kalerkantho


অকর্মা গর্দভ চামচার মাঝখানে পিংপং ট্রাম্প

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অকর্মা গর্দভ চামচার মাঝখানে পিংপং ট্রাম্প

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? পড়ুন বইটির বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

 

বিলি বুশ টেপ ট্রাম্পের নারী-লোলুপতা সামনে আনল, পরে তা মিইয়েও গেল। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর যখন রাশিয়া ঝড় এলো, অনেকেই বলছিল এ হচ্ছে ‘পুশি-গেট’ কেলেঙ্কারি। উপর্যুপরি ইস্যুতে মিডিয়ার আঘাত এরই মধ্যে হোয়াইট হাউসের গা-সহা হয়ে এলেও নির্বাচনে রুশ ষড়যন্ত্রের তত্ত্বটি স্থায়ী অস্বস্তির কারণ হলো। বাইরে সমালোচনার কেন্দ্রে যদিও ট্রাম্প, ভেতরে সব আঙুল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনের দিকে। ১৩ ফেব্রুয়ারি। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে ২৪ দিন হয়েছে। রাশিয়া ও হোয়াইট হাউসের মাঝখানে সত্যিকারের একটা সুতো হিসেবে পাওয়া গেল এই ফ্লিনকে। তথ্য বেরোল, রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ফ্লিন সত্যিই কথা বলেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনে ফ্লিনের একজনই সমর্থক—প্রেসিডেন্ট নিজে। ফ্লিনকে বরখাস্ত করার পক্ষে যখন অক্টোপাসের চাপে ট্রাম্প ছিলেন অনড়।

প্রেসিডেন্ট অভিযোগের আঙুল তুললেন শুধু অয়্যারটেপ তথা নিরাপত্তাজালের দিকে, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলে। হোয়াইট হাউসের সেই সভায় ট্রাম্প উল্টো ঘোষণা দিলেন, সোমবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে ফ্লিন থাকছেন। লাঞ্চের পর ফের সভা বসল। এবার ফোনকলের আদ্যোপান্তই শুধু বেরোল না, জানা গেল রাশিয়ার দেওয়া অর্থের আরো তথ্য। তবে ফ্লিনের ওপর থেকে ট্রাম্পের আস্থা তখনো যায়নি। বরং মনে হলো, ফ্লিনের শত্রু ট্রাম্পেরও শত্রু। পরে অবশ্য ফ্লিনকে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হয় এবং মনে করা হয়, এই মানুষটিই ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্কের বড় তথ্যভাণ্ডার!

কয়েক সপ্তাহেই মুখ্য কৌশলী স্টিভ ব্যানন বুঝে গেলেন, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস দৃশ্যত এক অদ্ভুত সামরিক ঘাঁটি। সামনে অস্থায়ী বেসামরিক চাকুরের চিল্লাফাল্লা, পেছনে সামরিক নাচন-কুদন! ট্রাম্প টাওয়ারে ছিল না কোনো উঁচু-নিচু কাঠামোও। একটি চরিত্র মাথার ওপরে, সবাই নিচ থেকে তার মনোযোগ কাড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। আবার এই মনোযোগ আদায় হচ্ছিল কাজ দিয়েও নয়; তোষামোদই সব। যে ওভাল অফিস ছিল আমেরিকার ক্ষমতার প্রতীক, ট্রাম্প তাকে নামিয়ে আনলেন নিত্যদিনের এক বিশাল বৈঠকখানায়। অতীতের যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে সাক্ষাতের সুযোগ দিচ্ছেন ট্রাম্প। খামাখাই ভিড় জমাচ্ছে মানুষ ট্রাম্পের চারপাশে। যেন সব সভায়ই সবাইকে থাকতে হবে। ব্যানন কোনায় বসে কাগজে চোখ বোলাচ্ছেন এবং অনুষ্ঠান গোটানোর আগে গিয়ে কিছু একটা বলছেন। এদিকে তাঁকে চোখে চোখে রাখছেন প্রিবাস। কুশনারের একটাই কাজ—কে কে কোথায় আছে, খবরদারি করা। ব্যবস্থাপনা ভালো তো কর্মীদের ইগো সমস্যা কম থাকবে। কিন্তু ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে যেন কিছুই ঘটছিল না। হলে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে হতে হবে। অন্যথায় ট্রাম্প পরে যখন শুনবেন এমন ভাব করবেন যে কিছুই হয়নি। শুধু একবার তাকিয়ে অন্য কিছুতে মনোযোগ দেবেন।

