kalerkantho


উন্নয়নে এগিয়ে গণতন্ত্রে পিছিয়ে

আবদুল্লাহ আল মামুন ও তৈমুর ফারুক তুষার   

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়নে এগিয়ে গণতন্ত্রে পিছিয়ে

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ঐকমত্যের সরকারের চার বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। বিএনপিকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। এর এক সপ্তাহ পর ১২ জানুয়ারি ঐকমত্যের সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। এই চার বছরে দেশের সার্বিক উন্নয়নে পূর্বঘোষিত লক্ষ্য পূরণে বেশ কিছু সাফল্য দেখাতে পেরেছে সরকার। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের পাল্লাই ভারী বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে। তবে ব্যর্থতাও একেবারে কম নয়। জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের যে ঘোষণা ছিল ইশতেহারে, সেগুলোতে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি সরকার। জঙ্গি দমন ও প্রতিরোধে বড় সাফল্য এলেও বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নিয়ে সুধীসমাজসহ বিরোধী রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে। গুম-অপহরণ জনজীবনে আতঙ্ক হিসেবে দেখা গেলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনের এই বছরের শেষ সময়গুলোতে ভোটারদের মন জয়ে শেয়ার মার্কেট চাঙ্গা করাসহ দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জাতীয় সনদ হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহার ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’-এ ২৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। কৃষি ও খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, শিল্পায়ন, বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।

রাজনৈতিক দল, সুধীসমাজসহ দল-মত-নির্বিশেষে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারার সমালোচনার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ঐকমত্য তো আছেই। মানুষ কি এখন ঐক্যবদ্ধ নেই? আমরা তো সবাইকে নিয়েই চলছি। দেশ থেকে কি কাউকে বহিষ্কার করা হয়েছে? পাঁচ বছর ধরে ভাড়া দিলেন না ড. ইউনূস। তাঁকে কি বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে? আর আপনারা যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছেন সেটি বর্তমান সরকারের অধীনে তো হচ্ছেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি তো অংশ নিচ্ছেই। ফলে ঐকমত্য নিয়ে কারা কী বলছেন, সেটা তাদের ব্যক্তিগত মত। কোনো একটি বিশেষ দল খেলায় অংশ না নিলে টুর্নামেন্ট বাতিল হয়ে যায় না।’

সরকারের সফলতা ব্যর্থতার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের প্রথম দুই বছর আগুন সন্ত্রাস, এরপরে বন্যা এবং সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করে আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যেতে হয়েছে। আর উন্নয়নের কোনো শেষ নেই। শেখ হাসিনার নিপুণ হাতের স্পর্শে আমাদের ইশতেহারের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। কবিগুরু বলেছেন, এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা/এইসব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা। শেখ হাসিনা এই নীতি নিয়েই সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সফলতার সঙ্গে গত চার বছর অতিক্রম করেছি। এ সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কথায় কথায় হরতাল-ধর্মঘট বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ এখন বিশ্বাস করে, সরকার পছন্দ না হলে নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে তাদের পরিবর্তন করা যাবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ প্রত্যেকটি সেক্টরে উন্নতি করেছি।’   

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দাবি করলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশাজীবী সংগঠন, সিভিল সমাজসহ দল-মত-নির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার যে ঘোষণা ছিল আওয়ামী লীগের ইশতেহারে, তার বাস্তবায়নে তেমন কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি সরকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বাড়লেও দুর্নীতি প্রতিরোধে আশানুরূপ সাফল্য আসেনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের ক্ষমতায়ন ও অধিকতর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের যে ঘোষণা ছিল তাও বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা দেখা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশে স্থিতিশীল পরিবেশের দাবি করা হয়েছে। তবে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, দমন-পীড়নের কারণে মানুষ ভয়ে মুখ খুলছে না, রাস্তায় নামছে না।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণের কথা বলা হয়েছিল। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নতুন তত্ত্ব বের করল, তা হলো গণতন্ত্র বনাম উন্নয়ন। অর্থাৎ উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। আমরা গণতন্ত্রের দিক থেকে পিছিয়েছি। উন্নয়নের দিক থেকে এগিয়েছি। সুশাসনের দিক থেকেও পিছিয়েছি। আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণের ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি। উন্নয়নের কথা বলতে গেলে যেসব শর্তে ঋণ নিয়ে উন্নয়ন হয়েছে, সেসব শর্ত আমাদের জন্য কতটা অনুকূল সেটা একটা প্রশ্ন। প্রকল্পগুলো কতটুকু সুফল বয়ে আনবে? এগুলো আমাদের জন্য গলার কাঁটায় পরিণত হতে পারে কি না, তাও দেখতে হবে।’

কৃষি, খাদ্য, ভূমি ও পল্লী উন্নয়ন : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের ঘোষণা অনুযায়ী খাদ্যশস্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। চার বছর আগে যেখানে খাদ্য উৎপাদন ছিল তিন কোটি মেট্রিক টনের কাছাকাছি, সেখানে বর্তমানে বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রায় চার কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের (চাল, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে তিন কোটি ৮৬ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশ মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ চাল উৎপাদনকারী দেশ।

