kalerkantho


আখেরি মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনা

আগামী বিশ্ব ইজতেমা শুরু ১১ জানুয়ারি

মো. মাহবুবুল আলম, টঙ্গী (গাজীপুর)   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আখেরি মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনা

দু’হাত তুলে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করছেন এক মুসল্লি। গতকাল টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মোনাজাত ছবি : কালের কণ্ঠ

মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, কল্যাণ ও ঐক্য কামনায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হলো ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব। গভীর ভাবাবেগপূর্ণ পরিবেশে মোনাজাতের সময় মুসল্লিদের কণ্ঠে ছিল ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনি।

টঙ্গীর তুরাগতীরে সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়; শেষ হয় পৌনে ১১টায়। প্রায় ২৭ মিনিটব্যাপী মোনাজাতের প্রথম ১১ মিনিট আরবি ভাষায় এবং পরের ১৬ মিনিট বাংলা ভাষায় মোনাজাত পরিচালনা করেন রাজধানীর কাকরাইল জামে মসজিদের খতিব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ শুরা সদস্য মাওলানা যোবায়ের আহমদ।

চার বছর ধরে ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভি আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করলেও এবার তাবলিগ জামাতের একাংশের বিক্ষোভের মুখে তাঁকে বিশ্ব ইজতেমায় অংশ না নিয়ে প্রথম পর্বের সময়ই দেশে ফিরে যেতে হয়। এবার তাঁর পরিবর্তে দেশের হাফেজ মাওলানা মো. যোবায়ের আহমদ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। ইজতেমা ময়দানে বিদেশি নিবাসের পূর্ব পাশে কাঠ-বাঁশের তৈরি বিশেষ মঞ্চ থেকে এ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। এর আগে সকাল থেকে হেদায়েতি বয়ান করেন দেশের মাওলানা আব্দুল মতিন।

এদিকে আগামী বছর বিশ্ব ইজতেমা শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ জানুয়ারি। তাবলিগের মুরব্বিদের পরামর্শসভায় ওই তারিখ নির্ধারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন ইজতেমার মুরব্বি প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, আগামী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব ১১, ১২ ও ১৩ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা কিছুটা কম থাকায় গতকাল ইজতেমার শেষ পর্বে মাঠে মুসল্লিদের উপস্থিতি উপচে আশপাশের পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে চলে যায়। মোবাইল ফোন, ওয়্যারলেস সেট, রেডিও, টেলিভিশনে আখেরি মোনাজাত সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরো লাখ লাখ মুসল্লি একসঙ্গে হাত তুলেছে আল্লাহর কাছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্নায় বুক ভাসিয়েছে তারা।  রাজধানী ঢাকাসহ ১৭ জেলার কয়েক লাখ মুসল্লি ছাড়াও বিশ্বের ৭৬ দেশের প্রায় চার হাজার তাবলিগ অনুসারী বিদেশি মুসল্লি ইজতেমায় ও আখেরি মোনাজাতে অংশ নেয়। মুসল্লিদের ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে তুরাগতীর এলাকায় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

মোনাজাতের আগে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে ছয় উসুলের পাশাপাশি ঈমান ও আমলের ওপর হেদায়েতি বয়ান করেন মাওলানা আব্দুল মতিন। বয়ানে ইসলামের পথে চলার জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনার কথা তুলে ধরা হয়।

ওই বয়ান শেষে শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত মোনাজাত। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই মোনাজাতে অংশ নিয়েছে।

এদিকে মোনাজাতে অংশ নিতে গতকাল ভোর থেকে টঙ্গী, কালীগঞ্জ, কোনাবাড়ী, সাভার, জয়দেবপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা থেকে ইজতেমা ময়দানের দিকে ছুটতে থাকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। মানুষের ভিড়ে র‌্যাডিসন, কুড়িল ফ্লাইওভার, খিলক্ষেত, উত্তরা, জসিমউদ্দীন, আব্দুল্লাহপুর, জয়দেবপুর চৌরাস্তা, পুবাইল মিরের বাজার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল শিথিল করা হয়। যানবাহন না পেয়ে অনেক মুসল্লি হেঁটেই ইজতেমাস্থলে আসে।

মাঠে জায়গা না পেয়ে অনেক মুসল্লি ইজতেমার আশপাশের সড়কে অবস্থান নেয়। মানুষের এই ঢল আব্দুল্লাহপুর-উত্তরা ছাড়িয়ে যায়। পুরুষের পাশাপাশি রাস্তায় বসে নারীরাও মোনাজাতে অংশ নেয়। মুসল্লিরা আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে গুনাহ মাফ চায় এবং মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করে।

