kalerkantho


পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য দেড় শ ডলার কমাল ভারত

দেশে দাম কমবে?

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য দেড় শ ডলার কমাল ভারত

ফাইল ছবি

পেঁয়াজ রপ্তানিতে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য বা এমইপি দেড় শ মার্কিন ডলার কমিয়ে প্রতি মেট্রিক টন ৭০০ ডলার নির্ধারণ করেছে ভারত। অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই মাস আগে পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করেছিল সে দেশের সরকার।

বাংলাদেশের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, গত ২০ জানুয়ারি বিকেলে ভারত সরকারের এসংক্রান্ত নির্দেশনা তাঁরা পেয়েছেন। গতকাল রবিবার থেকে এই দর কার্যকর হবে। ভারত নতুন দর নির্ধারণ করায় ওই দেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি অন্তত ১০ টাকা কমবে বলে মনে করছেন এ দেশের ব্যবসায়ীরা। তবে কেউ কেউ বলছেন, দাম বাড়ানো-কমানোর বিষয়টি লোক-দেখানো। অর্থাৎ দাম আসলেই কমবে কি না, সেটা নিয়ে সংশয় থেকে যায় তাঁদের সঙ্গে কথা বলার পর।

সম্প্রতি দেশের বাজারে হু হু করে বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। লাগাম টানতে সরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকলেও বিকল্প দেশ থেকে বিছিন্নভাবে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেন দেশের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সেই আমদানি ছিল নগণ্য। এ ছাড়া এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজও বাজারে আসা শুরু হয়। এর পরও বাজারে সুফল মেলেনি।

এ অবস্থায় গত ২০ জানুয়ারি এক আদেশে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ৭০০ ডলার নির্ধারণ করেছে ভারত সরকার।

একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, দাম বাড়ানো-কমানোর বিষয়টি ‘আইওয়াশ’ বা লোক-দেখানো। ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য বাড়ালেও সেই দরে ভারত থেকে পেঁয়াজ কখনোই কেনেন না দেশের ব্যবসায়ীরা। কাগজে-কলমে নির্ধারিত দর দেখিয়ে কম দামে পেঁয়াজ এনে বাকি টাকা হুন্ডিতে অবৈধভাবে সেই দেশে পাচার করে দেওয়া হয়। নতুন দর নির্ধারিত হলে সেই অবৈধ সুযোগ আবারও পাবেন স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা। এই অলিখিত সুযোগ স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডি (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট, কাস্টমস ও প্রশাসন—সবাই জানে, কিন্তু কেউ পদক্ষেপ নেয় না।

বিষয়টি স্বীকার করে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারক রায়হান ট্রেডার্সের মালিক শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত থেকে এর চেয়ে কম দামে পেঁয়াজ কেনা হয়। কিন্তু ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারিত থাকায় টাকাটা কোনো না কোনোভাবে চলে যাচ্ছে। এ জন্য আমরা কাস্টমসকে প্রস্তাব দিয়েছি, সাময়িক সময়ের জন্য ২০ টনের ট্রাককে ১০ টন হিসেবে ঢুকতে দিলে সরকারের কোনো রাজস্ব অপচয় হবে না। কারণ পেঁয়াজে কোনো শুল্ক কর নেই। দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে এবং বিদেশে চলে যাওয়া টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। ছোট্ট একটা উদ্যোগ নিলে বড় সুফল মিলবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!’

টাকা পাচারের বিষয়ে খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা কোনো মন্তব্য করেননি। তবে খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলছেন, ‘টনপ্রতি ৮৫০ ডলারে ভারত থেকে পেঁয়াজ কিনে দেশের স্থলবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে দাম পড়বে কেজিপ্রতি ৭০ টাকা। সেখানে চট্টগ্রাম কিংবা দেশের বিভিন্ন বাজারে নিতে পরিবহন খরচ হবে আরো অনেক বেশি। কিন্তু ৮৫০ ডলারের সেই পেঁয়াজ এখন খাতুনগঞ্জে বিক্রি হচ্ছে কেজি ৫২ টাকায়।’ তিনি বলছেন, ‘আমরা স্থলবন্দর দিয়ে চট্টগ্রামের কেউ সরাসরি পেঁয়াজ আমদানি করি না। আমদানি করা পেঁঁয়াজ কমিশনে বিক্রি করি। ফলে দাম বাড়ার বিষয় আমাদের (চট্টগ্রামের) ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে না।’

খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত সরকারের রপ্তানি মূল্য কমানোর বিষয়টি এখনো খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানেন না। ফলে স্বাভাবিক হারেই গতকাল পেঁয়াজ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে কেজি ৫২ টাকায়। গত সপ্তাহে এই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল কেজি ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়। নতুন দরে পেঁয়াজ আমদানি হলে দাম কেজিতে ১০ টাকা কমবে।

আমদানিকারক শহীদুল ইসলাম বলছেন, গতকাল ভোমরা স্থলবন্দরে ‘ট্রাক সেলে’ পেঁয়াজ প্রতি কেজি মানভেদে ৪৫ থেকে ৪৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নতুন দরে পেঁয়াজ এলে সেটা ৫ থেকে ১০ টাকা কমবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, খাতুনগঞ্জের বাজারে এখন একচেটিয়া ব্যবসা করছে ভারতীয় পেঁয়াজ। নভেম্বরের মাঝখানে পাকিস্তান ও মিসর থেকে কিছু পেঁয়াজ এলেও সেগুলো ছিল সীমিত পরিমাণে; ফলে সেগুলো বাজারে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। গত মাসে চট্টগ্রামের এক আমদানিকারক চীন থেকে ৮৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করেছেন, যেগুলো বাজারে কেজি ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আবার তুরস্ক থেকে এসেছে ৫৬ টন, সেগুলো কেজি ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

পেঁয়াজের দামে অস্থিরতা থাকায় অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সাহস পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। কারণ জানতে চাইলে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রাশেদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধরেন, সংকটের সময় পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খুললাম। সেগুলো জাহাজে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগবে কমপক্ষে ২০ দিন। এরই মধ্যে দেখা গেল ভারত সরকার পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য প্রত্যাহার করল। তখন তো পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না। এই ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে বসে থাকাই ভালো।’

উল্লেখ্য, নিজেদের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছরের ২১ নভেম্বর এক আদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য ৮৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে ভারত সরকার। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেটা বহাল ছিল। এর আগে ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারিত ছিল না।

এরপর আরেক আদেশে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত একই হার ঠিক রেখে এমইপির সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০ জানুয়ারি প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজ ৭০০ ডলার নির্ধারণ করে নতুন আদেশ দিল ভারত।

জানা গেছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন বলে ধরে নেওয়া হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টন। অর্থাৎ বাকি চার লাখ টনের বেশি ঘাটতি মেটানো হয় আমদানি করে। এই ঘাটতির প্রায় পুরোটাই ভারত থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে।

আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি এমদাদুল হক মিলন জানান, হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি পেঁয়াজ আমদানিকারক হারুন উর রশিদ হারুনও নিশ্চিত করেছেন যে ভারত সরকার পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য দেড় শ ডলার কমিয়েছে। তিনি জানান, গত শনিবার হিলি কাস্টমসে এসংক্রান্ত নির্দেশনা এসেছে।

হারুন উর রশিদ বলছেন, ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য কমিয়ে দেওয়ায় দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে আসবে। গতকাল থেকে নতুন মূল্যে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে শুরু করেছেন।



মন্তব্য