kalerkantho


সরকারের অবস্থান বদলের দিকে তাকিয়ে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সরকারের অবস্থান বদলের দিকে তাকিয়ে বিএনপি

‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠনের ঘোষণা এবং এ নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি এখনই আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন দেখছে না। পাশাপাশি দলটি মনে করছে না যে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের এখনকার মতামতই চূড়ান্ত। বিএনপির ধারণা, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের এখনকার কঠোর অবস্থানের পরিবর্তন হবে। আর তেমনটি না হলে সে ক্ষেত্রে সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ ভাগে গিয়ে বিশেষ করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

আবার রাজনৈতিক কর্মকৌশল প্রণয়নের আগে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায় কী হয় সেটিও দেখে নেওয়ার পক্ষপাতী বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, এমনও হতে পারে যে ওই রায়ের পরই বিএনপিকে কঠোর অবস্থানে যেতে হতে পারে। এমনকি সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মতে, জিয়া ট্রাস্টের মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ একদিকে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হলে দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়বে, অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা এতটাই ক্ষুব্ধ হবে যে আন্দোলনের প্রশ্নে তারা আর পিছপা নাও হতে পারে। ওই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের মোড় ঘুরে যেতে পারে।

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সে অনুসারে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে। বস্তুত নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো বিধান সংবিধানে নেই। নেই অন্তর্বর্তীকালীন বা সহায়ক সরকারের বিধানও। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই দায়িত্ব পালন করে যাবে। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ওই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। তবে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হলে তখন দেখা যাবে সংলাপ হবে কি না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেশকে আরেক দফা নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাবে।

সরকারের বর্তমান মনোভাবের সূত্র ধরে নির্বাচনের আগে দেশে আবার খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরাও। গত শনিবার বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য বলেছেন, সরকার ৫ জানুয়ারির মতো একই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। তবে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়নি বলে মত দেন তিনি। বৈঠকে সরকারের কথায় এখনই খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে পরিস্থিতি আরো কয়েক মাস পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন এখনো বেশ কয়েক মাস দূরে আছে। ফলে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা যা বলছেন তার সবই যে চূড়ান্ত এমনটি আমরা এখনই মনে করি না।’ তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্দোলন নিয়ে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। তবে এটি ঠিক যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একই প্রক্রিয়ায় বারবার সম্পন্ন করা সহজ নয়। জনগণ অবশ্যই এ ব্যাপারে সতর্ক আছে।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির আরেক অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সরকারের ওই বক্তব্যের এখনই আমরা খুব গুরুত্ব দিচ্ছি না। কারণ নির্বাচন হতে এখনো অনেক সময় বাকি আছে।’ তিনি বলেন, ‘এত তাড়াহুড়ো করার কী আছে। তা ছাড়া এখনই আন্দোলন করতে গেলে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তারা আবারও মামলা-হামলার সুযোগ পাবে। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে যা করার শেষ সময়ে করতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বিএনপিকে আন্দোলনে নামিয়েই ছাড়বে। এমনি বা খুব সহজে তারা কোনো ছাড় দেবে বলে মনে হয় না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকতে সরকার সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেই সব শেষ হয়ে যায় না। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে জনগণ সতর্ক হবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তত্পর হবে। পাশাপাশি বিএনপিও বসে থাকবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে, গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচনের আগে সংলাপ হতে হবে। এর বিকল্প নেই।

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে শেষ দিন পর্যন্ত কিছু শুনতে চায় না। পরে বাধ্য হলে মেয়াদের শেষের দিকে শোনে। যতক্ষণ ক্ষমতায় থাকে মনে হয় না যে তাকে ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হবে। কিন্তু যখন যায় তখন দেখে যে কিছুই নেই। তাই আওয়ামী লীগ প্রথম থেকে একই কথা বলে যে সংলাপ হবে না। কিন্তু আমরা মনে করি, নির্বাচনের আগে তাদের বোধোদয় হবে।’

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করলেও বিএনপির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ দলটি কৌশলগত কারণেই এখনই আন্দোলনে যাবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের বছরখানেক আগে আন্দোলন করে যৌক্তিক পরিণতি পাওয়াও সম্ভব নয়। তার চেয়ে সরকার কী করে সেটি পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। পাশাপাশি সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় করে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে বিএনপিকে। বিএনপিপন্থী এই বুদ্ধিজীবী আরো বলেন, এখনই আন্দোলনে গেলে প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে হামলা-মামলা করে সরকার বিএনপিকে পর্যুদস্ত করে ফেলবে।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, সরকার শেষ পর্যন্ত হার্ডলাইনে থাকবে। ফলে সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, এ দেশে সংলাপে কোনো সমাধানও অতীতে হয়নি। তা ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে—এটি ধরে নিয়েই সম্ভবত সরকার এবার কোনো প্রস্তাব বা ছাড় দেবে না, যেটি তারা গত নির্বাচনে দিয়েছিল।



মন্তব্য