কৃষকদের নানা সহায়তা দিয়েছে সরকার। কৃষি সহায়তা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে দুই কোটি পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ২০৮টি কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গত অর্থবছরে ১৮ লাখ ৪৭ হাজার নারী কৃষক ও উদ্যোক্তার মধ্যে ছয় হাজার ২৪০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। বর্গাচাষিদের জন্য কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে বিনা জামানতে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাছ ও মাছজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

ইশতেহারে ঘোষণা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপিত হয়েছে। গাইবান্ধা, গোপালগঞ্জ, নেত্রকোনা, ডুমুরিয়া এবং নাছিরনগরে ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নির্মাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ : ইশতেহারে ঘোষিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সম্পর্কিত বেশির ভাগ লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে। দরিদ্র মানুষকে বিনা মূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে গড় আয়ু ৭২ বছরে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও এরই মধ্যে তা অর্জিত হয়েছে। ৬৪টি জেলা হাসপাতাল ও ৪২১টি উপজেলা হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগী শহরের হাসপাতালে না এসেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে পারছে। বর্তমানে ৪৩টি হাসপাতাল ও ৩০টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে স্কাইপির মাধ্যমে টেলিমেডিসিন-সেবা দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পায়ন : ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে শিল্পায়নের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা ছিল আওয়ামী লীগের ইশতেহারে। এই চার বছরে সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে ৭৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। বাজেটে নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নারী শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক শিল্পনগরীতে ১০ শতাংশ প্লট বাধ্যতামূলক সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকায় বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি : ইশতেহারে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সহজলভ্য ও ব্যাপক করা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ৪৫ লাখ সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানো হয়েছে। ইশতেহারে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। গত চার বছরে এরই মধ্যেই দেশের ৮৩ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। ঘোষণা অনুযায়ী রামপাল ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজও এগিয়ে চলছে।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ : ২০২১ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্র্যের অনুপাত ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বার্ষিক দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১.৭ এর ওপরে নিয়ে যেতে পেরেছে সরকার।

আশ্রয়ণ, গৃহায়ণ, আদর্শগ্রাম, গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি চালু রেখেছে সরকার। গত বছর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অধীনে সরকার ১৪৫টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এই খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সরকার ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করেছে।

সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণ : নির্বাচনী ইশতেহারে লক্ষ্য ও ঘোষণায় প্রথম দফাতে সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। দফাটির বিভিন্ন উপদফায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দূর করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা; সংবিধান সুরক্ষা, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা এবং সংসদকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা; সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সিভিল সমাজসহ দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংহত করা, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ঘোষণা ছিল আওয়ামী লীগের।

এসব ঘোষণার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সরকার প্রথম বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা কাটাতে পারলেও সব দলকে নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। চার বছর আগের এবং এখনকার রাজনৈতিক বিভাজন একই রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতেও সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের কাছে অধিকতর ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণের ঘোষণাও বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য ও সামষ্টিক অর্থনীতি : ইশতেহারের দ্বিতীয় দফায় জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, তাদের আয়-রোজগার বৃদ্ধি, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও আয়-রোজগার বৃদ্ধিতে খানিকটা সফলতা এলেও খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ে প্রায় পুরোটা সময়ই সরকারের সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে গত এক বছরে দ্রব্যমূল্য নিয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

যোগাযোগ : ইশতেহারে সড়ক, রেলওয়ে, বিমান ও নৌপরিবহন তথা যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। সড়কপথ উন্নয়নে সরকার সফলতার সঙ্গে তাদের লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কাজের উদ্বোধন হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন রাস্তা নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে ঘোষণা অনুযায়ী দ্বিতীয় যমুনা সেতু ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

শেষ এক বছরের পরিকল্পনায় যা আছে : ভোটার টানতে নির্বাচনের আগে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শেয়ার মার্কেট চাঙ্গা করার পরিকল্পনা করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও নিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মধ্যে রয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে গত ৯ বছরে মাত্র এক দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। সামনে বাজেটে এ খাতে অর্থ বরাদ্দ রেখে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আর এক দফা এমপিও প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সাম্প্রতিক সময়ে চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চাপের মধ্যে পড়েছে সরকার। তাই নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি রোধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের সমর্থন আদায়ে তাদের পেনশন সুবিধা বৃদ্ধি, মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক মানুষসহ বর্তমানে বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষককে খুশি করতে চায় সরকার। এ খাতে এ বছর বাজেটে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিয়ে সারসহ কৃষি পণ্যের মূল্য হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারের অগ্রাধিকারের ১০ প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু, এই সেতুতে রেল সংযোগ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং রাজধানীর মেট্রো রেল প্রকল্পের নির্মাণ দৃশ্যমান করতে চায় সরকার, যা নিয়ে নির্বাচনের মাঠে দৃঢ়কণ্ঠে উন্নয়নের কথা বলতে পারে সরকার। এর বাইরে পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন প্রকল্পটিও দ্রুত বাস্তবায়ন তরান্বিত করা সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকারের বাকি প্রকল্পগুলো হচ্ছে বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ীর এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা সুপার ক্রিটিকাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন।



মন্তব্য