kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধারা সংবর্ধিত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধারা সংবর্ধিত

বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করল কালের কণ্ঠ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্ভীক যোদ্ধা কম্পানি কমান্ডার মো. চান মিয়া। তাঁর কম্পানিতে যুদ্ধ করেন ভারতীয় ও স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২১০ জন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি কমপক্ষে ২৬টি সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন, অসম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেসব সম্মুখযুদ্ধে ৩৩ জন পাকিস্তানি সেনা ও ৫৭ জন রাজাকার নিহত এবং ৩৫টি রাইফেল উদ্ধার হয়।

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ঝালপাজা গ্রামে তাঁর বাড়ি। গতকাল বুধবার তিনি এসেছিলেন রাজধানীতে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় কালের কণ্ঠ’র সম্মাননা নিতে। সম্মাননা পেয়ে তিনি আনন্দিত, অভিভূত। অনুভূতি প্রকাশ করে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি। এতেই আমার শান্তি, তৃপ্তি। সম্মাননা পেয়েছি আগেও। কিন্তু কালের কণ্ঠ যে সম্মাননা দিল, তার কথা চিরদিন মনে রাখব।’ 

সম্মাননা হাতে নিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন কম্পানি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মো. গিয়াস উদ্দিন। তাঁর নেতৃত্বে এক দল মুক্তিযোদ্ধা শেরপুর থানা আক্রমণ করে তছনছ করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের ঘাঁটি। এ ছাড়া বেশ কিছু সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। শেরপুরের নকলা থেকে গতকাল তিনি ঢাকায় এসেছিলেন সম্মাননা গ্রহণ করতে। অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি, বিজয় ছিনিয়ে এনেছি—এক জীবনে আর কী চাই! মানুষের কাছে অনেক সম্মান পেয়েছি। কালের কণ্ঠ’র কাছে যে সম্মান পেলাম, আমাকে তা গর্বিত করেছে; মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মতোই রোমাঞ্চিত করেছে।’

বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় গতকাল ১০ জানুয়ারি উদ্‌যাপন করা হয় কালের কণ্ঠ’র অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার গুলনকশা হলে এ উপলক্ষে দিনভর চলে হৃদয়গ্রাহী ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা; আনাগোনা হয় দেশের গুণী ও বিশিষ্টজনদের। উৎসব-অনুষ্ঠানের একটি পর্বে আয়োজন ছিল ‘মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা’। এতে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা জানায় কালের কণ্ঠ। উৎসবস্থল সাজানো হয়েছিল ১৫ মুক্তিযোদ্ধার ছবি দিয়ে। বিলবোর্ড ও ব্যানারে শোভা পাচ্ছিল তাঁদের ছবি।  

২০১৭ সালের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে যে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধার সংগ্রাম ও বীরত্বের কাহিনি ছাপা হয় কালের কণ্ঠে, তাঁদেরকেই গতকাল পত্রিকাটির জন্মদিনে উত্তরীয় পরিয়ে, ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকা করে হাতে দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা হলেন পিরোজপুরের হাবিবুর রহমান শিকদার ও আবুল হাশেম হাওলাদার, ময়মনসিংহের আবুল হোসেন মোল্লা ও মো. চান মিয়া, গাজীপুরের মো. হাতেম আলী, নীলফামারীর আলতাফ হোসেন, কুড়িগ্রামের আব্দুল কাদের, খুলনার শেখ ইলিয়াস, দিনাজপুরের মো. জসিম উদ্দিন, শেরপুরের গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রামের মোস্তফা কামাল পাশা, মেহেরপুরের সিরাজ উদ্দীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতিলাল বণিক, সুনামগঞ্জের সুশান্ত রঞ্জন ও ফরিদপুরের হেমায়েতউদ্দিন তালুকদার।

সম্মাননা পেয়ে অভিভূত মুক্তিযোদ্ধারা। অভিভূত অভ্যাগত অতিথিরাও। অনুভূতি জানাতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেন সম্মাননাপ্রাপ্তরা। মেহেরপুরের মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দীন বলেন, ‘দেশের জন্য আমরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছি, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি, তার স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দিত, অভিভূত। কালের কণ্ঠ যে সম্মান দিল, তা পাব কখনো ভাবিনি। এ পত্রিকার প্রতি আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম ও কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল।

