kalerkantho


খালেদার মামলার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি

বিএনপিতে অস্থিরতা

এনাম আবেদীন, আশরাফ-উল-আলম ও শফিক সাফি    

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপিতে অস্থিরতা

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। ৯ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ওই মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান রায়ের দিন ধার্য করেন। খালেদা জিয়া গতকাল আদালতে হাজির ছিলেন। এই মামলায় রায়ের তারিখ নির্ধারণের খবর প্রচার হওয়ায় বিএনপিতে কিছুটা অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। দলের তৃণমূল পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির বাইরেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়ার মামলায় রায় হলে তা দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সে প্রশ্নও উঠছে।

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে দলটির রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। এমনকি সরকারবিরোধী আগাম আন্দোলনেও নামতে পারে দলটি। পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নেও বিএনপি নতুন করে চিন্তা করবে। বিএনপি নেতারা অবশ্য জানিয়েছেন, বিষয়টি বিএনপি আইনগতভাবে মোকাবেলা করবে। পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা অর্থাৎ রাজপথের আন্দোলনও যুক্ত হবে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে, দেশে নির্বাচনের একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার মুহূর্তে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হলে এবং সেটিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলে নির্বাচন পেছনে পড়ে যাবে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনগণের বড় একটি অংশের সন্দেহ যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি প্রকৃত অর্থে রাজনীতি থেকে উদ্ভূত এবং পক্ষপাতদুষ্ট। তবে রায়ে এর প্রভাব না আসা দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং আমরা এমন প্রত্যাশাই করি।’ বিকল্প ধারার সভাপতি বি চৌধুরী আরো বলেন, যদি দেশে এমন একটি বিচার হয় যাতে মানুষ আন্দোলিত হয় প্রতিবাদী হয় তাহলে নিশ্চয়ই নির্বাচনের তুলনায় ওই ঘটনায় আন্দোলনে নতুন মাত্রা তৈরি হবে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এখনই সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার কোনো পরিকল্পনা বিএনপির ছিল না। নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকারের’ প্রস্তাব বা রূপরেখা উত্থাপন করে ধাপে ধাপে আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল দলটির। পাশাপাশি নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতিও বিএনপিতে রয়েছে। দলের বড় একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণাও ছিল যে মামলার গতি বাড়ানোর কারণ হলো বিএনপিকে সরকারের চাপে রাখার কৌশল। কিন্তু রায় ঘোষণার দিন ঠিক হওয়ায় তাদের হিসাব পাল্টে গেছে। ঘটনাকে তারা সরকারের ‘রাজনৈতিক কূটচাল’ অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল বলে মনে করছেন। ফলে আন্দোলন পরিকল্পনা বা রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে বিএনপিকে আগাম ভাবতে হচ্ছে। গত রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সিনিয়র নেতারা এ প্রশ্নে করণীয় নির্ধারণ করতে বৈঠক করেছেন।

সূত্র মতে, মুন্সীগঞ্জে আজ শুক্রবার উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খানের একটি স্মরণসভায় যোগদানের কথা ছিল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। কিন্তু ওই কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। মায়ের কবর জিয়ারত করতে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরে যাওয়ার কর্মসূচি ছিল খালেদা জিয়ার, যা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিস্থিতি কী হবে জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি যে বিএনপিকে সরকার উসকানি দিয়ে রাজপথে নামাতে চাইছে। তা ছাড়া মামলা নিয়ে যা ঘটছে তাতে মনে হয় না সরকার নির্বাচনের পথে হাঁটছে। মনে হয়, তারা অন্য কোনো পরিস্থিতি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চায়।’     

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মনে করি বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হবে না। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার কোনো মেরিট নেই। তথাপি সাজা হলে জনগণ ঘরে বসে থাকবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আইনগতভাবে মোকাবেলার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করব।’

দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সাজা হবে না। খালাস হবে। কারণ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষী নেই তো। একজন সাক্ষীও নেই। ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে একজনও তাঁর বিরুদ্ধে বলেনি।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাজা হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিই করব। তবে দেশ একদলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে, এটুকু বুঝি।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয় দণ্ডবিধির ৪০৯ (অর্থ আত্মসাৎ) অথবা ১০৯ (অপরাধে সহযোগিতা) ধারা এবং দুদক আইনের ৫(২) ধারায়। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় বর্ণিত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর দুদক আইনের ৫(২) ধারায় বর্ণিত অপরাধে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফায় উল্লেখ আছে, ‘কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি (ক) কোন উপযুক্ত আদালত তাঁহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন; (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন; (গ) তিনি কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন এবং (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।’

নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হলে উচ্চ আদালতে তাঁর আপিল করার সুযোগ থাকবে। আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই সাজা কার্যকর হবে না।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গতকাল আদালত রায়ের তারিখ ঘোষণা করায় বিএনপির হাইকমান্ড কিছুটা বিস্মিত হয়েছে। কারণ দলটির হিসাবের বেশ কিছু সময় আগেই ওই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মনে করে বিএনপি। ফলে ওই রায়-পরবর্তী করণীয় নিয়ে দলটি এখন নতুন করে কর্মকৌশল ঠিক করবে। মামলার আইনগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য গত বুধবার রাতে বিএনপির সিনিয়র নেতা ও আইনজীবী নেতাদের বৈঠক হয়েছে। গত রাতেও সিনিয়র নেতাদের বৈঠক হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারির বৈঠকে ওই ইস্যুতে আলোচনা করে কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে পারে দলটি।

ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি লন্ডনে অবস্থানরত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও মামলার বিষয়ে নজর রাখছেন বলে জানা গেছে। একটি সূত্রের দাবি, তারেক রহমানের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলন কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে।

মামলার রায় নিয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি শুরু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সব সাংগঠনিক সম্পাদককে গতকাল কেন্দ্র থেকে বার্তা পাঠিয়ে ওই রায়ের দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। গতকাল ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন জায়গায় দফায় দফায় বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এদিকে সাংগঠনিক সম্পাদকরাও স্থানীয়ভাবে এ প্রশ্নে করণীয় নিয়ে চিন্তা শুরু করেছেন।

রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিনই ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে কোর্টে গেছি। মিথ্যা মামলায় তাঁর সাজা হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। শুধু তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এ সাজানো নাটক। সরকার যদি খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করেই থাকে, তা দেশের জনগণ কখনোই মেনে নেবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আইন ও বিচার বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সরকার ম্যাডামকে সাজা দেওয়ার পথ বেছে নিলে দেশে যে আন্দোলন হবে, তাতে সরকার আর এক দিনও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না।’

খুলনা বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু কালের কণ্ঠকে জানান, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্দেশনা থাকুক আর না থাকুক, খালেদা জিয়ার সাজা হলে আন্দোলন হবে। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হলে সেটি হবে বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি আওয়ামী ষড়যন্ত্র। অবশ্যই আমরা এর শক্ত প্রতিবাদ করব। প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, ‘যদি জোর করে কোনো কিছু ঘটায় সে ক্ষেত্রে তা আমরা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করব।’ তিনি আরো বলেন, আগামী দিনে একটি নির্বাচন করার জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করবেই। প্রশাসন এবং বিচার বিভাগ সব কিছুকেই ব্যবহার করবে। এটা সাধারণ মানুষও বুঝে, আমরাও বুঝি।’ তিনি বলেন, ‘যেখানে আইনের শাসন থাকে না, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকে না, সেখানে আদালতকে সরকারের অনেক ধরনের ফরমায়েশই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে পালন করতে হয়। তবে এই আদালতের বাইরেও তো একটা আদালত আছে, জনগণের আদালত।’

বগুড়া জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক আরাফাতুর রহমান আপেল এবং মৌলভীবাজার ছাত্রদলের আহ্বায়ক জাকির হোসেন উজ্জ্বল বলেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, খালেদা জিয়া মামলায় খালাস পাবেন। ‘অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়ার চেষ্টা’ হলে সারা দেশে লড়াই হবে।

