kalerkantho


৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ আদালতের

অচলায়তন ভাঙার উচ্ছ্বাস

চাকসু, রাকসু জাকসু, বাকসু নির্বাচন দাবি

রফিকুল ইসলাম    

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অচলায়তন ভাঙার উচ্ছ্বাস

ফাইল ছবি

উচ্চ আদালতের নির্দেশে এবার বুঝি ভাঙতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) অচলায়তন। ২৭ বছরের বেশি সময় ধরে অকার্যকর থাকা ডাকসু সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে এ নির্বাচনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন পড়লে তা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতের এই নির্দেশের পর ক্যাম্পাসে কার্যক্রম থাকা ছাত্রসংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসা বাম ছাত্রসংগঠনগুলো (ছাত্র ইউনিয়ন, ফ্রন্ট ও ফেডারেশন) উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের নির্দেশনার এই খবর আনন্দের বলে জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও। তবে বর্তমানে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারা বিরোধী ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল নির্বাচনে আগ্রহী হলেও সহাবস্থান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। 

প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়েই ছাত্রসংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। একসময় ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের সমান রাজনীতির সুযোগ থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় ক্যাম্পাস দখলে নেয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সহাবস্থান নেই। বাম সংগঠনগুলো সক্রিয় হলেও সংখ্যায় বেশি নয়। সবাইকে একত্র করে নির্বাচন আয়োজন করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচনও বন্ধ দুই দশকের বেশি সময় ধরে। সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন হয় ১৯৮৯-৯০ মেয়াদকালে, জাকসু ১৯৯২ সালে, আর চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ক্ষমতায় এলেও ছাত্রসংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালে একটি রিট আবেদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থী।

আদালত ওই সময় রুল দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ডাকসু নির্বাচন করার ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর  রহমান খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এই আদেশ দেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

আদালত থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক এম বদি-উজ-জামান জানান, ডাকসু নির্বাচনে পদক্ষেপ নিতে ৩১ শিক্ষার্থীর পক্ষে ২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর ও কোষাধ্যক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ দেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই নোটিশের কোনো জবাব না দেওয়ায় ওই বছরের ২১ মার্চ রিট আবেদন করা হয়।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কালের কণ্ঠ, নিউ এজ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে এ রিট আবেদন করা হয়।

এ রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ওই বছরের ৮ এপ্রিল রুল জারি করেন আদালত। রুলে ডাকসু নির্বাচন করার কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং নির্বাচন করার ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। শিক্ষাসচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার ও প্রক্টরকে চার সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাধারণ সম্পাদক মোশতাক হোসাইন ও বর্তমান শিক্ষার্থী জাফরুল হাসান নাদিম আরেকটি রিট করেন। ওই রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে গত বছর ১৯ মার্চ রুল জারি করা হয়। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এ রুলের ওপর একই আদালতে গতকাল শুনানির দিন ধার্য ছিল। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। আগামী রবিবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রসংগঠন সূত্র বলছে, ছাত্রসংসদ নির্বাচনের একটি বাধা হলো নিয়মিত ছাত্রসংক্রান্ত ধারাটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার্থী। তাঁরাই ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। বর্তমান ‘ছাত্রনেতাদের’ বড় অংশই অনিয়মিত ছাত্র। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শেষে কেউ কেউ অন্য কোনো বিভাগে মাস্টার্স কিংবা এমফিলে ভর্তি হয়ে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখেন। কাজেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন হলে বর্তমান নেতারা তাতে অংশ নিতে পারবেন না। আর বিরোধী ছাত্রসংগঠনের শর্ত, নির্বাচন আয়োজন করতে হলে সহাবস্থান ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তাদের অনীহার কারণেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়নি। আর সরকারের ওপর মহলের নির্দেশনা না পেয়ে ‘রাজনৈতিকভাবে’ নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরাও নির্বাচনের পথে অগ্রসর হতে পারেননি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ অনুযায়ী পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধির উপস্থিতির বাধ্যবাধতা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

’৭৩ অধ্যাদেশ লঙ্ঘন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা অধ্যাদেশ-১৯৭৩-এ বলা হয়েছে, সিনেটে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে ছাত্রসংসদের নির্বাচিত পাঁচজন প্রতিনিধি থাকবেন; কিন্তু দীর্ঘ ২৭ বছর ‘একলা চলো’ নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়।

অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম : শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ছাত্রসংসদ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, দেশের নানা ক্রান্তিকালেও নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রনেতারা। ডাকসুর হাত ধরেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। সামাজিক ও মানবিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ডাকসু অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। ছাত্রদের কাছ থেকে অনুদান, চাঁদা নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। এখন এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড নেই ছাত্রদের। ডাকসুর মাধ্যমে তৈরি নেতারাই এখন দেশের নেতৃত্বে; কিন্তু অচল সেই ডাকসুই।

