kalerkantho


জেপির একক প্রার্থী, আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে ছড়াছড়ি

শিরিনা আফরোজ ও দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর    

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জেপির একক প্রার্থী, আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে ছড়াছড়ি

ভাণ্ডারিয়া, কাউখালী ও ইন্দুরকানী—এ তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-২ আসন। জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রধান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নির্বাচনী এলাকা হওয়ায় নির্বাচনের বেশ আগেভাগেই এ আসনে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে তিনি এ আসনের সংসদ সদস্য হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি এখান থেকে নির্বাচন করবেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

জোটগত নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগকে আবার আসনটি ছেড়ে দিতে হবে এ সংশয়ে রয়েছেন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তবে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা একাধিক। একই অবস্থা সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিতেও।

জাতীয় সংসদের ১২৮ নম্বর নির্বাচনী এলাকায় ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ১০ হাজার ৯৯৭। এর মধ্যে ভাণ্ডারিয়ায় এক লাখ তিন হাজার ৬৪৮ জন, ইন্দুরকানীতে ৫৪ হাজার ২৪৬ জন ও কাউখালীতে ৫৩ হাজার ১০৩ জন ভোটার রয়েছে।

এ আসনে পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি চারবারে মোট ১৭ বছর মন্ত্রিত্ব করছেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বিরুদ্ধেও মামলা হয়। সে কারণে তিনি ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী নেছারাবাদের আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহ আলম সংসদ সদস্য হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে পিরোজপুর-২ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়। নেছারাবাদ উপজেলা বাদ দিয়ে ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালীর সঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলাকে যুক্ত করা হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইসহাক আলী খান পান্না প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন।

জাতীয় পার্টি (জেপি) : দলটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ ছাড়া এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করে তিনি আলোচিত। গত ৩০ বছর ধরে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ায় এ আসনের ভোটারদের মাঝে তাঁর প্রভাব বেশি। তিনি সুখে-দুঃখে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ান বলে ভোটাররা তাঁর প্রতি দুর্বল। তিনি প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার গণসংযোগের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে যান এবং মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নিজ হাতে মানুষকে সহযোগিতা করে থাকেন। আগামী নির্বাচনে তিনি যে অবস্থায় নির্বাচন করুন না কেন তাঁর দুর্গে ফাটল ধরানোর মতো কোনো দলের শক্ত প্রার্থী নেই বলে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মনে করে।

আওয়ামী লীগ : আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে দলটির নেতাদের মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, কারণ এ আসনটি জোটের শরিক জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নির্বাচনী এলাকা। তিনিই জোটের প্রার্থী হতে পারেন বলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করছে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নাই এ আসনে মনোনয়ন পাবেন। এর আগেও তিনি দুবার এ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে জায়গা করে দিতে তাঁকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে হয়। এসব বিবেচনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলে ইসহাক আলী খান পান্নাই দলের মনোনয়ন পাওয়ার শক্ত দাবিদার। তবে কিছুদিন ধরে এলাকায় পোস্টার লাগিয়ে, প্রচারপত্র বিলি করে নির্বাচন করার আগ্রহের বিষয়টি জানান দিচ্ছেন বাংলাদেশ সমবায় লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আমিনুর রহমান সগির জমাদ্দার।

এ ছাড়া আগামী নির্বাচনে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম হাওলাদার, সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান, ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মিরাজুল ইসলাম মনোনয়ন চান বলে জানা গেছে।

আব্দুল হাকিম হাওলাদার ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁকে যে আসনেই মনোনয়ন দেবেন সেখানেই তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী। সেটা পিরোজপুর-১ আসন হোক অথবা পিরোজপুর-২ আসন হোক। তাঁর সমর্থকরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে হাকিম হাওলাদার আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী হতে পারেন।

পিরোজপুর-২ থেকে আলোচনায় রয়েছেন ইসহাক আলী খান পান্না। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই রাজনীতিবিদ স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু। এরপর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা হন তিনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ইসহাক আলী খান পান্না গুরুতর আহত হয়েছিলেন।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মিরাজুল ইসলাম। তিনি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত রয়েছেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভাণ্ডারিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।

আওয়ামী সমবায় লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুর রহমান সগির বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু আইন ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি। তিনি সব সময় পিরোজপুর-২ আসনের তিন উপজেলার সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন। স্কুল-মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে আসছেন। এ ছাড়া তিনি একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

বিএনপি : ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সহসম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল কবির লাবু। তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) সহসভাপতি ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর তিনি বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পান।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের স্থানীয় পর্যায়ে রফিকুল কবির লাবুর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ভাণ্ডারিয়া বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে একাধিক দলীয় বৈঠক করেছেন। পোস্টার লাগিয়ে ও প্রচারপত্র বিতরণ করে প্রচার চালাচ্ছেন।

পিরোজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নূরুজ্জামান বাবুল এ আসন থেকে দলের মনোনয়ন চান বলে জানা গেছে। তিনি দলীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এলাকায় যান এবং সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তিনি ১৯৭৩ সালে ন্যাপের (ভাসানী) টিকিটে ভাণ্ডারিয়া-কাঁঠালিয়া আসন থেকে নির্বাচন করেন। প্রবীণ এ নেতা ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করেছেন। ’৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

কাউখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম আহসান কবির দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ হওয়ায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির (জেপি) দুই সংসদের আমলে দাপটের সঙ্গেই তিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু দলীয় নেতাকর্মীই নয়, অন্যসব দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর রয়েছে সুসম্পর্ক। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় দলের নির্দেশিত কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। জেলা বিএনপিতেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক খুবই ভালো। কাউখালী বিএনপির নেতাকর্মীরাও তাঁর নেতৃত্বে চাঙ্গা রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় তিনি দলের মনোনয়ন পেতে আশাবাদী।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী  নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের ছেলে ভাণ্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে তিনি জানান।

জামায়াত : ভাণ্ডারিয়া-কাউখালীর সঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলা যুক্ত হওয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে বর্তমান ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী ও তাঁর ভাই শামীম সাঈদীর নামও শোনা যাচ্ছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান অনেকটা শক্ত। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইন্দুরকানী উপজেলায় বিএনপি জোটের প্রার্থী সাঈদীপুত্র মাসুদ সাঈদী ২২ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল খালেক গাজী পান ছয় হাজার ভোট।

জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার পাশে থেকেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়েছে।

অন্যান্য : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পিরোজপুর জেলার প্রধান সংগঠক ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খান মো. রুস্তম আলী ১৯৯৬ সালে দলের প্রার্থী হয়ে এ আসনে নির্বাচন করেন। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতা হিসেবে তিনি জোটের মনোনয়ন চাইবে বলে জানা গেছে।



মন্তব্য