kalerkantho


ইরাকি তেল দখলের মওকা ফের আসবে!

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইরাকি তেল দখলের মওকা ফের আসবে!

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? আজ পড়ুন তৃতীয় অনুচ্ছেদের বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

 

আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠান মানেই বড় কিছু। মিডিয়া বড় খবর পায়। ক্ষমতায় আসা দলের সামনে অবারিত সুযোগ। অভিষেক আনন্দ বয়ে আনে সারা দেশের জন্যও; কিন্তু শপথ নেওয়ার দিনটি ট্রাম্পের শুরুই হলো মন্দভাবে। হোয়াইট হাউসের সামনের রাস্তা পেরিয়ে ব্লেয়ার হাউস—সরকারি অতিথিদের রাখা হয় এখানে। কিন্তু মেজাজ খিচড়ে আছে ট্রাম্পের—হোটেলে যাচ্ছেতাই গরম, পানির চাপ কম, বিছানাও খারাপ! সময় গড়াচ্ছে, পড়ছে না ট্রাম্পের রাগ। সারা সকাল প্রকাশ্যেই ঝগড়া করলেন স্ত্রীর সঙ্গে; দেখে মনে হচ্ছিল অপমানে মেলানিয়া কান্নায় ভেঙে পড়বেন। ট্রাম্প গায়ে জ্বালা ধরানো শব্দ ব্যবহার করছিলেন, হুকুম দিচ্ছিলেন। এদিকে প্রধান কৌশলী স্টিভ ব্যানন মরিয়া—বিগ বসের মস্তিষ্কে তিনটি বার্তা বা তত্ত্ব ঢোকাতেই হবে : ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি এমন অসাধারণ হবে, অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের পরে যা কেউ দেখেনি; শত্রুরা তো চেনাই—কিছুতেই তাদের বন্ধু বানানোর মতো ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না; সর্বোপরি ট্রাম্পকে ভাবতে হবে তিনি এক যুদ্ধে আছেন।

ট্রাম্পের জন্য ১৬ মিনিটের যে বক্তৃতা ব্যানন লিখে দিলেন এর সঙ্গে ট্রাম্পের সেদিনের বিচ্ছিরি মেজাজটাও যেন মিলে গেল। ‘সবার আগে আমেরিকা! প্রয়োজনে সহিংসতা চলবে!’ ট্রাম্প যখন হতাশার সুরে, নিজের গলফ চেহারাটি দেখিয়ে এ জাতীয় কথা উচ্চারণ করলেন তা আরো বেশি ভয়ের শোনাল। বক্তৃতা সেরে ট্রাম্প নেমে এলেন, তখনো তিনি একটি কথাই বলে যাচ্ছিলেন, ‘এই ভাষণ কেউ ভুলতে পারবে না।’ কিন্তু ডায়াসে উঠে জর্জ ডাব্লিও বুশ ভাষণটি নিয়ে যা বললেন তা ট্রাম্পের বক্তৃতার ঐতিহাসিক পাদটীকা হয়ে থাকবে। বললেন, ‘এক্কেবারেই যা-তা হয়েছে।’

ট্রাম্প মনে করলেন অভিষেক দুর্দান্ত হয়েছে। পরদিন তিনি জনে জনে বলে বেড়াচ্ছিলেন, ‘১০ লাখেরও বেশি ব্যক্তির সমাগম হয়েছিল, রাইট?’ অনেক বন্ধুকে ফোনও করলেন তিনি এবং তাঁদের বেশির ভাগ ‘ইয়েস’ বলে তাঁকে খুশি করলেন। জামাতা কুশনার নিশ্চিত করলেন, সত্যিই অনেক অতিথি ছিল। ট্রাম্পকে হতাশ করার চেষ্টাই করলেন না কনওয়ে। বসের কথায় সায় দিলেন প্রাইবাস। আর ব্যানন একটি জোকস শোনালেন। আসলে ব্যানন চাইছিলেন ট্রাম্প যে বাস্তবতার বিকৃতি ঘটাচ্ছেন তা যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে। তিনি তো জানেন, নিজের মধ্যে ছল, ভনিতা, আবেগ লুকানোর চেষ্টা নেই বলেই ট্রাম্প বেশি বকেন, কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ান, সত্যকে পাশ কাটিয়ে যান।

