kalerkantho


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা

অপরাধীরা বেপরোয়া আইনের সঙ্গে লাগবে অবকাঠামোও

মাসুদ রুমী   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অপরাধীরা বেপরোয়া আইনের সঙ্গে লাগবে অবকাঠামোও

‘এসএসসি ২০১৮ প্রশ্ন লাগলে যোগাযোগ করুন...কাজ হবে ১০০%। নতুন গ্রুপে অ্যাড হন। ফেসবুক বন্ধ থাকবে, তাই হোয়াটস অ্যাপ, ইমোতে প্রশ্ন দিব। এসএসসি কোয়েশ্চেন মাত্র ৩০০ টাকা।’ গতকাল বুধবার দুপুর ১.১২ মিনিটে ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দেওয়া হয় ‘নিলয় নিলয়’ আইডি থেকে। পরিচয় লুকাতে ‘নিলয় নিলয়’ নিজের ছবি ব্যবহার করেননি। তবে স্পর্ধা দেখিয়েছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের। আজ থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়ার আশ্বাসে এভাবে অনেকেই বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে গতকাল পোস্ট দিচ্ছিল। একটি গ্রুপে দেখা গেল ২৫ হাজার ২২০ জন সদস্য। যাঁরা অতিসাবধীন তারা ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলছেন, কেউ কেউ নিজের মোবাইল ফোন নম্বরও দিচ্ছেন। একটি প্রশ্নপত্রের জন্য ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছিল পোস্টে। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদ পাতা নতুন কিছু নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা আইনি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।

চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রিসভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার শাস্তি দিতে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক প্রতারণাসংক্রান্ত ২৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড আরোপ করা হবে। কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার এ অপরাধ করলে শাস্তি হবে সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।’

বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন চক্র কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেললেও আইনি ব্যবস্থার নজির কম। গত বছরও ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়েছিল ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ফেসবুক নজরদারির কথা বলেছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে বিটিআরসির কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে বিটিআরসি। এর অংশ হিসেবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ফেসবুক বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু থেমে নেই ডিজিটাল প্রতারণা। অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও (হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবার, ইমো) প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে আগে থেকেই। ফলে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটির প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করছে বিভিন্ন মহল। তবি সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন করার পাশাপাশি অবকাঠামো প্রস্তুতিরও দরকার আছে।

আগের আইসিটি অ্যাক্টে দায়ের হওয়া মামলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের সাইবার ক্রাইম হেল্প ডেস্কের লিগ্যাল সাপোর্ট অ্যানালিস্ট অ্যাডভোকেট সূচনা ঘটক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবার অপরাধের বেশির ভাগ মামলা রাষ্ট্রীয় নয়, ব্যক্তিগত। আমরা সাইবার অপারাধের আইনি সহায়তা দিই বলে আমাদের কল সেন্টারে প্রতিদিন কম করে হলেও এক শ ফোনকল আসে।’ তিনি বলেন, ভার্চুয়াল জগতে ভুয়া ফেসবুক আইডি, ইউটিউব, পর্ন সাইটে ভিডিও ছেড়ে দেওয়াসহ নানাভাবে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। সূচনা ঘটক জানান, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কম। কারণ এসবে সাক্ষ্য-প্রমাণ দাঁড় করিয়ে ঘটনা প্রমাণ করা খুবই কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে আসামি কে জেনেও ভিকটিম আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে প্রমাণ করতে পারছে না।

সমস্যাটি মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে সূচনা ঘটক বলেন, ‘আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এসব আইন এবং ডিজিটাল অপরাধ সম্পর্কে খুব বেশি অবগত নয়। আমাদের দেশে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ফরেনসিক ডিভাইস নেই এবং এবিষয়ক ল্যাবও গড়ে ওঠেনি। ফলে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) অ্যাড্রেস বের করা যায় না। কেউ কেউ সন্দেহজনকভাবে গ্রেপ্তার হলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ভিকটিমকে আরো হুমকি দিচ্ছে। ফলে ভিকটিম ন্যায়বিচার পাচ্ছে না।’