ট্রাম্প মিলিটারি একাডেমির সাবেক ক্যাডেট। তবে হোয়াইট হাউসে তিনি যেন মরিয়া ছিলেন নিজেরই প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করার ব্যক্তিগত অধিকারটি সংরক্ষণ করার চেষ্টায়। এর হয়তো একটি উদ্দেশ্যও ছিল। নিজের প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে অবজ্ঞা করলে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। চিফ অব স্টাফ পদে একজন আছেন, কিন্তু ট্রাম্পকে দেখে মনে হবে তিনি নিজেই নিজের চিফ অব স্টাফ। প্রেস সেক্রেটারির কাজটিও তাঁকেই করতে হবে : প্রেস রিলিজগুলো রিভিউ করা, ফোনে রিপোর্টারদের ডাকা—সব। তাঁর স্বজনদেরও দেখা যাবে অ্যাডহক জেনারেল ম্যানেজারের মতো কাজ করতে। তাহলে প্রিবাস, ব্যানন ও কুশনারের কাজটা কী? একজন আরেকজনের পেছনে লেগে থাকা! আসলে ট্রাম্পই কাউকে ক্ষমতাধর দেখতে চাইছিলেন না। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে নীতিনির্ধারণ একটা বড় সমস্যা, যা ব্যাননের অভিবাসননীতিসহ অনেক কিছুতেই ধরা পড়ছিল। তলা থেকে আইডিয়াগুলো ছুড়ে মারো, ওপর থেকে ট্রাম্প যেটি লুফে নেবেন তাই চূড়ান্ত। ডেপুটি চিফ অব স্টাফ কাটি ওয়ালশের ভাষায়—এ যেন শিশুর খেলনা ধরা!

ট্রাম্প পড়তেন না, এমনকি ক্ষণিকের চোখ বোলানোও না। কেউ কেউ বলতেন, ট্রাম্প একটা সেমিলিটারেট, আধাশিক্ষিত। কারণ ট্রাম্প শুধু তাঁকে নিয়ে লেখা খবর বা আর্টিকেলের হেডলাইনটিই পড়তেন। আর চোখ বোলাতেন নিউ ইয়র্ক পোস্টের ষষ্ঠ পৃষ্ঠায়। কেউ কেউ মজা করতে বলতেন, ট্রাম্প একটা ‘টোটাল টেলিভিশন’, পোস্টলিটারেট তথা উত্তরশিক্ষিত। ট্রাম্প কিছু শুনতেনও না। বলাতেই যত সুখ। আর বিশ্বাস করতেন নিজের দক্ষতায়, সে যত অপ্রাসঙ্গিক হোক।

যত বিপজ্জনই হোক, ট্রাম্পের আনাড়িপনা তাঁর কাছের কিছু মানুষকে সুযোগ করে দিল নিজেদের জন্য ফায়দা হাসিলের। সবাই ট্রাম্পকে দেখছিল এমনভাবে যেন তিনি সাদা পাতা, যেন দোমড়ানো কাগজ। ‘অলরাইট মিলিট্যান্ট’ ব্যাননের একটাই চাওয়া : লাখ লাখ বহিরাগত বেরিয়ে যাক, ওবামার স্বাস্থ্যনীতি ছুড়ে ফেলা হোক; এস্টাবলিশমেন্ট রিপাবলিকান প্রিবাস চাইছেন ট্রাম্প নতুন ধরনের এক রিপাবলিকান হয়ে উঠুন।

ব্যানন, কুশনার, প্রিবাস যখন ব্যক্তিস্বার্থে প্রেসিডেন্টকে ব্যবহার করছেন, তিনজনের মধ্যিখানে কার্যকরভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি মানুষ—ওয়ালশ, ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। ওয়ালশের মতে, ব্যানন চালাচ্ছিলেন ব্যানন হোয়াইট হাউস, কুশনার পরিচালনা করছিলেন মাইকেল ব্লুমবার্গ হোয়াইট হাউস এবং প্রিবাসের হোয়াইট হাউসটি ছিল পল রায়ানের। এ যেন সত্তরের দশকের ভিডিও গেম—একটি কালো ত্রিভুজের ভেতর টুংটাং ঘুরছে একটি সাদা পিংপং বল। বলটি আর কেউ না, খোদ প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের তিন উপদেষ্টা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই অভিবাসননীতি ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এই কোন্দল ছিল কৌশল, আদর্শ ও মর্জির তফাত থেকেও। সম্ভবত আরো একটি জোরালো কারণ ছিল বাস্তবসম্মত কোনো সাংগঠনিক চার্ট বা চেইন অব কমান্ড না থাকা। তিন উপদেষ্টা প্রসঙ্গে ওয়ালশ বলেছেন, এমনও হয়েছে—একজন নির্দেশনা দিয়েছেন তো অন্যজন তা থামিয়ে দিচ্ছেন মাঝপথে। একবার কুশনারেরই নির্দেশনা মেনে ওয়ালশ একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করলেন। দেখে কুশনার প্রশ্ন তোলেন এ নিয়ে। তখন ওয়ালশ বলেন, ‘আপনিই না বললেন সাংবাদিকদের ডাকতে?’ কুশনারের জবাব ছিল : ‘বলেছি বলেই কি সময়মতো ডাকতে হবে?’