ট্রাম্পের নীতি নিয়ে দুই ধরনের তত্ত্ব দাঁড়িয়ে গেল। বেশির ভাগ অনুসারী ট্রাম্পকে তাঁর সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মেনে নিয়েছিল। বিরোধীদের বেশির ভাগ ট্রাম্পের মধ্যে ঝুঁকি দেখতে পেল; একই অবস্থান নিল গণমাধ্যম। মিডিয়াগুলো ধরেই নিল এই প্রেসিডেন্সি বেজন্মা, জারজ। উঠেপড়ে লেগে মিডিয়া তাঁকে ধ্বংস করতে চাইল, আহত করতে চাইল, কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সব বিশ্বাসযোগ্যতাও। মিডিয়া এই উপলব্ধিটি করতে ব্যর্থ হলো—ত্রুটির পেছনে যত তথ্য-প্রমাণই থাকুক, এর পরও একজন শেষ হয়ে যায় না।

অনেকেই ট্রাম্পের জামাতা কুশনারকে ফোন করতেন যেন তিনি শ্বশুর ট্রাম্পকে বাগে রাখার চেষ্টা করেন। এই জ্ঞান দেওয়ার জন্য ঘন ঘন ফোন করিয়েদের মধ্যে ছিলেন হ্যানরি কিসিঞ্জারও। রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সমাজ যে বিদ্রোহ করেছিল তার ঘনিষ্ঠ প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন এই কিসিঞ্জার। নতুন প্রশাসনের সামনেও যে দুর্ভাগ্য বা তার চেয়ে বড় বিপদ অপেক্ষা করতে পারে, কিসিঞ্জার ফোন করে জানাতেন। সতর্কতা ফোন আসত ট্রাম্পের কাছেও। এমনকি তাঁর কর্মীরাও বাইরে থেকে ফোন করিয়েছেন। জো স্কারবরফ নামের একজন ট্রাম্পকে ফোন করে বলেন, ‘আপনার কাছের মানুষ কারা? কাদের বিশ্বাস করেন? সে কি কুশনার? প্রেসিডেন্ট, সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আপনি কথা বলে নেবেন, এমন কে আছে?’ ট্রাম্প জবাব দিয়েছিলেন, “আমি যে উত্তরটি দেব, আপনার পছন্দ হবে না। উত্তরটি হচ্ছে, ‘আমি’। আমি শুধু নিজের সঙ্গেই কথা বলি।” রিপাবলিকান দলের একজন জাতীয় স্তরের নেতা কুশনারকে সাবধান করেছিলেন এই বলে, ‘ট্রাম্পকে বলো সে যেন প্রেসের পেছনে না লাগে। রিপাবলিকান দল, কংগ্রেস—তাদের বিরুদ্ধেও যেতে দিও না, সতর্ক করে দাও ইনটেল নিয়েও। যদি ইনটেলের বিরুদ্ধে লাগো তারা এমনভাবে ছেকে ধরবে যে দুই-তিন বছর রাশিয়ার তদন্ত তোমাকে ধাওয়া করবে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু ফাঁস হবে।’

ট্রাম্প বিপজ্জনকভাবেই গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে-পরে দুই সময়ই ট্রাম্প আমেরিকার গোয়েন্দা সমাজকে কটাক্ষ করেছেন। সিআইএ, এফবিআই, এনএসসিসহ ১৭টি এজেন্সির সবাই ট্রাম্পের চোখে ছিল অদক্ষ, অপদার্থ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপর ট্রাম্পের সঙ্গে সিআইএ কর্মকর্তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন কুশনার। সতর্কভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল ভাষণ। ট্রাম্প সব গড়বড় করে দিলেন। এজেন্সির প্রায় ৩০০ কর্মকর্তার সামনে এমন সব উদ্ভট কথা বললেন, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে যা শোনা যায়নি।