ইনসাইট বাংলাদেশের সাইবার হেল্প ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯ হাজারের মতো অভিযোগ এসেছিল। এর মধ্যে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। ফেসবুক আইডি হ্যাক, নকল আইডি খুলে অন্যকে হয়রানি, একজনের সঙ্গে অন্যের ছবি জুড়ে দেওয়া (সুপার ইমপোজ), অপপ্রচার চালানো এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার ঘটনাই ঘটছে বেশি। এর পরে রয়েছে পর্নো সাইট কিংবা বিভিন্ন ভিডিওমাধ্যমে গোপন ভিডিও ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা। এ ছাড়া ইউটিউবে মানহানিকর ভিডিও প্রকাশ, ই-মেইল হ্যাকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা বেশি ঘটছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি; কিন্তু এসব অপরাধের মামলা দায়ের করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় জানিয়ে সূচনা ঘটক বলেন, নিকটবর্তী থানায়, কিংবা আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা করা যাবে; কিন্তু আগের আইসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী, অবশ্যই নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অনুমতি নিতে হবে। আইসিটি বিভাগে নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে সব কিছু উপস্থাপন করার পর তারা সন্তুষ্ট হলে তারপর মামলার অনুমোদন মিলবে। মামলা দায়েরের পর বিচারে প্রমাণ করার পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েছে। নতুন আইনেও দেশের ১৬ কোটি মানুষের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কি না তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। সূচনা ঘটক বলেন, ‘একজন ছেলে কিংবা মেয়ের ভিডিওটি প্রকাশ হয়ে গেল তখন তার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়। সেই মানহানির শাস্তি মাত্র তিন বছর। আগের আইনেও এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ছিল না। বর্তমান আইনেও বিস্তারিত কিছু নেই।’

এ সম্পর্কে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে পেনাল কোডের সেকশন ৪৯৯ এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটন করেন, তাহলে তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করেন তাহলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা জরিমান কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

ফাইবার অ্যাট হোম নামের প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির ‘চিফ স্ট্র্যাটেজিক অফিসার (সিএসও) সুমন আহমেদ সাব্বির গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন করে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষতা ও সচেতনতা গড়ে না উঠবে। অসংখ্য নারী ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে, কিন্তু তারা ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। রিজার্ভ চুরির ঘটনা আমরা ঠেকাতে পারিনি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালতের এ বিষয়ে সক্ষমতা কম। সাইবার এভিডেন্সগুলোকে আদালতে প্রমাণ করার যথেষ্ট অবকাঠামো নেই। এ জন্য সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, দক্ষ জনবল তৈরি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালতকে আরো প্রশিক্ষণ দিয়ে এসব জটিল বিষয় ব্যবস্থাপনায় আরো সক্ষম করে তুলতে হবে।’

প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়া ঘেঁটে দেখা যায়, এর অধীনে ‘জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল’ ও ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি’ নামের নতুন দুটি সংস্থা গঠিত হবে। কম্পিউটার, কম্পিউটার ব্যবস্থা বা নেটওয়ার্ক বা মুঠোফোন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংঘটিত ডিজিটাল অপরাধ তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে ওই দুই সংস্থার কাজ। জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির প্রধান হবেন একজন মহাপরিচালক।

পোলারিস ফরেনসিক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ডিজিটাল অপরাধীদের অপরাধকে প্রমাণ করতে যে পরিমাণ সাক্ষ্য দরকার, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ইত্যাদির জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো দরকার। আমরা যতই ভালো আইন করি না কেন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়া সাইবার অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন।’

দেশের আর্থিক খাতে প্রযুক্তিগত অপরাধ বাড়ছে। আর মোবাইলে আর্থিক সেবায় এই প্রবণতা আরো বেশি। রিজার্ভ চুরির রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ই-মেইল আইডি থেকে ভুয়া বার্তা পাঠানো হয়েছিল সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩০ ধারায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অবৈধভাবে ই-ট্রানজেকশন করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। শাস্তি প্রথম দফায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

৩৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে—হ্যাকিংয়ের শাস্তি ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। দ্বিতীয় দফায় এ অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো ধরনের প্রপাগান্ডা চালায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিকৃতি, ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত, গুপ্তচরবৃত্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় ১৪ বছর থেকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজার কথা বলা হয়েছে।

অবশ্য প্রস্তাবিত আইনের ৩২ নম্বর ধারাটি নিয়েই বেশি উদ্বেগ ব্যক্ত করা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অবসর) তারিক আহমেদ সিদ্দিক গতকাল বলেছেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে যে ৩২ ধারার কথা বলা হচ্ছে, তা সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ বা হয়রানির জন্য নয়। এটার অপব্যবহার যাতে না হয় সেটিও দেখা হবে।

 



মন্তব্য