kalerkantho


বিশেষ লেখা

চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ

ইমদাদুল হক মিলন

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ

এক ঐতিহাসিক দিনে যাত্রা শুরু করেছিল আমাদের প্রিয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’। ১০ জানুয়ারি ২০১০। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের এই দিনে তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন বাংলার মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দিনটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দিনটির কথা অতি শ্রদ্ধায় স্মরণে রেখে কালের কণ্ঠ শুরু করেছিল তার যাত্রা। দেখতে দেখতে আট আটটি বছর পেরিয়ে এলাম আমরা। কালের কণ্ঠ পূর্ণ করল তার আট বছর বয়স। শুরু হলো নবম বর্ষের যাত্রা।

এই শুভক্ষণে আমাদের অগণিত পাঠক-শুভানুধ্যায়ী প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা জানাই। যাত্রা শুরুর মুহূর্ত থেকে আমাদের পাশে থেকে তাঁরা আমাদের গভীর ঋণে আবদ্ধ করেছেন। পাঠকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পত্রিকাটি আমরা প্রকাশ করে গেছি। আগামী দিনেও সেই শ্রদ্ধাই নিবেদন করে যাব। আমি বিশ্বাস করি, পাঠকই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁদের হাতে প্রতিদিন একটি গ্রহণযোগ্য পত্রিকা তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই গ্রহণযোগ্যতা কালের কণ্ঠ আজীবন বজায় রাখবে।

‘আংশিক নয়, পুরো সত্য’—এই স্লোগান নিয়ে আমরা এগিয়েছি। স্লোগানের মর্মার্থের স্বাক্ষর পত্রিকার পাতায় পাতায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। সংবাদের ভেতরকার পুরো সত্যটুকু সত্ভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছি। কোনো অসততা আমাদের কখনো স্পর্শ করেনি।

কেউ কেউ বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ।’ না, কালের কণ্ঠ নিরপেক্ষ নয়। কালের কণ্ঠ দেশের ষোলো কোটি মানুষের পক্ষে। প্রত্যেক সাধারণ মানুষের পক্ষে, প্রত্যেক সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের মানুষই আমাদের মূল শক্তি। কালের কণ্ঠ তাদের পক্ষের পত্রিকা।

যাত্রা শুরুর মুহূর্ত থেকে আমরা হৃদয়ে ধারণ করেছি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে, ধারণ করেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই আটটি বছর পার করেছি। আগামী দিনগুলোতেও এই চেতনার আলোয় আলোকিত হয়ে পথ চলব আমরা।

ইতিপূর্বে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা সম্মানিত করেছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের, মুক্তিযুদ্ধে যেসব মা হারিয়েছেন তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, সেই মায়েদের। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়েছি নগদ অর্থ এবং স্মারক। সারা দেশ খুঁজে ষোলোজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাকে বের করেছিলাম। এক বছর ধরে তাঁদের খোঁজ করেছি। খুঁজতে গিয়ে দেখেছি ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা তাঁদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশটি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেই শ্রদ্ধার মানুষগুলোর কারো কারো তিন বেলার আহার জোটে না। কেউ কেউ মৃত্যুশয্যায়, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কিন্তু তাঁর খাবার নেই, ওষুধ নেই। ধুঁকে ধুঁকে এগোচ্ছেন মৃত্যুর দিকে। তাঁদের ঢাকায় এনে প্রত্যেকের হাতে এক লাখ করে টাকা তুলে দিয়েছি। তাঁদের পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি। এবারও দেশের পনেরোজন মুক্তিযোদ্ধাকে আমরা সম্মানিত করছি। যদিও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এই বীরদের ঋণ কোনোভাবেই শোধ করতে পারবে না জাতি। আমরা তাঁদের সম্মানিত করে নিজেরা সম্মানিত হচ্ছি, কৃতার্থ হচ্ছি।