“ওয়েস্ট পয়েন্ট (যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক একাডেমি) সম্পর্কে আমি অনেক জানি। শিক্ষাদীক্ষার ওপরও অনেক বিশ্বাস আছে আমার। আমার একজন কাকা এমআইটির অধ্যাপক ছিলেন। জিনিয়াস। আমি যখনই তাঁর কথা বলি, প্রশ্ন করা হয়, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পও কি মেধাবী?’ বলি, হ্যাঁ, আমি ‘স্মার্ট’।” উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মাইক পম্পেও, যাঁকে পরে সিআইএ প্রধান করেন ট্রাম্প। মাইকসহ সবাই যখন এ জাতীয় কথায় হতভম্ব, ট্রাম্প বলে যাচ্ছেন, ‘যখন যুবক ছিলাম, অবশ্য আমি এখনো যুবক, দেশে আমরা সব সময় জিতেছি। বাণিজ্যে জিতেছি। যুদ্ধে জিতেছি। একবার একজন প্রশিক্ষক আমাকে বললেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধে হারেনি। যুদ্ধে জয়ী পক্ষ প্রাপ্ত সব সম্পদের মালিক হয়ে যায়—এই প্রাচীন প্রবাদটি আপনাদের জানা আছে না? আমিও সব সময় বলি, (ইরাকে) যেটুকু তেল পেয়েছ রেখে দাও।’ এই সময় এক সিআইএ কর্মকর্তা বলে ওঠেন, ‘কে রাখবে?’ ট্রাম্প তখনো বলে চলেছেন, ‘আমি ইরাকের ভক্ত ছিলাম না, ইরাক যুদ্ধে আমি যেতেও চাইনি। তবে একটি কথা আপনাদের বলতে চাই, আমরা ইরাকে যুদ্ধে গিয়েছি এবং ভুলভাবে বের হয়ে এসেছি। আমি বরাবরই বলে এসেছি, তেলটা নিজেদের জন্য রেখে দাও। আমরা যদি সে তেল নিজেদের জন্য রেখে দিতাম, আমাদের আইএসের মুখোমুখি হতে হতো না। কারণ মূলত এই তেল বিক্রি করেই আইএস অর্থের তহবিল গড়েছে। ঠিক আছে, (সে তেল দখল করার) আরেকটি সুযোগ আপনারা পাবেন, কিন্তু সত্যিটা আবারও বলতে চাই যে সে তেল (ইরাকে) আমাদের রেখে দেওয়াই উচিত ছিল।’

এটুকু বলে প্রেসিডেন্ট থামেন এবং সন্তুষ্টির মুচকি হাসি দেন। তার পরও আবারও মুখ খোলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি কেন প্রথমেই আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি? কারণ আপনারা জানেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে আমার লড়াই চলছে। সাংবাদিকরা পৃথিবীর সবচেয়ে অসৎ মানুষ। তারা এমনভাবে বলে, যেন গোয়েন্দা সমাজের সঙ্গে আমার বিবাদ চলছে। বাস্তবতা যে ভিন্ন তার প্রমাণ হচ্ছে শপথ গ্রহণের পরই প্রথম ভাষণটি আপনাদের সামনে দিতে আসা। গতকাল অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিলাম। আপনারা দেখেছেন, তিলধারণেরও ঠাঁই ছিল না। অথচ আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই একটি চ্যানেলে দেখি, ফাঁকা মাঠ। যদিও ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ ছিল অনুষ্ঠানে—চ্যানেলটি এমন একটি মাঠ দেখাল, যেখানে আসলে কেউ ছিলই না। তারা বলেছে, ট্রাম্প বেশি মানুষ টানতে পারেননি; আমি বলেছি, তখন বৃষ্টি আসি আসি করছিল। হয়তো বৃষ্টির ভয়ে অনেকে ঘর থেকে বেরোয়নি। তখন ঈশ্বর জমিনে তাকালেন এবং বললেন, তোমার অনুষ্ঠানে আমি বৃষ্টি নামাব না। এরপর ফোঁটা দুয়েক আমারও গায়ে যখন পড়ল, বললাম, যা-ই করো (ঈশ্বর), আমরা অনুষ্ঠান চালিয়ে যাব। তখনই বৃষ্টি থেমে গেল।’ এই সময় ট্রাম্পের একজন নারীকর্মী মুখ ফসকে বলে ফেলেন, ‘বৃষ্টি কিন্তু থামেনি’; বলেই ভয় পেয়ে যান, ট্রাম্প যদি শুনে ফেলেন! কিন্তু ট্রাম্প তখনো বকবক করে যাচ্ছেন, ‘তারপর রোদ উঠেছিল। হ্যাঁ, বৃষ্টিও নেমেছিল, তবে আমরা চলে আসার পর।’



মন্তব্য