সংস্কৃতিচর্চায় বন্ধ্যত্ব : কেন্দ্রীয় সংসদ সচল থাকাকালে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিদিনই হল সংসদে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান থাকত। প্রতি সপ্তাহে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা হতো। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। কিন্তু এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হলে আর এসব আয়োজন থাকে না। টিএসসিকেন্দ্রিক অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকলেও তাদের ভূমিকা তেমন জোরালো নয়।

উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়িত হয়নি : ১৯৯৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও ছাত্রলীগের আপত্তিতে তা স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে নতুন উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী অন্তত ছয়বার নির্বাচনের উদ্যোগ নেন; কিন্তু ছাত্রলীগ-ছাত্রদল দুই পক্ষই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন; কিন্তু ছাত্রলীগ এর বিরোধিতা করে।

আন্দোলন : তবে ডাকসুসহ সব হল সংসদ নির্বাচন দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে বাম ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন সময় তারা সভা-সমাবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছে। গত নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী ওয়ালিদ আশরাফ ডাকসু নির্বাচন দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থীর কোনো জোরালো আন্দোলন না দেখে তিনি একাই অনশনে বসে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়। ২৫ নভেম্বর থেকে অনশন শুরু করে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত চালিয়ে যান। তবে অতিদ্রুতই ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন আশ্বাসে অনশন ভাঙেন তিনি।

ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া : আদালতের নির্দেশের পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন আমাদের প্রাণের দাবি। দীর্ঘদিন থেকেই আমরা এ দাবি জানিয়ে আসছি। তবে প্রশাসন নানা অজুহাতে এই নির্বাচনের আয়োজন করেনি। উচ্চ আদালত নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা এতে খুশি ও আনন্দিত। অতিদ্রুতই নির্বাচনের আয়োজন করা হোক। আমরা নির্বাচনে অংশ নেব। সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’

ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে স্বাগত জানাই। আমরাও এই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছি। তবে নির্বাচন আয়োজনের পূর্ব শর্ত সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একদলীয় নির্বাচন করলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবার, কাজেই একটি দলকে বিশেষভাবে দেখলে হবে না। সব ছাত্রসংগঠনকে সমান সুযোগ ও সুবিধা দিতে হবে। ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রশাসনে নিয়মনীতির মধ্যে থেকে সেভাবে নির্বাচন আয়োজন করুক, আমরা অংশ নেব। তবে সহাবস্থান ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।’

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী কালের কণ্ঠকে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অতিদ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। আর সব ছাত্রসংগঠনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ফাঁক-ফোকর না খুঁজে নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে হবে। আর প্রশাসন কোনো টালবাহানা করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে।

ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাকসুসহ সব ছাত্রসংসদ নির্বাচন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। উচ্চ আদালত সেই বিষয়ে আদেশ দিয়েছেন। অতিদ্রুতই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক। আর আমাদের একটা দাবি, সবার জন্যই গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সব সংগঠনের জন্য সমান সুযোগ রাখতে হবে।’

ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে অনশনকারী ওয়ালিদ আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালত নির্বাচন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতিদ্রুতই এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন করে, নির্বাচনের তফসিল ও দিন-তারিখ ঘোষণা করা হোক। প্রশাসনের কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা।’

উপাচার্যের বক্তব্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, আমরা এখনো রায়ের কপি পাইনি। কাজেই ডাকসু নির্বাচন বিষয়ে এখন বিশ্লেষণধর্মী কোনো মতামত দেওয়া সম্ভব না। কপি হাতে পেলেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

২৭ বধর ধরে হচ্ছে না চাকসু নির্বাচন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোবারক আজাদ জানান, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ৫২ বছরে চাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ছয়বার। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর গত ২৭ বছর ধরে হচ্ছে না চাকসু নির্বাচন।

চাকসু নির্বাচন সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সদ্য বিলুপ্ত হওয়া কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলমগীর টিপু বলেন, ‘অভিলম্বে চাকসু নির্বাচন চাই। এ নিয়ে প্রশাসনের কোনো টালবাহানা দেখতে চাই না।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্য ফজল হাবিব বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেতে হবে। তাহলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।’

ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ধীষণ চাকমা বলেন, ‘আজকে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম ও নির্বাচন না থাকার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের টেন্ডারবাজি, হল দখলের মতো অরাজকতা ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদের কোনো মতামত ছাড়াই অনৈতিক সিদ্ধান্ত পাস করে ফেলে, যার একমাত্র কারণ হচ্ছে সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি না থাকা।’