বাংলাদেশের যা কিছু বড় অর্জন তার প্রতিটিই অত্যন্ত যত্নে আমরা কালের কণ্ঠে তুলে ধরেছি। আমাদের গার্মেন্টশিল্পের অবদান, বিদেশে কর্মরত বাঙালি ভাইদের অবদান, আবাসনশিল্প, চামড়াশিল্প, ওষুধশিল্প—এ ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ যতটা এগিয়েছে, আমরা সেই এগিয়ে চলার কথা ব্যাপকভাবে প্রচারের চেষ্টা করেছি। অর্থাৎ পজিটিভ বাংলাদেশ পাঠকের সামনে নিয়মিত হাজির করে গেছি। আমাদের ক্রিকেট টিম পৃথিবী মাতিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি বড় দলের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের ক্রিকেটাররা। আমরা আমাদের এই সোনার সন্তানদের অবদানের কথা ব্যাপকভাবে তুলে ধরেছি কালের কণ্ঠ’র পাতায়। আর যে বিশাল কর্মযজ্ঞে পৃথিবীতে ইতিহাস সৃষ্টি করছে বাংলাদেশ, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু, সেই সেতুর কথা কিছুদিন পরপরই আমরা তুলে ধরি কালের কণ্ঠে। নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ এই সেতু নির্মাণ করতে পারছে, এর চেয়ে বড় ঘটনা আমাদের জীবনে খুব কমই ঘটেছে। এই ইতিহাস সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাঁর অদম্য চেষ্টার ফলেই এই স্বপ্নের দুয়ারে পৌঁছতে পারছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই। বঙ্গবন্ধু আমাদের বাংলাদেশ দিয়েছেন, আর তাঁর সুযোগ্য কন্যা দেশ এগিয়ে নিচ্ছেন।

প্রিয় পাঠক, আগেই বলেছি, আপনারাই আমাদের প্রধান শক্তি। গত আট বছর যেভাবে আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আগামী দিনগুলোতেও  সেভাবেই থাকবেন—এ আশা আমরা করি। বিজ্ঞাপনদাতা বন্ধুরা, আপনাদের জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনারা পাশে না থাকলে সুষ্ঠুভাবে কালের কণ্ঠ প্রকাশ করা খুবই দুরূহ ছিল। আগামী দিনেও আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা কামনা করি। যাঁরা আমাদের পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছে দেন—হকার এজেন্ট ও হকার ভাইয়েরা আপনাদের কাছেও আমরা গভীরভাবে ঋণী। আপনাদের সহযোগিতা না পেলে কালের কণ্ঠ পাঠকপ্রিয় পত্রিকা হতে পারত না।

একাত্তরের একজন মানুষের কথা বলে এই লেখা শেষ করি। মানুষটির নাম আবদুল আজিজ। উনিশ বছরের যুবক। বিক্রমপুরের শিয়ালদী গ্রামে বাড়ি। একাত্তরের মে-জুন মাসের একদিন সিরাজদিখান বাজারে যাচ্ছিলেন আজিজ। পাকিস্তানি জন্তুরা ধরল তাঁকে। বুকে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে বলল, ‘বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ সেই বীর বাঙালি বুকে ঠেকানো অস্ত্রের তোয়াক্কা করলেন না। আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে দশদিক কাঁপিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘জয় বাংলা’। রাইফেলের বাঁট দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করা হলো তাঁর মাথায়-মুখে। রক্তাক্ত যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। টেনে তোলা হলো তাঁকে। জন্তুরা বলছে, ‘বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ যুবক আবার আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুললেন। আবার বললেন, ‘জয় বাংলা’। তৃতীয়বার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার পর গুলি করে সেই বীর বাঙালিকে ফেলে দেওয়া হলো পাশের খালে।

এ রকম ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, সেই ত্রিশ লাখ  মানুষের কথা প্রতিটি মুহূর্তে চেতনায় রেখে কালের কণ্ঠ তার পথ চলবে। অষ্টম বর্ষপূর্তিতে এই আমাদের প্রতিজ্ঞা।



মন্তব্য