kalerkantho


জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচন-সরকার হবে সংবিধান অনুযায়ী

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচন-সরকার হবে সংবিধান অনুযায়ী

সংবিধান অনুযায়ী এ বছরের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সে অনুসারে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে। কমিশনে নিবন্ধিত সব দল আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ভাষণের শুরুতেই সরকারের চার বছর পূর্তিতে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো একযোগে এই ভাষণ সম্প্রচার করে। সন্ধ্যা সাড়ে  ৭টায় ভাষণ শুরু হয়ে শেষ হয় ৭টা ৫৭ মিনিটে। ২৭ মিনিটের ভাষণে শেখ হাসিনা সপরিবারে জাতির জনককে হত্যা, পরবর্তী দুঃসময়ে ছোট বোনকে নিয়ে বিদেশে অসহায় জীবনযাপন, দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ, সারা দেশ সফর, এরপর ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের বিষয়ে আলোকপাত করেন। ভাষণে ২০০১ সালে ক্ষমতা হারানো, জঙ্গিবাদের উত্থান ও দমন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ও স্থান পায়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর দুই মেয়াদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্রও উঠে আসে ভাষণে।

প্রধানমন্ত্রী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কোনো কোনো মহল এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে পারে। আপনাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ অশান্তি চায় না। নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলনের নামে জনগণের জানমালের ক্ষতি করবেন—এটা আর এ দেশের জনগণ মেনে নেবে না।

নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ—এ ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশন এরই মধ্যে দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কিছু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমার ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছিলেন, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি আপনাদের মর্যাদা রক্ষা করার। কতটুকু সফল বা ব্যর্থ হয়েছি সে বিচার আপনারাই করবেন।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই তাঁর একমাত্র ব্রত। ‘বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়’ —জাতির পিতার এই উক্তি সর্বদা তাঁর হৃদয়ে অনুরণিত হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছি বলেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি। ৯ বছর একটানা জনসেবার সুযোগ পেয়েছি বলেই বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মন্দা থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। জনগণ এর সুফল ভোগ করছেন। বাংলাদেশ এরই মধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। আমরা দিনবদলের সনদ ঘোষণা দিয়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনাদের জীবনমান সহজ করা এবং উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছি। আপনারা আজ সেসব সেবা পাচ্ছেন।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে ১৩ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আট কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে ব্যান্ডউইডথ বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে জনগণ ২০০ ধরনের সেবা পাচ্ছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৪১.৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি হয়েছে বলেও তথ্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপির আকার এক লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির দাবিও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গত বছর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ লাখ আট হাজার ১৩০ জনের। গত বছর প্রবাসীরা ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণ করা হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৭২.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রামপর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারা দেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ৩০ প্রকার ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়েছে।

২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হবে বলেও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ৮৩ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। আমরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। খাদ্য উৎপাদন চার কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২ বছর।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার ও রায় কার্যকর, বিডিআর হত্যার বিচার প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেন। সরকারি কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কেউ বেকার এবং দরিদ্র থাকবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতির পিতার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য দলিলে স্থান পাওয়ায় বাংলাদেশ সম্মানিত হয়েছে বিশ্বসভায়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা বিশ্ব আজ বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখে। বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বসভায় সম্মানিত। ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘অত্যাচার ও নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশে এসেছে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। তাদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে রিলিফ বিতরণ করা হচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারাই সব ক্ষমতার মালিক। কাজেই লক্ষ্য আপনাদেরই ঠিক করতে হবে—আপনারা কি দেশকে সামনে এগিয়ে যাওয়া দেখতে চান, না বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে চলুক, তা-ই দেখতে চান। একবার ভাবুন তো, মাত্র ১০ বছর আগে দেশের অবস্থানটা কোথায় ছিল? স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। আমরা আর দরিদ্র হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই। এসব যদি আপনাদের চাওয়া হয়, তাহলে আমরা সব সময়ই আপনাদের পাশে আছি। কারণ আমরাই লক্ষ্য স্থির করেছি যে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করব। সেই লক্ষ্য পূরণে আমরা প্রয়োজনীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করে সেগুলো বাস্তবায়নও করে যাচ্ছি। আমরা অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না; তবে অতীতকে ভুলেও যাব না। অতীতের সফলতা-ব্যর্থতার মূল্যায়ন করে, ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা উন্নয়নের যে মহাসড়কে যাত্রা শুরু করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে সব বাধা দূর করার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।’

 



মন্তব্য