চাকসু নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কামরুল হুদা বলেন, ‘এত দিন ধরে চাকসু নির্বাচন না হওয়ার কারণ হলো শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ ও রক্তারক্তি। আমরা ভয়ে থাকি যদি এ পরিস্থিতিতে চাকসু নির্বাচন দেওয়া হয় তাহলে পরিস্থিতি আরো বেগতিক হবে।’ 

রাকসু নির্বাচন হচ্ছে না ২৭ বছর

রাজশাহী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঝুলে আছে ২৭ বছর ধরে। তবে প্রতিবছর শিক্ষার্থী ভর্তির সময় ঠিকই চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম রাকসু (তখনকার নাম ছিল রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন—রাসু) নির্বাচন হয় ১৯৫৬-৫৭ মেয়াদে। এখন পর্যন্ত ১৪ বার রাকসু নির্বাচন হয়েছে। সবশেষ ১৯৮৯-৯০ মেয়াদের জন্য নির্বাচন হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ছাড়া অন্য সব বৈধ ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়ে রাকসু নির্বাচন হোক সেটি আমাদের প্রাণের দাবি।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও দাবির বিষয়ে কথা বলার কোনো জায়গা নেই।’

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায় বলেন, ‘নব্বইয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর কারণ ছিল ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোকে অধিকতর সুবিধা করে দেওয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি তাসবির উল ইসলাম কিঞ্জল বলেন, ‘সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধির অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় মতামত দেওয়া থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘যারা নির্বাচন করবে, সেই ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ফ্রন্ট তৈরি করে নির্বাচনের পরিবেশ করতে না পারলে এ নির্বাচন হবে কিভাবে?’ 

জাকসু নির্বাচন হচ্ছে না ২৬ বছর 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তানজিদ বসুনিয়া জানান, ১৯৯২ সালের পর ২৬ বছর ধরে বন্ধ আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নির্বাচনে হারার আশঙ্কা এবং বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর নিরপেক্ষতার অভিযোগ তুলে অংশগ্রহণে অনীহার কারণে কোনো প্রশাসনই জাকসু নির্বাচনে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করে, এত দিন নির্বাচন না হওয়ার পেছনে ছাত্রসংগঠনগুলোর আধিপত্যই দায়ী।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বছরই প্রথম জাকসু নির্বাচন হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিবছর নির্বাচন হওয়ার বিধান থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছরে জাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৯ বার।  সর্বশেষ ১৯৯২ সালে জাকসু নির্বাচন হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাসুক হেলাল অনিক বলেন, ‘জাকসু না থাকার ফলে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কোনো ফরমাল মাধ্যম থাকছে না। আবাসিক হলগুলোতে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব জাকসু নির্বাচন হওয়া উচিত।’

ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, ‘জাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই ইতিবাচক ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।’

ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা আমাদের জায়গা থেকে সব ধরনের সহায়তা করব। প্রয়োজনে বৈধ ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায়ও বসব।’

ছাত্র ইউনিয়নে সভাপতি ইমরান নাদিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই জাকসু নির্বাচনের জন্য উপাচার্যরা শুধু আশ্বাসই দিয়ে গেছেন, কিন্তু সেই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন হয়নি। আর জাকসু, ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার ফলে এখন জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব নেই।’

বাকসু নির্বাচন হচ্ছে না ১৯ বছর 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আবুল বাশার মিরাজ জানান, ১৯ বছর ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচন হচ্ছে না। প্রায় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন চাইলেও প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ দীর্ঘদিন বাকসু নির্বাচন না হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে প্রতি সেমিস্টারেই। ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ বাকসু নির্বাচন হয়েছিল।

গত বছরের এপ্রিলে সংবাদ সম্মেলন করে বাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। এর আগে মার্চে একই দাবিতে ছাত্র ইউনিয়নও সংবাদ সম্মেলন করে। এ ছাড়া সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা এ দাবিতে প্রায়ই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও দ্রুত বাকসু নির্বাচনের বিষয়ে মত দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবর বলেন, ‘বাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা আন্তরিক। শিক্ষক-শিক্ষার্থী যদি সবাই চায় তবে বাকসু গঠন করতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ তাহলে কবে নাগাদ এটি গঠন হতে পারে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা একসঙ্গে আমাদের কাছে এলে নিয়ম মেনে (নির্বাচনের মাধ্যমে) যেকোনো সময়ই এটি গঠন করা যেতে পারে।’



মন্তব্য