সবাই যখন তাদের মতো সব কিছু চাইছে, ট্রাম্প সবিস্ময়ে ভাবতেন তাঁর কেন সব গুণ নেই! ট্রাম্প ভাঙচুর ও বদল চাইছিলেন। তিনি চাইছিলেন, রিপাবলিকান কংগ্রেস বিল দেবে আর তিনি সই করবেন। ঘোড়েল রাজনীতিবিদ ও এলিটরা তাঁকে ভালোবাসবে।

অব্যবস্থাপনার মধ্যেই হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলের খবর নিয়মিত ফাঁস হতে থাকলে ছোট-বড় সবাই সবাইকে সন্দেহ করা শুরু করে। রাতারাতি সবাই লিকার! একদিন কুশনার অভিযোগ তোলেন—তাঁর গুমর ওয়ালশই ফাঁস করেছেন। ওয়ালশ পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারেন এই বলে : ‘তাহলে আমার ফোন রেকর্ড বনাম আপনারটা, আমার ই-মেইল বনাম আপনারটা মিলিয়ে দেখবেন কি?’ তবে বেশির ভাগ ফাঁসের নাটের গুরু, বিশেষ করে রসাত্মক খবরগুলোর, ছিলেন টাম্প নিজে। ফোনে ফোনে মূলত তিনিই কুয়ার জল বিষিয়ে তুলছিলেন। হয়তো ট্রাম্পই ফোনে বন্ধুকে বললেন, প্রিবাস অকর্মার ঢেঁকি, কুশনার একটা চামচা আর স্পাইসার একটা গর্দভ। অন্য প্রান্তে বন্ধুটি বিস্মিতই হতেন তাঁর প্রেসিডেন্ট বন্ধুর অদ্ভুত কাণ্ডে!

যেকোনো প্রশাসনে, বিশেষত ক্লিনটন-আল-গোরের মেয়াদে, ওয়েস্ট উইংয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদটি এক ধরনের স্বাধীন ক্ষমতা উপভোগ করে এসেছে। ট্রাম্পের প্রশাসনে মাইক পেন্স যেন কেউই না, শুধু একজন ‘সিফার’, প্রায় অদৃশ্য এক চরিত্র। স্মিত হাসিতে উপস্থিতি ঘোষণা ছাড়া তিনি কিছুই করেন না; হয় নিজের ক্ষমতা ব্যবহারের কাজটি তিনি এড়িয়ে চলেন, নয়তো তিনি জানেনই না কিভাবে তা করতে হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হিলেন একজন সাবেক সহকর্মীকে নিজেই বলেছেন, ‘শুধু আমি ফিতা কাটি ও শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাগুলো করে দিই।’ তবে ডেপ্রটি চিফ অব স্টাফ ওয়ালশের চোখে এই ঝড়ের মধ্যে একমাত্র ভাইস প্রেসিডেন্টের দপ্তরটিই শান্ত আছে। পেন্স এতটাই শান্তিকামী যে তাঁর ভাষণও শুরু হয় এভাবে : ‘যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড জে ট্রাম্পের তরফে আপনাদের জানাচ্ছি সুস্বাগতম।’ কেউ কেউ বলে থাকেন, যে টালমাটাল অবস্থা, এই পেন্সের ঘাড়েই একদিন প্রেসিডেন্সির দায়িত্বটি বর্তাবে। সে যদি হয়ও, ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেন্স অনেক দশকের মধ্যে দুর্বলতম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেই বিবেচিত হবেন। (৭ ও ৮ অনুচ্ছেদের বাছাই অংশের ভাষান্তর)



মন্তব্য