kalerkantho


স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের তাগিদ কূটনীতিকদের

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের তাগিদ কূটনীতিকদের

ছবিঃ কালের কণ্ঠ

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে স্থায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক’ উপায়ে ফেরার ওপর জোর দিয়েছেন ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গারা যাতে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ ও আস্থা বোধ করে, সে জন্য রাখাইন রাজ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করে তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে গতকাল রবিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তাঁরা এসব কথা বলেন। ব্রিফিংয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

এদিকে গতকাল ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ প্রকাশিত এক হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ছয় লাখ ৮৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে আসছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। মিয়ানমার আগামীকাল মঙ্গলবার প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাইলেও বিষয়টি অনিশ্চিত বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বিকেলে ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসগুলোর রাষ্ট্রদূতদের কাছে প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়ার পর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে রাখাইন রাজ্যে টেকসই উন্নয়ন হওয়া উচিত। প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্রিফিংকে সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন।

প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু করাকে সমর্থন জানিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনাদের (বাংলাদেশকে) প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা করছে তা নিঃসন্দেহে সঠিক।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রত্যাবাসনে সহায়ক হয় এমন উদ্যোগ নিয়ে এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।’

ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক বলেন, স্থায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য এ প্রক্রিয়াটি ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক’ হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জোর দিয়েছেন। তিনি আশ্বাস দেন, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

এদিকে ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই রোহিঙ্গাদের পাঠানো হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরকার জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সঙ্গে একটি চুক্তি করবে। চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি সই হলেই ইউএনএইচসিআর প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।  এতে মিয়ানমার সরকারও নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।’

যাচাই-বাছাই ফরমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি চূড়ান্ত হয়েছে। একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যেসব রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব ঘরবাড়ি তৈরি করে দেবে ভারত, চীন ও জাপান। এ প্রস্তাবেও রাজি হয়েছে মিয়ানমার।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার জন্য প্রস্তাব করেছি। আমরা চাই, মিয়ানমারের প্রতিবেশী পাঁচটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা রাখাইন রাজ্য সফর করুন।’ তিনি বলেন, ‘২৩ ডিসেম্বর থেকে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি চলমান রয়েছে।’

অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, চীন, জাপান, কাতার, ইইউসহ ঢাকায় ৫২টি কূটনৈতিক মিশনের রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনার/প্রতিনিধিরা ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ মোকাবেলায় সমর্থনের জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রত্যাবাসন চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, রাখাইন রাজ্যে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকারীদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর মতো বিভিন্ন বিষয়ে মিয়ানমারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কাল শুরু হচ্ছে না : আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার জানান, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যাচ্ছে না। এখনো প্রত্যাবাসন নিয়ে অনেক কাজই বাকি রয়েছে। নাফ নদের তীরে প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো যেমন কোনো স্থান নির্ধারণ করা যায়নি, তেমনি ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে এখনো একটি তাঁবুও নির্মাণ করা হয়নি। তবে বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ চালানো হচ্ছে দ্রুত। তাই যেকোনো সময় প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু করা হবে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত কাজ সম্পাদনে গঠিত যাচাই-বাছাই কারিগরি (টেকনিক্যাল) কমিটি সূত্রে এসব জানা গেছে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) কোনোভাবেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।’

জাতিসংঘের বিশেষ দূতের কাছে রোহিঙ্গাদের দাবি : মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লি গতকাল রবিবার সকালে কুতুপালং হিন্দু রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আশ্বাস দেন, সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।

এরপর তিনি বালুখালী ১ নম্বর অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে ১৫ জন রোহিঙ্গা আলেমের সঙ্গে একান্তে আলাপ করেন।

জানা গেছে, মৌলভি আব্দুল্লাহ ও মোলভি জুবাইরের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল ইয়াংহি লির কাছে মিয়ানমারে তাঁদের ওপর পৈশাচিক সেনা নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে রাখাইনে হত্যা, গুম-খুন, নির্যাতনের বিচার, কারাবন্দিদের মুক্তি, জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি অন্যতম।



মন্তব্য