সমাপনী ও হেদায়েতি বয়ান : গতকাল হেদায়েতি বয়ানে মাওলানা আব্দুল মতিন বাংলা ভাষায় ইমান, নামাজ, আমল, তালিম, এলেম, জিকির, দাওয়াতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। কোরআন তিলাওয়াত সর্বোত্তম জিকির বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তা ছাড়া মোনাজাতপূর্ব বয়ানে মাওলানা যোবায়ের আহমদ মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন, ইমানের পরই বড় ফরজ নামাজ। প্রত্যেক মুসলমানের ওপরই নামাজ ফরজ, নামাজকে শিখতে হবে, নামাজ আদায় করতে হবে। আর নামাজের মাধ্যমে আল্লাহকে খুশি করে কবরকে নিরাপদ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, নামাজ এমনভাবে আদায় করতে হবে, যেভাবে নবী করিম (সা.) আদায় করেছেন। নামাজের মধ্যে অলসতা মুনাফেকের স্বভাব। মুনাফেকরা নামাজকে বড় ভারী মনে করে। মুসলমান তো নামাজে অলসতা করতে পারে না। মাওলানা যোবায়ের বলেন, ‘ফরজ নামাজ তো আমরা পড়বই, সঙ্গে সঙ্গে তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য নফল নামাজ আদায় করব।’ একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, যখন মানুষ ফরজ নামাজের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ আদায় করবে তখন বান্দার আল্লাহআলার নৈকট্য হাসিল হয়ে যাবে।

এর আগে গত শনিবার ফজর থেকে এশা পর্যন্ত ইজতেমা মাঠে ঈমান, আমল, আখলাক ও দ্বিনের পথে মেহনতের ওপর বয়ান করেন আলেমরা। দেশ-বিদেশ থেকে আগত মুরব্বিরা তাবলিগের ছয় উসুলের মধ্যে দাওয়াতে দ্বিনের মেহনতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বয়ান করেন। ইজতেমা শেষে আগত এক, দুই, তিন চিল্লার মুসল্লিরা দ্বিনের দাওয়াতি কাজে দেশে-বিদেশে বেরিয়ে যাবে।

মোনাজাতে ভিআইপিদের অংশগ্রহণ : রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বঙ্গভবন থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে গণভবন থেকে মোনাজাতে অংশ নেন বলে জানা গেছে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে গুলশানে তাঁর বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নেন। এ ছাড়া শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে স্থাপিত জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমে বসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান, সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, জেলা পুলিশ সুপার মো. হারুন-অর-রশিদ ও গাজীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক মো. মতিউর রহমান মতি মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।

ফিরতি যাত্রায় বিড়ম্বনা ও যানজট : আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে লাখ লাখ মুসল্লি ফিরতে শুরু করলে সর্বত্র জটের সৃষ্টি হয়। টঙ্গী স্টেশনে ফিরতি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্রেনগুলোতে উঠতে হিমশিম খেতে হয় মুসল্লিদের। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে ও দরজা-জানালায় ঝুলে শত শত মুসল্লিকে ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা গেছে।  ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না। মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে মোনাজাত শেষে আবার তাদের একইভাবে হেঁটেই যেতে হয়েছে। বিকেলে সীমিত আকারে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও দুর্ভোগ ছিলই। দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের রিকশা-ভ্যান, টেম্পো, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিতে দেখা গেছে।

পড়ে ছিল জুতা, পত্রিকা : আখেরি মোনাজাত শেষে ইজতেমা ময়দান থেকে বের হওয়ার সময় হুড়াহুড়িতে অনেক মুসল্লি জুতা-স্যান্ডেল হারিয়েছে। ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের সড়কগুলো ফাঁকা হলে বিপুল পরিমাণ পত্রিকার কাগজ, জুতা-স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

চিকিৎসাসেবা : স্বাস্থ্য বিভাগের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত গাজীপুর সদর উপজেলার সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক জানান, টঙ্গী হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে শনিবার বিকেল ৪টা থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৩৭৭ জন মুসল্লি চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত ৯ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ১১ জনকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের বিভিন্ন ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে আরো কয়েক হাজার মুসল্লি চিকিৎসা নিয়েছে।

পকেটমার-ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার : গত ২০ জানুয়ারি বিকেল থেকে ২১ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত ইজতেমাস্থলের আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেড় শতাধিক পকেটমার-ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টঙ্গী, উত্তরা, তুরাগ থানার পুলিশ, ডিবি পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ এসব অভিযান চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন টঙ্গী মডেল থানার ওসি মো. ফিরোজ তালুকদার।

মোনাজাতে মাইকের ব্যবস্থা : আখেরি মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের উদ্যোগে আব্দুল্লাহপুর ও বিমানবন্দর রোড পর্যন্ত এবং গাজীপুর জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগে চেরাগ আলী, টঙ্গী রেলস্টেশন, স্টেশন রোড ও আশপাশের অলিগলিতে পর্যাপ্ত মাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

অজুর পানি বিক্রি : বিশ্ব ইজতেমাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী গতকাল আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত প্রকাশ্যে অজুর পানি বিক্রি করেছে। প্রতি বদনা অজুর পানি পাঁচ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসল্লিদের কাছ থেকে পরিবহনগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দাওয়াতি কাজে সহস্রাধিক জামাত : ইজতেমা আয়োজক কমিটির শীর্ষ মুরব্বি প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বিদের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম পর্বের মতো দ্বিতীয় পর্বেও আখেরি মোনাজাত শেষে সহস্রাধিক জামাত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। জামাতবদ্ধ হয়ে দ্বিনের দাওয়াতি মেহনতে কাজ করবে তারা। তাদের মধ্যে ৪০ দিন, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর ও আজীবন চিল্লাধারী মুসল্লিরা রয়েছে।

আয়োজক কমিটির সন্তোষ প্রকাশ : দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিদের আসতে এবং ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সরকারের প্রতি ইজতেমা আয়োজক কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে।



মন্তব্য