তারেক রহমানও আসামি : এ মামলার রায় ঘোষিত হলে সেটিই হবে দেশের সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি মামলার প্রথম রায়। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এ মামলার আসামি। অর্থ পাচারের এক মামলায় ২০১৬ সালে তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তারেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদকের আরেকটি মামলাও একই আদালতে বিচারাধীন। ওই মামলার বিচারকাজও শেষ হওয়ার পর্যায়ে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানির ধার্য দিনে গতকাল আসামি সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামালের পক্ষে দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি করেন তাঁর আইনজীবী আহসান উল্লাহ। শুনানি শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন।

‘এটি অসার মামলা’ : যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ ঘোষণা করার পর আর কোনো বক্তব্য দেওয়ার রেওয়াজ না থাকলেও খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজাক খান গতকাল বলেন, ‘এটি একটি অসার মামলা। খালেদা জিয়া এই মামলা থেকে খালাস পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’ তিনি দাবি করেন, এটি সাজানো ও হয়রানিমূলক মামলা।

‘ছয় আসামিই সর্বোচ্চ সাজা পাবেন’ : এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, দুদকের বিশেষ পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আমরা অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করেছি। আমাদের বিশ্বাস, ছয় আসামিই সর্বোচ্চ সাজা পাবেন।’ তিনি এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের এবং শাস্তি দাবির পক্ষে বিভিন্ন আইনগত দিক তুলে ধরেন। এর আগেও যুক্তিতর্ক শুনানিকালে সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

গতকাল আদালতে উপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজাক খান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, এ জে মোহাম্মদ আলী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, জিয়াউদ্দিন জিয়া, নুরুজ্জামান তপন প্রমুখ।

সালিমুল হকের আইনজীবী আহাসন উল্লাহ আগে আরেক আসামি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের পক্ষে ছয়টি ধার্য তারিখে শুনানি করেন। গত ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ কার্যদিবস খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন তাঁর আইনজীবীরা। মামলার ছয় আসামির মধ্যে তিনজনের পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি করা হয়। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁদের পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। তারেক রহমান, সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান পলাতক রয়েছেন। মমিনুর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে।

১৯ ডিসেম্বর এই মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের বিশেষ পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল সব আসামির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ করেন। এর আগে খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করতে আট দিনের মতো বক্তব্য দেন আদালতে। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

আসামি কাজী সালিমুল হক কামালের পক্ষে তাঁর আইনজীবী আহসান উল্লাহ গতকাল আদালতে বলেন, এই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। সাজানো এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে বা এই মামলার এজাহার ও চার্জশিটে সাক্ষীরা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। এমনকি জালজালিয়াতি, ঘষামাজার আশ্রয় নিয়ে এই মামলা করা হয়েছে। তিনি আসামি সালিমুল হক কামালের বেকসুর খালাস চান।

এর আগে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করতে গিয়েও তাঁর আইনজীবীরা এই মামলাকে উদ্দেশ্যমূলক, হয়রানিমূলক এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। এই মামলাটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা। খালেদা জিয়া ও তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, কোনো টাকাই আত্মসাৎ করা হয়নি। বরং টাকা ব্যাংকে আরো বেড়েছে। মামলাটি ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন তাঁরা।

দুই কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ : মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করেছিল দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক বাসুদেব রায়।

মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, বিদেশ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে আসা অনুদানের অর্থ এতিমদের পুনর্বাসনে খরচ না করে তা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করেছেন।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারও শেষ হওয়ার পথে : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় আরো একটি মামলা করেছিল দুদক। ওই মামলায় তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়। ওই মামলার অপর আসামিরা হলেন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডাব্লিউটিএর কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য আছে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী জিয়াউদ্দিন জিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলেই রায় ছাড়া বিচারের আর কোনো ধাপ বাকি থাকে না।

আরো মামলা : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা ও গ্যাটকো দুর্নীতির মামলায় ঢাকার তিনটি বিশেষ জজ আদালতে অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির জন্য বিভিন্ন তারিখ ধার্য রয়েছে। এসব মামলা বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়ার করা আবেদন সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হওয়ার পর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছর। অভিযোগ গঠনের পরই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধ ও হরতাল চলাকালে বিভিন্ন নাশকতামূলক কার্যক্রম, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির প্রায় ৩৫টি মামলা রয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে।


মন্তব্য