কালের কণ্ঠ’র অগ্রযাত্রার প্রশংসা করে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, অনেক সরকার সমালোচনায় মনঃক্ষুণ্ন হয়; কিন্তু আমরা তাদের দলে নই। চোখ দিয়ে দেখি, কান খুলে শুনি। ভুল, ত্রুটিবিচ্যুতি গণমাধ্যমে উঠে এলে আমরা তা শুধরে নিই। এই সরকারের আমলে ৭০০ নতুন পত্রিকার সঙ্গে বেশ কিছু টেলিভিশন চ্যানেল অনুমোদন পেয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, বিকশিত গণমাধ্যমের হাত ধরে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

সাংবাদিকদের তথ্য পরিবারের সদস্য হিসেবে অভিহিত করে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘বন্দুকের নলের মুখে সেনা সরকারের আমলেও সত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন অনেক সাংবাদিক। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আদর্শ হিসেবে কাজ করছেন তাঁরা। বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং যেন সাংবাদিকদের হাত ধরে হয়, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশে চলছে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের শক্তির লড়াই। কালের কণ্ঠ প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে আমাদের আদর্শ স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই। এখনো স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর যেন স্বাধীনতাবিরোধীপক্ষের গাড়িতে জাতীয় পতাকা না ওড়ে সে জন্য আমাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে কাজ করে যেতে হবে।’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধই ছিল আমাদের সুসময় এবং চরম দুঃসময়ও। ওই একবারই আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম, কিছু রাজাকার ছাড়া। আর তখনই ৩০ লাখ স্বজন হারিয়েছি আমরা। ওই সময় পাকিস্তানিরা যে নির্যাতন চালিয়েছে তার ইতিহাস পৃথিবীতে আর নেই। সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে কালের কণ্ঠ।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম পত্রিকা কালের কণ্ঠ। শুরু থেকেই পত্রিকাটি পাঠকের হৃদয় জয় করে চলেছে। ইস্ট ওয়েস্ট গ্রুপের প্রতিটি গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য সত্য তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। তথ্য-প্রযুক্তি বিকাশের কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনের যুগে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রিন্ট মিডিয়া। এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে কালের কণ্ঠ।’

কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল সঞ্চালনা করেন এ পর্ব। সবাইকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় কাজ করছে কালের কণ্ঠ। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন শুধু নয়, শুরু থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছে পত্রিকাটি। জনপ্রিয় দৈনিক হিসেবে কালের কণ্ঠ অর্জন করেছে পাঠকের ভালোবাসা।’

এর আগে অনুষ্ঠানে সূচনা সংগীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী। এরপর সম্মাননা প্রদান শেষে জমকালো সংগীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনভর এ আয়োজন। অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত করে তোলে জনপ্রিয় শিল্পী সালমার সুরেলা কণ্ঠ।

তাঁরা এসেছিলেন ভালোবাসা জানাতে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাতে ফুল আর হৃদয়ভরা ভালোবাসা নিয়ে কালের কণ্ঠ’র অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, মডেল-তারকা, র‌্যাব-পুলিশ বাহিনীর সদস্য, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, হকার্স সমিতির নেতাকর্মী—কেউ বাদ যাননি এই আনন্দযজ্ঞে শামিল হওয়া থেকে। বিশ্ব ইজতেমার বিবদমান দুটি গ্রুপের উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকায় বেশ কয়েকজন আমন্ত্রিত অতিথি অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হতে না পেরে টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

কালের কণ্ঠ’র অষ্টম বর্ষপূর্তি ও নবম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে গতকাল বুধবার সকাল থেকেই আসতে শুরু করেন আমন্ত্রিত-স্বতঃপ্রণোদিত অতিথিরা। দরজায় দাঁড়িয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ও নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল।

হালকা নাশতা, ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়, মধ্যাহ্নভোজ, সেরা কর্মীদের পুরস্কৃত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ সম্মাননা, মাঝে মাঝে শিল্পী ফাহমিদা নবী ও সালমার গান—বিপুল উৎসাহ-উৎসব-উদ্দীপনার মধ্যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে আসতে দেখে ইমদাদুল হক মিলন এগিয়ে গেলেন। বললেন, ‘মতিয়া আপা, আপনার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বোধ হয়। বসেন, বসেন।’ বিদায় নেওয়ার আগে একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন মতিয়া চৌধুরী, ‘কালের কণ্ঠর জন্য ভালোবাসা।’

[বাকি অংশ আগামীকাল]



মন্তব্য