kalerkantho


ওবায়দুল কাদের বললেন

মারামারি বন্ধ করতে দুজনকেই ফোন করেছি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি    

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মারামারি বন্ধ করতে দুজনকেই ফোন করেছি

ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদের সময় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ পুলিশের এসপি আমাকে যখন ঘটনা জানান তখন দুজনকেই ফোন করে বলেছি অনভিপ্রেত ঘটনা থামাতে। দুই পক্ষকেই ডেকে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখব। মারামারি বন্ধ করতেই ফোন করেছি। বলেছি, এই প্র্যাকটিসটা বন্ধ করতে হবে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল বুধবার সকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় দল। এখানে সমস্যা তো মাঝেমধ্যে হয়। তাঁদের এই সমস্যা সিটি করপোরেশনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশও নষ্ট করেনি, আমাদের বিজয়েও বাধা হয়নি, ভোট ব্যাংকেরও ক্ষতি করেনি। তবে যে ঘটনা ঘটেছে তা অনভিপ্রেত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। দলের অভ্যন্তরীণ কলহ জনসমক্ষে আসা খুবই খারাপ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আমার কথা হয়েছে।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের ঘটনার তদন্ত চলছে। যারা জনসমক্ষে ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পার্টির ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। আর ওখানে অস্ত্রের ব্যবহার বা গোলাগুলি হয়ে থাকলে সে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছি। তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।’

নারায়ণগঞ্জ থমথমে, তদন্ত কমিটি গঠন 

হকার ইস্যুতে মঙ্গলবার ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের পর গতকাল নারায়ণগঞ্জ শহর ছিল থমথমে। সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে আতঙ্ক। এদিকে ঘটনা তদন্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও র‌্যাবের একজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে মঙ্গলবারের ঘটনা নিয়ে গতকাল শামীম ওসমান এমপি ও মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী পৃথক সংবাদ সম্মেলন করেন। আইভী তাঁর ওপর হামলাকে আবারও পরিকল্পিত বলে দাবি করেন। অন্যদিকে শামীম ওসমান জানান, আমৃত্যু তিনি গরিবের পক্ষে থাকবেন। আর সে জন্য শাস্তি পেতে হলে তিনি মাথা পেতে নেবেন।

সদর মডেল থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক জানান, মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর বডিগার্ড তিনটি গুলি ছোড়ায় থানায় একটি জিডি হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার সময় নিয়াজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির লাইসেন্স করা পিস্তল হারিয়ে যাওয়ায় তিনি মামলা দায়ের করেছেন।

এটা আইভী-শামীমের ঝগড়া না : শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতে হকার বসানো ও উচ্ছেদ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে শামীম ওসমান বলেন, ওই ঘটনা শামীম ওসমানের সঙ্গে আইভীর কোনো লড়াই বা ঝগড়ার বিষয় নয়। এটাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল বিকেলে শহরের চাষাঢ়ায় রাইফেল ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি স্থিরচিত্র দেখিয়ে শামীম ওসমান বলেন, মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু সুফিয়ান কোমর থেকে পিস্তল বের করছেন, বিএনপির ক্যাডার সুমন আইভীকে বেষ্টিত করে হকারদের দিকে পিস্তল তাক করে আছেন। মেয়র আইভীর সরকারি দেহরক্ষীও তিন রাউন্ড গুলি ছুড়েছে বলে থানায় জিডিও হয়েছে। এসব ঘটনা অনেক মিডিয়ায় আসেনি।

শামীম ওসমান বলেন, ‘এটা আমার সঙ্গে আইভীর লড়াই না। এটা হকারদের সঙ্গে আইভীর লোকজনদের সংঘর্ষ। দলের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদেরের ফোন পেয়ে আমি সংঘর্ষ থামাতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। আমি যাওয়ার পর সেখানে কোনো ঘটনা ঘটেনি। একটা ইটও পড়েনি।

আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে : আইভী

মেয়র আইভী তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল দুপুরে নাসিক কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান। আইভী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাকে হত্যার জন্যই এই হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনার আগের দিন হকারদের বসানোর ঘোষণা দিয়েছেন শামীম ওসমান। আমার বোন জামাই, ভাই, কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন। আমি মার খেতে প্রস্তুত ছিলাম, কর্মীরা মার খাবে সেটা চাইনি। আমার ধারণা ছিল, ওখানে আমি বসা থাকলে হামলা হবে না, কিন্তু হয়েছে। আমার কর্মীদের টার্গেট করে মারা হয়েছে।’

মেয়র বলেন, ‘সেলিম ওসমান আমাকে চিঠি দিয়েছেন, তাঁকে চিঠির উত্তর দিয়েছি। যেখানে প্রশাসন বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেখানে কেন এমন হামলা? অন্য আসনের এমপি কেন হকার নিয়ে নতুন রাজনীতি শুরু করল। এখানকার এমপি তো সেলিম ওসমান। চাষাঢ়া হকার্স মার্কেট করে দিয়েছি। প্রয়োজনে সেই মার্কেট ১০ তলা করার পরামর্শ দিয়ে শামীম ওসমান আমাকে সহযোগিতা করতে পারত।’

শামীম ওসমান ও আইভীকে শান্ত থাকতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন

নারায়ণগঞ্জের জনপ্রতিনিধি শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াত আইভীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল দুপুরে তিনি দুজনকে মোবাইলে ফোন করে এই আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ (বুধবার) আমি দুজনকেই ফোন করেছি। পার্টির সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের তাঁদের কাছে এই মেসেজটা পৌঁছে দিতে বলেছেন যে তাঁরা (আইভী-শামীম) যেন শান্ত থাকেন। পরস্পরবিরোধী অ্যাকটিভিটিজে যাতে না যান। সেই মেসেজটাই আমি পৌঁছে দিয়েছি।’ মন্ত্রী জানান, আইভী নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র। আর শামীম ওসমান জনপ্রতিনিধি। তাঁরা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন হকারদের বিষয়টি কিভাবে মীমাংসা করবেন। এটাই তাঁদের বলে দিয়েছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়া হকার বসার অনুমতি

নারায়ণগঞ্জ শহরের বিবি রোড (বঙ্গবন্ধু সড়ক) ছাড়া অন্য সড়কগুলোতে হকারদের বসার জন্য মৌখিকভাবে অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ হকাররা।

হকাররা গতকাল দিনভর চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়ে থাকে। রাতে হকার আন্দোলনের নেতা জেলা সিপিবি ও ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি হাফিজুল ইসলাম হকারদের উদ্দেশে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক আমাদেরসহ হকার আন্দোলনের নেতাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়েছে, বিবি রোড ব্যতীত শহরের বাকি সব সড়কে হকাররা বসতে পারবে। বিবি রোডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে দুই দিন পর।’

হকার্স সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলাম আসাদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের দাবি পূরণের চুল পরিমাণ বাকি থাকা পর্যন্ত রাজপথ ছাড়ব না।’

এ সময় বিক্ষুব্ধ হকাররা বলতে থাকে, ‘বিবি রোডে হকার বসতে পারবে না, এটা মানি না। এত আন্দোলনের পরও যদি সেই পুরনো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের বিবি রোড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আমাদের আন্দোলনের কোনো মূল্য রইল না।’



মন্তব্য