসব দেশে ইংরেজি মূল ভাষা নয়, এমন ৮০টি দেশের মধ্যে করা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬তম, পাকিস্তানের অবস্থান ৫২-তে। ১০০-এর মধ্যে ৫০.৯৬ পয়েন্ট নিয়ে এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। আর ৪৯.৮৮ পয়েন্ট নিয়ে ১৪ নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ৫৬.১২ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়্যারম্যান ড. সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোন ভাষা কতটা শক্তিশালী, সেটা নির্ধারণে যেসব প্যারামিটার রয়েছে, তার সব ক্ষেত্রেই উর্দুর চেয়ে বাংলা অনেক এগিয়ে ও শক্তিশালী। বাংলা ভাষার সঙ্গে উর্দুর কোনো তুলনাই চলে না।’ তিনি আরো বলেন, একটা ভাষা কতটা শক্তিশালী সেটা নির্ধারণে ভাষিক সংখ্যা, ব্যবহারের বৈচিত্র্য (সাহিত্যচর্চা ও দৈনন্দিন কাজ), ভাষার প্রয়োগ ও নথিবদ্ধতা—এই চারটি পরিমাপক ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে উর্দুর চেয়ে বাংলা এগিয়ে রয়েছে। এমনকি বাংলা ভাষা যেভাবে প্রতিষ্ঠা হয়েছে, উর্দু সেটা লালন করে না।

আন্তর্জাতিক ভাষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান আরো বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে, উর্দু কোথাও সরকারি ভাষা হতেই পারে। তবে এটা কমসংখ্যক লোকের ভাষা। পাকিস্তানেও ভাষাভাষীর সংখ্যা কম। এমনকি ভারতেও কম। সর্বোচ্চ দেড়-দুই কোটি লোকের ভাষা উর্দু। কাজেই ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা ঊর্ধ্বে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও এগিয়ে বাংলা। যেমন—একুশে বইমেলা। এখানে বাংলায় যত বই প্রকাশিত হয়, উর্দুর বেলায় তেমনটি নেই। উর্দু ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে মেলা হলেও সেটা খুব ছোট। সাহিত্যচর্চার দিক থেকেও বাংলার সঙ্গে উর্দু তুলনাযোগ্যই না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলা তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এগোচ্ছে। বাংলা ব্যবহারের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগও আছে। সব মিলিয়ে বাংলার সঙ্গে উর্দুর কোনো তুলনাই চলে না। সব মিলিয়ে উর্দুর তুলনায় বাংলা যে শ্রেষ্ঠ তাই বলা বাহুল্য।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এসআইএল ইন্টারন্যাশনালের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি ‘ইথনোলগ’-এর প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে উইকিপিডিয়ার ২০১৭ সংস্করণে বলা হয়েছে, ভাষাভাষীর বিবেচনায় বিশ্বে বাংলা অষ্টম বৃহত্তম ভাষা। তবে মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলার অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ। ২৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাংলাকে মূল (প্রথম) ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১১ সালের হিসাবে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহার করে এমন মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৯০ লাখ। এই র্যাংকিংয়ে বাংলার অবস্থান ১৩তম।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব জাতি বৈশ্বিক যোগাযোগে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে, ওই সব জাতির মাতৃভাষাও অন্যান্য ভাষার তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। ভাষা শুধু মত প্রকাশের মাধ্যমই নয়, এখন ভাষা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার একটি শক্তিশালী উপাদান। লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্ক কেন বিশ্বের সেরা শহর, টোকিওর চেয়ে হংকং বা সিঙ্গাপুর কেন ইংরেজিতে এগিয়ে—এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রের আটটিই ইংরেজি জানা মানুষদের শহর। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল কমপিটিটিভনেস ইনডেক্স অনুযায়ী, বিশ্বের ১০টি শীর্ষ ধনী দেশের চারটিরই মূল ভাষা ইংরেজি। বাকি ছয়টি দেশের মানুষের বড় অংশই ইংরেজি বলা ও লেখায় দক্ষ। এর মধ্যে শুধু ব্যতিক্রম হলো জাপান, যারা ইংরেজিতে দক্ষতা ছাড়াই উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছেছে।

 


মন্তব্য